মহাত্মা, হায়দরি মঞ্জিল এবং এক অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশনার, কণাদ দাশগুপ্তের কলম

 

কণাদ দাশগুপ্ত

1947-র 13 আগস্ট মহাত্মা গান্ধী কলকাতায় এসে উঠেছিলেন পূর্ব কলকাতার হায়দরি মঞ্জিল নামের এক বাড়িতে। বাড়ির ঠিকানা, 150B বেলেঘাটা মেন রোড ৷ এই বাড়িতেই মহাত্মা লোকচক্ষুর আড়ালে দেশের স্বাধীনতা লাভের মহা-মুহূর্তটি কাটিয়েছিলেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ব্যথিত হয়ে অনশনেও বসেছিলেন এই বাড়িতেই। ‘47-এর 13 আগস্ট থেকে 7 সেপ্টেম্বর, এই 25 দিন মহাত্মার কলকাতার ঠিকানা ছিলো এই ভবনই। 1985 সালে রাজ্যপাল উমাশঙ্কর দীক্ষিত বাড়িটির নতুন নামকরণ করেন ‘গান্ধী ভবন’।

বেলেঘাটার হায়দরি মঞ্জিল। এখন পরিচিত ‘গান্ধীভবন’ নামে

দেশজুড়ে চলা ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ছোবল সেদিন লেগেছিলো এই কলকাতাতেও। সেই 1947-এ গান্ধীজির কলকাতা সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিলো দাঙ্গা থামানো। এবং সেটাই ছিলো তাঁর শেষবারের মতো কলকাতায় আসা ও থাকা।
বেলেঘাটাতেও তখন টানটান উত্তেজনা৷ একটু দূরেই দাঙ্গার রক্তে ভেসে যাচ্ছে পথঘাট। ওই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কলকাতা পুলিশ গান্ধীজির জন্য তৈরি করেছিলো বিশেষ স্তরের নিরাপত্তা বলয়। লালবাজারের শীর্ষকর্তারা মহাত্মার নিরাপত্তার জন্য বিশেষ একটি দলও তৈরি করেছিলো। দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সেই সময়ে শহরের দুঁদে অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশনার হেমন্ত সেনগুপ্তকে৷ সে সময়ে সর্বক্ষণ বাপুর পাশেই ছিলেন হেমন্তবাবু। স্বাধীন ভারতে তিনিই সম্ভবত গান্ধীজির প্রথম এবং শেষ বাঙালি নিরাপত্তা অফিসার, বাপুর ছায়াসঙ্গী৷

হেমন্ত সেনগুপ্ত

যে 25 দিন গান্ধীজি ওই হায়দরি মঞ্জিলে ছিলেন, সেই সবদিনে বাপুর এবং মঞ্জিলের নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিলেন এই হেমন্তবাবুই। গান্ধীজি মঞ্জিল থেকে বেরোলে, এই অফিসারের পুলিশ জিপ থাকতো গান্ধিজির গাড়ির সামনে৷ সবার আগেই থাকতো কলকাতা পুলিশের সেই জিপ, যার নম্বর ছিল সিপি 37, হুডখোলা জিপে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকতেন হেমন্ত সেনগুপ্ত। অনবরত চোখ ঘুরতো চারধারে। রাস্তায় কোথাও কিছু বেচাল দেখলেই ব্যবস্থা নিতেন। গান্ধীজির গাড়ির পিছনেই রাখা হতো আরও একাধিক পুলিশের গাড়ি। বাপুকে দেখতে রাস্তার দু’পাশে যথারীতি বাঁধনহীন
জনতা৷ তাঁরা সবাই গান্ধীজিকে ছুঁতে চাইতেন, প্রনাম করতে চাইতেন। পেশাগত দক্ষতায় সব কিছু সামলাতেন হেমন্তবাবু।
গাড়ির সামনে যাতে বিশৃঙ্খল জনতা চলে না আসে, তাও দেখতেন তিনি৷ হুডখোলা জিপে দাঁড়িয়ে ক্রমাগত নির্দেশ দিতেন জনতাকে। হাত নেড়ে সঙ্গের পুলিশবহিনীকে ইঙ্গিতে বোঝাতেন কখন কি করতে হবে। জলদগম্ভীর কণ্ঠ ছিল তাঁর৷ গলার স্বরেই অনেক কিছু ম্যানেজ করে নিতেন।

হায়দরি মঞ্জিলেও রোজ থাকতো উপচে পড়া ভিড়। ভিভিআইপি থেকে, পাশের বস্তির মহিলারা।
মঞ্জিলের সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই একটি হলঘর। তার ঠিক পিছনে আরও একটি হলঘর।হায়দারি মঞ্জিলের বাঁদিকের শেষের ঘরটায় গিয়ে বসতেন৷ বসতো মহাত্মার ‘আম-দরবার’। বাপু ঘরের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে৷ মানু ও আভা গান্ধী থাকতেন সর্বক্ষণ৷ থাকতেন মহাত্মার সচিব নির্মল বসু৷ রোজ তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষাও করা হতো।
বাপু অনশনে বসেছিলেন এই ঘরটিতেই। এখন সম্পূর্ণ কাচ দিয়ে ঢাকা ওই ঘরটিতে তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র সাজানো আছে। ওই ঘরটির জন্য সেদিন ছিলো আলাদা নিরাপত্তা বলয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন হেমন্তবাবু। কারো কোনও অসুবিধা হতো না সেজন্য। কেউ টেরও পেতেন না সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অথচ একবারের জন্যও ন্যূনতম বিশৃঙ্খলা হয়নি। সেই সব দিনে এতটাই নিঁখুতভাবে গোটা কর্মকাণ্ড সাজিয়েছিলেন হেমন্ত সেনগুপ্ত।
গান্ধিজি মাটিতেই বসতেন। সামনে, পাশে পাতা থাকতো মাদুর, সতরঞ্চি। ভিভিআইপি অতিথি এলেও মাটিতেই বসতেন। ভিভিআইপি মানে রাজা গোপালাচারি, সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ, আচার্য কৃপালিনী,প্রফুল্ল ঘোষ জ্যোতি বসু- আরও কত নাম। ওদিকে ঘরে জানালার সংখ্যা কম নয়। জানলায় মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন হাজারো মানুষ, একবার চোখের দেখা দেখতে৷ নিরাপত্তা ছিদ্রহীন করতে হলে, এসব জানলা বন্ধ রাখাই দস্তুর ছিলো। কিন্তু গান্ধীজি স্পষ্টভাবে হেমন্তবাবুকে বলে দিয়েছিলেন, চারধারের সব জানলা-দরজা যেন খোলা থাকে। এই নির্দেশে একটুও না ঘাবড়িয়ে হেমন্তবাবু জানলাগুলির সামনে থাকা জনতার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলেন পুলিশ। আর নিজেই সবকিছু তদারকি করতেন চারদিক ঘুরে ঘুরে, একটুও না বসে।

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থামাতে গান্ধীজি হায়দরি মঞ্জিল থেকেই
অহিংসার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও বেলেঘাটা এলাকাতেই নতুনভাবে গণ্ডগোল ছড়িয়ে পড়ে৷ হানাহানি শুরু হয়। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে ঝাঁপানোর ঘটনা বাড়তে থাকে। সক্রিয়তা বৃদ্ধি করে দুষ্কৃতীরা৷ তাঁর আবেদনে কাজ না হওয়ায় মহাত্মা ওই ভবনেই অনশন শুরু করেন৷ কাজ বেড়ে যায় কলকাতা পুলিশের তৎকালীন এসি হেমন্ত সেনগুপ্তের। গান্ধীজি ঘোষনা করেন, দুষ্কৃতীরা অস্ত্র সমর্পণ না করা পর্যন্ত তিনি অনশনেই থাকবেন। হেমন্তবাবু ফোর্স নিয়ে একের পর অভিযান চালিয়ে বেলেঘাটা, নারকেলডাঙ্গা, রাজাবাজার এলাকা থেকে বহু অস্ত্র উদ্ধার করেন। দুষ্কৃতীদের বাধ্য করেন মঞ্জিলে এসে মহাত্মার সামনে অস্ত্র জমা দিতে। সে সময়ের খবরের কাগজে এ ঘটনার ছবিও প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে দেখা গিয়েছে, গান্ধীজির তরফে হেমন্ত সেনগুপ্তই অস্ত্র জমা নিচ্ছেন একের পর এক৷ সেই সব অস্ত্র আজও রয়েছে এখনকার গান্ধীভবনের সংগ্রহশালায়।

ওই 25দিনের মধ্যে একবারই অপ্রীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো। তাও একেবারে শুরুর সময়, 13 আগস্ট। সেদিনই গান্ধীজি বেলেঘাটায় পা রাখেন। তিনি আসামাত্রই কয়েকজন হিন্দু যুবক নাকি ওখানেই বিক্ষোভ দেখায়৷ তাদের বক্তব্য, “1946-এর 16 আগস্ট হিন্দুরা যখন বিনা দোষে অত্যাচারিত হয়েছিলো, তখন হিন্দুদের পাশে কেউ ছিলো না৷ এখন হিন্দুরা সামলে নিয়েছে। আজ কেন আপনি মুসলিমদের বাঁচাতে এসেছেন?” এই যুবকদের ওখান থেকে সরিয়ে দিতে তৈরিই ছিলেন হেমন্ত সেনগুপ্ত। কিন্তু বাধা দেন স্বয়ং গান্ধীজি। তাদের শান্ত করে বাপু বলেছিলেন, “গত বছরের কথা তুলে কেন এই সময়কে আপনারা বিষাক্ত করছেন? যারা হত্যা করছে, আগুন লাগাচ্ছে, লুঠ করছে, তারা নিজেদের ধর্মের সঙ্গেই তো বিশ্বাসঘাতকতা করছে৷ নোয়াখালির মুসলিম নেতাদের আমি বলেছি, যদি ওখানে আবার দাঙ্গা শুরু হয়, তা হলে আমাকে আগে হত্যা করতে হবে৷ আজ এখানে আপনারা যতই প্রতিবাদ করুন, আমি এই এলাকা ছাড়ব না৷ আমার নাম, আমার কাজ, সবটাই প্রমাণ করে আমি হিন্দু৷ এই ধর্ম আমি পালন করি।” তেজস্বী মহাত্মার এ ধরনের কথা শুনে যুবকরা শান্ত হয়, গান্ধীজির পাশে দাঁড়ায়৷ হেমন্ত সেনগুপ্তকেও আর ‘সক্রিয়’ হতে হয়না।

বেলেঘাটা গান্ধী ভবনের সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর 25 দিনের স্মৃতি যেভাবে জড়িয়ে আছে, ঠিক সে ভাবেই জড়িয়ে আছেন হেমন্ত সেনগুপ্ত নামে সেই সময়ে এ শহরের এক দুঁদে অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশনারও। আমরা অনেকেই জানিনা।

(সেই সময়ে যারা হায়দরি মঞ্জিলে গান্ধীকে দেখেছিলেন, বেলেঘাটা এলাকার প্রবীন কয়েকজনের সঙ্গে কথার ভিত্তিতে লেখা। একটু-আধটু বিভ্রান্তি থাকলেও থাকতে পারে। হেমন্তবাবুর ছবিটি এক পরিচিতের মাধ্যমে পাওয়া)