রবীন্দ্রনাথের ছটায় ঢেকে থাকা মৃণালিনী দেবী

অরুণ মন্ডল

এ জীবনে যাঁরা দিয়েই গেলেন, পেলেন না কিছুই তাদের মধ্যেই একজন হলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ছটায় ঢেকে থাকা কবিপত্নী মৃণালিনী দেবী।

বাংলাদেশের খুলনার দক্ষিণডিহিতে বেণীমাধব রায়চৌধুরীর মেয়ে ভবতারিনীর জন্ম হয় 1873 সালে। 1883 সালের 9ই ডিসেম্বর তাঁর যখন বিবাহ হয় 22 বর্ষীয় কবির সঙ্গে তখন তাঁর বয়স মাত্র 10 বছর। ভবতারিণী নামটা অনেকটা সেকেলে শোনায় বলে রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা নামটা পাল্টে মৃণালিনী দেবী রাখেন।

নিরক্ষর মৃণালিনীকে ঠাকুরবাড়ির উপযুক্ত করে তোলবার জন্য লরেটোতে ভর্তি করা হয়। কিন্তু সম্ভবত বিয়ের বছর দুই পর থেকেই একের পর এক সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে তাঁর পড়াশোনাটা বোধহয় প্রত্যাশিত এগোয়নি। একবছর লোরেটোতে পড়াশোনা করেন মৃণালিনী। রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছেতে এর পর বাড়িতেই পণ্ডিত হেরম্বচন্দ্র বিদ্যারত্নের কাছে সংস্কৃত শেখার ব্যবস্থা হয় তাঁর।

1886 সালে প্রথম সন্তান হল মৃণালিনীর-মাধুরীলতা, তখন মৃণালিনীর বয়স মাত্র 13 বছর! 1888 সালে দ্বিতীয় সন্তান রথীন্দ্রনাথ, তখন মৃনালিনীর বয়স 15 বছর। 1891 সালে 18 বছর বয়সে তৃতীয় সন্তান রেনুকা। 1894 সালে এল চতুর্থ সন্তান মীরা। 1896 সালে শেষ সন্তান শমীন্দ্রনাথ হল যখন তখন মৃণালিনী মাত্র 23 বছরের! অর্থাৎ মাত্র দশ বছরে পাঁচটি সন্তান! না রবীন্দ্রনাথ তখন অবশ্য মোটেই নাদান নন, রীতিমত ইংরেজদের সংস্পর্শে আসা 35 বছরের যুবা।

এরই মধ্যে কয়েক পৃষ্ঠা মহাভারতের শান্তিপর্বের, ঈশপোনিষদ, কঠোপনিষদের অনুবাদ অভ্যাস করা মৃণালিনীর একটা খাতা দেখা যায় বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবনে। সাহিত্যচর্চা, অনুবাদ চর্চার পাশাপাশি ঠাকুরবাড়ির নাটকের দলেও সক্রিয় ছিলেন মৃণালিনী। ‘রাজা ও রানী’ নাটক প্রথমবার মঞ্চস্থ হলে নারায়ণীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তিনি। সাহিত্যে আগ্রহ থাকলেও চিঠি আর সামান্য কিছু অনুবাদের খসড়া ছাড়া মৃণালিনী প্রায় লিখে যাননি কিছুই।

মৃণালিনী মারাও গেছিলেন সূতিকা রোগে। প্রসঙ্গত, সূতিকা কোনেও রোগ নয়, প্রসবের পরের জটিলতাকেই সেযুগে সূতিকা বলা হত।
এখন প্রশ্ন জটিলতাটা কী এবং কেন হত? উত্তর হল, সেযুগের অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে অপরিচ্ছন্ন আতুর ঘরে অদক্ষ দাই এর হাতে অবৈজ্ঞানিক প্রথায় প্রসব করানোর জন্য এবং প্রসব পরবর্তী অ্যান্টিবায়োটিকের অভাবে। তাঁর ঠিকঠাক চিকিৎসাও হয়নি, রবীন্দ্রনাথ নিজেই দীর্ঘদিন হোমিওপ্যাথী করেছেন, একেবারে মরার আগে এসেছিল অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তার।

চিরকাল কবির ছায়ায় ঢেকে থাকা এই মানুষটি অকালেই 1902 সালের 23শে সেপ্টেম্বর মাত্র 29 বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেন।

ঘটনাক্রম থেকে মনে হতে পারে তবে কি বাঙালীর প্রগতিশীলতার আইকন রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিগত জীবনে তেমন প্রগতিশীল ছিলেন না?

এখানে একটু নিজের অবস্থানটিকে পরিস্কার করে নেওয়া ভাল। রবীন্দ্রনাথ সে আমলে পুত্র রথীন্দ্রনাথকে কৃষিবিদ্যা পড়িয়েছেন, বিধবা প্রতিমা দেবীকে পুত্রবধু করে এনেছেন, প্রথাগত শিক্ষার পরিবর্তে নতুন শিক্ষাপদ্ধতি এনেছেন, পল্লীউন্নয়নের ক্ষেত্রে অসীম অবদান রেখেছেন এবং ভারতবাসীকে দিয়ে গেছেন শান্তিনিকেতনের রুচি ও সৌন্দর্য্যবোধ। তাঁর বিরল সাহিত্যপ্রতিভার কথা নাই বা বললাম। তাঁর মানবতাবাদী চিন্তাধারা, যার আমিও ভক্ত এবং স্ত্রীকে দেওয়া প্রচুর সন্মান অথবা ভাল ভাল চিঠি যেমন আছে, তেমনি আছে অবৈজ্ঞানিকভাবে প্ল্যানচেটে বিশ্বাস, মাত্র দশ বছরে পাঁচটি সন্তানের জন্মদান, পণ দিয়ে কন্যার বিবাহ দেশে প্রচুর অ্যালোপ্যাথ ডাক্তার থাকতেও হোমিওপ্যাথি দিয়ে স্ত্রীর চিকিৎসা করানো ইত্যাদি।

এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলি দিয়ে রবীন্দ্রনাথের দোষেগুণে ভরা মানবিক চেহারাটাই ফুঠে উঠছে, আর কিছু নয়।

(তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া ও আরও কয়েকটি সাইট)