প্রদেশ সভাপতি সোমেন মিত্র, কী পাবে দিল্লির নেতারা? শুভাশিষ রায়ের কলম

শুভাশিষ রায়

সৌমেন্দ্র নাথ মিত্র কংগ্রেসী রাজনীতিতে তিনি ছোড়দা ।75 বছর বয়সেও ছোড়দা। মধ্য কলকাতা থেকে রাজনীতি শুরু করে এক সময় সারা বাংলার প্রত্যেকটা ব্লকে তার নিজস্ব একটা সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। গড়ে তুলেছিলেন একটা নিজস্ব বাহিনী। সেসময় কংগ্রেস ছিল শক্তিশালী কেন্দ্র এবং রাজ্যে। ছোড়দা সংগঠন করেছিলেন নিজের দক্ষতায়। ইন্দিরা গান্ধীর সমর্থন ছিল সুব্রত মুখার্জী হাতে। স্বল্পবাক মেজাজি রাশভারী কিন্তু ছাত্র যুবদের রাজনৈতিক গুরু। কংগ্রেসের রাজনীতিতে শত ঘোষের হাত ধরে সংগঠন শেখা সোমেন মিত্র বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কারিগর।

বাংলায় এখনো যারা রাজনীতির ময়দান দাপিয়ে বেড়ায় তারা অনেকেই সোমেন মিত্রকে নিজেদের রাজনৈতিক গুরু মনে করেন। কংগ্রেসের রাজনীতিতে হাই কমান্ড বলে একটা বস্তু আছে ছোড়দা কোনোদিনই সেটার পূর্ণ সমর্থন পায়নি। ইন্দিরা জামানায় প্রথমে প্রিয় তারপরে সুব্রত মুখার্জি ছিল দিল্লির প্রিয় পাত্র। তারপরে আসেন রাজীব গান্ধী সেখানেও প্রিয় রঞ্জন দাস মুন্সী ছিল শেষ কথা। ছোড়দার লড়াইয়ের সাথী ছিল তার সংগঠন। রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর পর রাহুল সোনিয়ারা কোনদিনই সোমেন বাবুকে প্রাপ্য মর্যাদা দেয়নি। রাজিব পরবর্তী জামানায় সোমেন বাবুর করুন অবস্থার কথা এখনো হয়তো অনেকের মনে থাকবে। যদি প্রাপ্য সম্মান পেতেন তাহলে আদৌ তিনি কংগ্রেস ছাড়তেন কিনা সেটা সন্দেহের অবকাশ আছে। হঠাৎ আজ দিল্লির কাছে সোমেন বাবুর দাম বৃদ্ধির কারণ?
এখনকার সৌমেন মিত্র আটের দশকের সোমেন মিত্র নয় । সেই বয়স নেই, সহযোদ্ধারা ও নেই , শারীরিক অবস্থাও শুনেছি ততটা ভালো নয় তাহলে কি জন্য রাহুল গান্ধীর হঠাৎ সোমেন মিত্রকে প্রয়োজন হল। এক পক্ষ বলছেন মমতার বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দেওয়ার জন্যই সোমেন মিত্র আগমন। অধীর চৌধুরী কে আমি কখনো মমতা সম্বন্ধে নরম কথা বলতে শুনিনি, তাহলে অধীর কে দিয়েই তো মমতাকে বার্তা দেওয়া যেত। বার্তা দেওয়া যেত আব্দুল মান্নান কে সামনে রেখে । তিনিও তো যথেষ্ট মমতা বিরোধী। একসময় সৌমেন বাবু বিক্ষুব্ধ রাজনীতি করতেন মান্নান সাহেব কে সামনে রেখে। একের পর এক আন্দোলন হত সেবা দলের নামে । সেবা দলের তৎকালীন চেয়ারম্যান ছিলেন আব্দুল মন্নান ।সোমেন বাবুর দক্ষিণ হস্ত ।

যুব কংগ্রেস বা প্রদেশ কংগ্রেস কোনও কর্মসূচি নিলে তার পাল্টা মান্নান সাহেব কে নিতে হতো সেবা দলের নাম দিয়ে। আসলে যেটা থাকতো সোমেন মিত্রের শক্তি পরিচয়। আটের দশক থেকে নয় দশক হাজী মোহাম্মদ মহসীন স্কোয়ারে কংগ্রেসের সদরদপ্তরে সভাপতির নামটা পাল্টালেও উল্টোদিকে থাকা ঘরে সাধারন সম্পাদকের নাম টা পাল্টা তো না। সেখানে সোমেন মিত্রের নামটাই থাকতো। কিন্তু সাধারণ সম্পাদক থেকে সভাপতি হওয়ার রাস্তাটাও খুব সহজ ছিল না। কারণ দিল্লির চোখে নিরব পেছন থেকে খেলা ডিফেন্ডার এর কোনো দাম নেই গোল করতে পারলে তবেই তার নাম হয়। দিল্লির কাছে ও তাই ছিল।
প্রিয় দাশমুন্সি একবার এক আলোচনায় বলেছিলেন সৌমেন না থাকলে কলকাতার বুকে আমি আর সুব্রত অত নিশ্চিত ভাবে রাজনীতি করতে পারতাম না।

কলকাতার আমার্স্টিট থেকে সোমেন মিত্র জেলার নেতাদের বুক দিয়ে আগলে রাখতেন। বামফ্রন্ট জানাতেও বহু ডাকাবুকো জেলার নেতাদের সোমেন মিত্রের আশ্রয়ে থাকতে দেখা গেছে। উনি আশ্রয় দিতেন। সিপিএমের বিরুদ্ধে উনিক কতটা লড়াই করেছেন সে বিষয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে কিন্তু দিল্লির বিরুদ্ধে লড়াই করে কংগ্রেস রাজনীতি করেছেন এ বিষয়ে কোন প্রশ্নের অবকাশ নেই এ কথা যে কোনো প্রবীণ কংগ্রেসী খুব ভালো মত জানেন। তাহলে কিসের প্রয়োজন হল আজ দিল্লির হাইকমান্ডের।
রাজনৈতিক আরেক পক্ষের মত স্বল্পবাক সোমেন বাবু হয়তো জোটের পক্ষে উপযুক্ত নেতা।

সৌমেন বাবু বড় টিম নিয়ে তৃণমূলে গেছিলেন কিন্তু ফিরেছেন খালি হাতে । তার আশীর্বাদ ধন্য বহু নেতাই এখন তৃণমূলের উল্লেখযোগ্য পদে রয়েছেন কেউ চেয়ারম্যান কেউ কমিশনার কেউবা দলীয় পদে । তাদের মনে ছোড়দা এখনো শ্রদ্ধার পাত্র কিন্তু দলটা তৃণমূল করতে হবে। যেচে বিরোধী হতে যাব কেন এটাই তাদের মূল মন্ত্র । তারা হয়ত সবাই সোমেন বাবু সভাপতি হাতে ফিরে আসবে না। কিন্তু সোমেন বাবুর প্রতি একটা নরম ভাব নিশ্চয়ই পোষণ করেন। মমতাকেও কেউ সোমেন বিরোধী কঠোর কথা প্রকাশ্যে বলতে শোনেননি। তৃণমূলের সাথে ভোট পূর্ববর্তী জোট অথবা ভোট-পরবর্তী জোটের প্রয়োজন হলে অধীর এর চেয়ে সোমেন বাবু অনেক অনেক বেশি প্রয়োজনীয়। তাই কি দিল্লি সোমেন বাবুকে সভাপতি করে পাঠালেন।
রাশভারী স্বভাব গম্ভীর সোমেন বাবু বামপন্থীদের কাছেও যথেষ্ট জনপ্রিয় এবং বিশ্বস্ত।

অধীর চৌধুরী মমতা বিরোধী হলেও বামপন্থীদের কাছে অতটা গ্রহণযোগ্যতা নেই যতটা সোমেন বাবুর আছে। দিল্লির যদি একান্তই সিপিএমের সাথে জোট করার প্রয়োজন পড়ে সে ক্ষেত্রে বাংলার বুকে সোমেন বাবুই হয়তো রাহুল গান্ধীর সেরা বাজি। বোফর্স গান্ধী বলে ভোটে জেতা সিপিএম নেতাদের সঙ্গে বড় মালা পরে একসঙ্গে ভোট লড়েছিলেন রাহুল গান্ধী। সে পরীক্ষা সফল হয়নি কারণ তাতে বিশ্বাস যোগ্যতা ছিল না। স্বল্পমেয়াদি লাভের ব্যাপার ছিল। তাই বামপন্থীরা কংগ্রেসকে ভোট দিলেও দীর্ঘ দিনের বিরোধীরা বামপন্থীদের ভোট দেয়নি। এইখানেই হয়ত সোমেন বাবুর প্রয়োজন দিল্লির নেতাদের। ভোটে জিতে লাভ হবে দিল্লির নেতাদের হারলে শহীদ সোমেন মিত্র।
এই দুদিনে রাস্তায় এ মতও শুনলাম অধীর চৌধুরী নাকি দিল্লি বিজেপি নেতাদের টার্গেট তাই আগে ভাগেই সভাপতি পরিবর্তন।

কারণ যাই হোক বহু বহুদিন বাদ দিল্লির নেতারা সোমেন বাবুর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পেরেছেন। উপর থেকে গনি কিংবা প্রণব বাবুর নিচে না রেখে সবার উপরে রেখেছেন। সারাবাংলা রাজনৈতিক মহল অপেক্ষা করছে ভবিষ্যতের রাজনীতির। দেখা যাক বাংলার ছোড়দা দিল্লির কতটা কাজে লাগে। মনে হয় প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন কংগ্রেসের ছোড়দা এ বিষয়টা ভালোভাবেই বোঝেন।