বাঙালির মতো উদাসীন, ইতিহাস-বিস্মৃত জাত আর নেই : সঞ্জয় সোমের কলম

Bengali indifferent history-forgotten caste
সঞ্জয় সোম, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ

পশ্চিমবঙ্গে যে কোনও জাতীয় দলের দিকেই তাকান না কেন, দেখবেন তাদের রাজ্যস্তরের নেতারা যেন সবসময় হাপিত্যেশ করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে আছেন, যদি তাঁরা দয়া করে বাংলার প্রতি একটু দৃষ্টি দেন। মজার ব্যাপার হল দিল্লির শীর্ষ নেতৃত্বে প্রণববাবুর পর আর একজনও সেই অর্থে দাপুটে বাঙালি নেই। সিপিএমের বঙ্গ ব্রিগেড অপেক্ষায় থাকেন প্রকাশ কারাত আর সীতারাম ইয়েচুরির মধ্যে কে কখন যুদ্ধে জেতেন সেই খবরের জন্য, কংগ্রেসের অধীরবাবু বুঝেই উঠতে পারেন না দিল্লির কোন নেতার ইশারায় ডালুবাবুরা হঠাৎ তৃণমূলের কাছে সন্ধিপ্রস্তাব নিয়ে হাজির হন, আর বিজেপির বিভিন্ন গোষ্ঠীর রাজ্যনেতৃত্ব দিল্লিতে নিজেদের নিজেদের ধরা নেতাদের কাছে দরবার করতে সদাব্যস্ত, যদি একজনকে সরিয়ে অন্যজনকে কোনও বিশেষ পদে বসানো যায়। মোদ্দাকথা হল, আজকে বাংলার চরম দুর্ভাগ্য যে বাঙালির ভাগ্যনির্ণয় করার ক্ষমতা আর বাঙালির হাতে নেই, বৃহত্তর পরিসরে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আছে কিনা সেটিও ঠিক নিশ্চিত নয়।

বেশি দিন পূর্বে যাবার দরকার নেই, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়কে আমাদের পছন্দ বা অপছন্দ হতে পারে কিন্তু এ কথা তো অস্বীকার করা যাবে না যে ইন্দিরা গান্ধীর মতন মাপের নেত্রীও ওঁর মন্ত্রনায় আস্থাশীল হয়ে জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন, অর্থাৎ এতটা রাজনৈতিক উচ্চতা বাঙালির এই সেদিনও ছিল, যার তিলমাত্র আজ আর অবশিষ্ট নেই। আজ আর কোনও জ্যোতি বসু নেই যে হরকিষেন সিং সুরজিতকে দিয়ে যা বলার বলিয়ে নেবেন, বাকিরা কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাবেন না। ডানপন্থী রাজনীতির কথা না বলাই ভাল, কারণ বাঙালির হাতে প্রতিষ্ঠিত যে দলটা আজ সারা দেশ শাসন করছে, তার কোর পরিচালন সমিতিতে একজনও বাঙালি নেই, কেন্দ্রীয় সরকারে নেই কোনও বাঙালি ক্যাবিনেট মন্ত্রীও। এ লজ্জা আসলে কার?

একটু অন্যভাবে যদি ভাবি, আমরা চিরকাল নিজেদের বহুত্ববাদী ঐতিহ্যকে ভয়ঙ্কর অবহেলা করেছি, আমাদের যে সর্বস্তরে, সর্বক্ষেত্রে, সর্বধারায় সর্বব্যাপী উপস্থিতির প্রয়োজন ছিল, এত বুদ্ধিমান হওয়া সত্ত্বেও আমরা তা কোনোওদিন অনুধাবনই করতে পারিনি। আপনারা ইহুদিদের দেখুন, দেখবেন বামপন্থী ন্যারেটিভ যে নাওম চমস্কি বিস্তার করছেন, তিনিও যেমন ইহুদি, তেমনি ডানপন্থী ন্যারেটিভের পুরোধা পিটার রবিন্সনরাও তাই, আবার ডানপন্থী অর্থনীতিবিদ ফেড্রিক হেইচ থেকে নিয়ে বামপন্থী অর্থনীতিবিদ হেইমেন মিন্সকি – পৃথিবীর মগজটা জুড়ে ইহুদিদের দখলদারি। একটি ছোট্ট কিন্তু অসম্ভব বৌদ্ধিক জাতি হিসেবে ওঁরা নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছেন গোটা পৃথিবীর আর্থ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রের উপর। আর আমরা, বাঙালিরা? অতটাই প্রভাব ছিল আমাদের নিজেদের দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতির ওপর, আজ আমরা শূন্য। বামপন্থা, বা বলা ভাল সোশ্যালিস্ট ঘরানার এমনই কুপ্রভাব যে কোনও বাঙালি নিজের হিন্দু অথবা ডানপন্থী আইডেন্টিটি প্রতিষ্ঠা করতে গেলেই গোটা সারস্বত সমাজ যেন তাকে একটা সাম্প্রদায়িক এবং অসহিষ্ণু তকমা লাগাতে উঠেপড়ে লাগত, এটা কেউ কেন বুঝলেন না যে যেদিন ডানপন্থী ভাবধারার উত্থান হবে সেদিন দেশে বাঙালি নেতৃত্ব বলে আর কিছু থাকবে না?

আসলে বাঙালির মতন এমন অদ্ভুত উদাসীন এবং ইতিহাস-বিস্মৃত জাতি আর দুটি নেই। খোদ কলকাতা শহরের বুকে স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার সশস্ত্র আন্দোলনের ভূমিকা ও বিপ্লবী সংগ্রামীদের নিয়ে কোনো মিউজিয়াম নেই, নেই বাংলাভাগের ইতিহাসের উপর কোনও স্থায়ী প্রদর্শনী, বাংলার জনক শ্যামাপ্রসাদের বাড়ি সরকার অধিগ্রহণ করে আজও জাতীয় স্মারক বানাননি, কারণ বাঙালি প্রয়োজন বোধ করেনি। রাজা শশাঙ্কর যুগ থেকে বঙ্গের গৌরবময় ইতিহাস ও প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন সভ্যতার উপর প্রভাব ও প্রাচীন বাঙালির নিবিড় আত্মিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়েও কোনও চর্চাকেন্দ্র নেই, পাল-সেন বংশের কোনও রাজার একটা মূর্তি পর্যন্ত নেই শহরে, নেই প্রতাপাদিত্য, রাজা সীতারাম, চাঁদ রায়, নেই রানি ভবানী, নেই কৈবর্ত বিদ্রোহের প্রদর্শনীও। অথচ আমরা নাকি গর্বিত বাঙালি।

এই কিছুদিন আগে অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসেছিলেন, সেখানে দিল্লিস্থিত ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ফাউন্ডেশন দ্বারা আয়োজিত প্রথম বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জাতীয় স্মারক বক্তৃতা শীর্ষক অনুষ্ঠানে মঞ্চে হাজির ছিলেন বঙ্কিমের জীবনীকার তথা শিক্ষাবিদ অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য, ছিলেন নেতাজি গবেষক পূরবী রায়, বিখ্যাত সাহিত্যকার বুদ্ধদেব গুহ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বামী বিবেকানন্দ চেয়ার অধ্যাপক রাধারমণ চক্রবর্তী, গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অচিন্ত্য বিশ্বাস, এবং বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য স্মৃতিকুমার সরকার। একটি মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান হল, অমিত শাহ প্রধান বক্তা ছিলেন, ওঁর বিষয় ছিল বন্দেমাতরম ও জাতিয়তাবাদ। ওঁরা এই বক্তৃতামালা সারা দেশে নিয়ে যাবেন আগামী এক বছর ধরে এবং বঙ্কিমচন্দ্রকে প্রবুদ্ধজনের সামনে নতুন করে তুলে ধরবেন। আমার প্রশ্ন হল এতদিন বাংলার কোনও প্রাদেশিক বা সর্বভারতীয় দলের কোনও বাঙালি নেতাকে তো স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্কিমচন্দ্রের ঋত্বিকের ভুমিকা তুলে ধরতে কখনও প্রয়াসী হতে দেখিনি, আজ কেন বাংলার বাইরের একটি সংস্থাকে আমাদের করণীয় কাজ করতে হচ্ছে? বাংলার গর্ব যে শুধু বাঙালির গর্ব নয়, সে সারা দেশের, এই সহজ বোধটাও কি আমরা আজ হারিয়ে ফেলেছি?