বৃদ্ধাশ্রমের বারান্দায় চোখ ছলছল করে ওঠে শ্যামলের মা-এর

চন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়

গঙ্গা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে জোয়ারের জল। দূরে দেখা যাচ্ছে মাছ ধরার নৌকা। সেদিকে তাকিয়ে ঘরের বারান্দা থেকে অবাক দৃষ্টিতে ভাবতে থাকে শ্যামলের মা। ভাবতে থাকে ফেলে আসা দিনের কথা। সত্যিই কি ভেবেছিলেন কখনও যে আসবে এই দিন। সমাজের সঙ্গে মানুষের সঙ্গে লড়াই করে ছোট থেকে তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন নিজের জীবনের প্রাণভোমরা ছেলেকে।

আদর করে নাম রেখেছিলেন বটু। কিন্তু কখনও ভাবেননি সেই প্রাণের ভালোবাসা সেই প্রাণভোমরা একদিন তাঁকে রেখে যাবে বৃদ্ধাশ্রমে।আজও মনে পড়ে সেদিনের কথা। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল সেদিন। সকাল থেকে নতুন সাজে নিজের মাকে সাজিয়ে তুলতে ব্যস্ত ছিল ছেলেটা। এমনকি তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রীও সেদিন কেমন বদলে গিয়েছিল আচার আচরণে। শ্যামলের মা বুঝতে পারেন নি কি অপেক্ষা করে আছে তাঁর ভবিতব্য। 07:10 গেদে  লোকাল যখন সোদপুরে পৌঁছাল বেলা গড়িয়ে দুপুর 2 টো। তারপর যেখানে তিনি এলেন সেখানকার পরিবেশ সেখানকার মানুষগুলোর ব্যবহার সব মিলেমিশে কেমন যেন একটা পিকনিক পিকনিক ভাব।

দুপুরের খাওয়া হল সবাই মিলে। অনেক গল্প হল। তারপর একটু ঘুরে আসি বলে, সেই যে বেরিয়ে গেল শ্যামল আর তার স্ত্রী, আজ 6 বছর হল আর ফিরে আসেনি। যদিও বৃদ্ধাশ্রমের দিদিরা বলেন, মাসে মাসে  টাকা পাঠিয়ে দেয় শ্যামল। আজকে পুজোর দিনে যখন সবাই ঘরে ফেরার কথা ভাবছে তখন অপলক দৃষ্টিতে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে শ্যামলের মা ভাবতে থাকে, এ কোন পৃথিবী, এ কোন বাস্তব। কেন এমন হয়। তিনি তার জীবন দিয়ে পড়তে পড়তে পরখ করছেন, জানছেন-বুঝছেন একাকীত্বের বোঝা। কিন্তু ওই যে বলে নাড়ির টান। ছেলে যতই খারাপ হোক না কেন, মা কখনও খারাপ চান না। তাই পুজোর দিনগুলোয় শ্যামলের মা আজও তার ছেলের পরিবারের ভাল চান। মায়ের কাছে মা দুগ্গার কাছে  মায়ের আর্তি ভালো রেখো মা ওদের সবাইকে।বৃদ্ধাশ্রমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে শ্যামলের মা দূরে তাকিয়ে মনে মনে গুনগুন করে ওঠেন, নীল পাখিটা রোজ ভোর বেলা হলে ডাকত, তার নামটা ঠিক মনে নেই, তবু ডাকত। এভাবেই দিন যায় রাত আসে, পুডো যায় পুজো আসে। অপেক্ষায় থাকে হাজার হাজার শ্যামলের মা।