সংবাদচিত্রীর না-বলা জীবনকথা, অশোক মজুমদারের কলম

            অশোক মজুমদার

লেখাটা প্রকাশিত হয়েছিল রাণাঘাটের হরপ্পা পত্রিকায় প্রথম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যায়। হরপ্পা নামটা মনে এলে আমাদের মনে পড়ে একটা উৎকর্ষের কথা। পত্রিকাটি যেন সেই উৎকর্ষের এক চিহ্ন। পত্রিকাটির সম্পাদক সৈকত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল সিইএসসি-তে কর্মরত আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু বিশ্বরূপ মুখোপাধ্যায়ের সূত্রে। সৈকতের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, ওরা আমাকে নিয়ে একটা কাজ করার কথা ভাবছে। সত্যি বলতে কী, ব্যাপারটা নিয়ে প্রথমে আমার কিঞ্চিৎ দ্বিধা ছিল। তার একটা বড় কারণ হল, আমি নিজের কথা এভাবে কোনদিন কোনও জায়গায় বলিনি। দ্বিতীয়ত, সে বলাটা কি চেহারা নেবে, কোন জায়গায় কীভাবে ছাপা হবে তা নিয়েও আমার মনে নানা প্রশ্ন ছিল। হরপ্পার এই সংখ্যাটির প্রথম থেকে শেষ পাতা আমার সেই সংশয়কে মিথ্যা প্রমাণ করে ছেড়েছে। বিষয় ভাবনা, ছাপা, অক্ষর বিন্যাস, অঙ্গসজ্জা সবদিক থেকে পত্রিকাটি যেন বাংলার লিটল ম্যাগাজিনের উৎকর্ষের এক উদাহরণ। আমাদের আলোকচিত্রের ইতিহাস, বিবর্তন এবং অগ্রজ আলোকচিত্রীদের কাজের নিখুঁত বিশ্লেষণ সব মিলিয়ে হরপ্পা যেন একটা বিগ পিকচার। এই লেখাটার সূত্রে পুজোর মুখে আমার মনে নানা পুরনো কথা ভিড় করে এল। আপনাদের সঙ্গে তা ভাগ করে নেওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না।

অভিনন্দন সৈকত

অশোক মজুমদার

বর্ধমানের দামোদর নদের তীরে এঁদো গ্রামে বাস সামান্য এক রেলকর্মীর যৌথপরিবারের। চরম অভাব-অনটনের মধ্যে বড়ো হচ্ছিল সেই পরিবারের ছোটো- ছোটো শিশুরা। ওই পরিবারের বড়োছেলে অশোক, আজকের নামি আলোকচিত্রী অশোক মজুমদার। তাঁর মা দেখতেন টু থ্রি-তে পড়া ছেলেটার দেখার চোখটা যেন কেমন অন্যদের থেকে আলাদা। সে কারণে সামান্য রেলকর্মীর গৃহিণী হওয়া সত্ত্বেও তিনি মনে-মনে ভাবতেন একে কিছুতেই তিনপুরুষের মতো রেল-চাকুরে নয়, আলাদা কিছু তৈরি করতে হবে। স্বামীর সঙ্গে প্রায় জোরাজুরি করে অশোককে তিনি ভর্তি করালেন বীরভূমের লালপাহাড়ি মুকুন্দপুর রামকৃষ্ণ বিদ্যাপীঠে। তুম্বানি ফরেস্ট, ছোটো-ছোটো পাহাড়, আদিবাসী সাঁওতালদের গ্রাম, এর মধ্যে অশোক নতুন এক পরিবেশ দেখতে পেলেন। বছরে একবার বাড়ি আসা, বাবা-মাকে ছেড়ে থাকা- সব কিছুই আস্তে আস্তে মানিয়ে নিলেন সময়ের নিয়ম মেনে। আর স্কুলে পড়তে-পড়তেই পরিচয় হল সামাজিক বিভেদ ঘোচানোর স্বপ্ন-দেখা সত্তর দশকের নকশাল আন্দোলনকারীদের সঙ্গে। তারা স্বপ্ন দেখালেন আন্দোলন হবে, বিপ্লব হবে, সমাজে সবার অধিকার সমান হয়ে যাবে। শুনে তাঁর খুব ভালো লাগল এই ভেবে যে মা-কে আর কষ্ট করতে হবে না, বাবাকে আর অভাবে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হবে না। অশোক প্রায় না-বুঝে জড়িয়ে গেলেন সেই সংগ্রামে। পড়াশোনা তখন প্রায় লাটে ওঠার জোগাড়। সঙ্গে মহারাজদের নিষেধ তো ছিলই। কিন্তু কোনও কিছুই তখন আর গ্রাহ্য করার মতো মন ছিল না তাঁর। ফল যা হওয়ার তাই হল ক্লাস এইটের ছাত্রের তিনমাস জেল, জেলে নির্যাতন, অত্যাচার।

জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আবার বাবা-মা-র কাছে ফিরে আসা। তাঁরা তখন হাওড়ার সালকিয়ায় বামুনগাছি রেল কোয়ার্টারে চলে এসেছেন। সেখান থেকে হায়ার সেকেন্ডারি পাস করে কলকাতার কলেজ স্কটিশ চার্চ বিষয় দর্শন। দেখা হল, নকশাল আন্দোলনের জন্য কারাবাস করা পুরনো বন্ধু রঞ্জন সেনের সঙ্গে। শুরু হল পড়াশোনার পাশাপাশি রাজনীতি। কংগ্রেসের ছাত্র সংসদকে পরাজিত করে নজির তৈরি, আরও কত কী! বাবা-মা-র অবশ্য এসব পছন্দ নয়, কিন্তু অশোকের মাথায় যে তখনও দিন বদলাবার স্বপ্ন, বিপ্লবের ঘোর। স্কটিশের হস্টেল ছাড়ার পর অস্থায়ী ঠিকানা বন্ধুদের বাড়ি। তৈরি হয়েছে ছোটো সাংস্কৃতিক দল অন্তঃশীলা। পথনাটক, গণসংগীত, আড্ডা, ঘুরে বেড়ানো, মানুষ দেখা, মানুষ চেনা সব কিছুই চলছে পুরো দমে। আসছেন দীপক মজুমদার, অরূপরতন বসু, জ্যোতির্ময় দত্ত, হামদি বে, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, গৌরকিশোর ঘোষের মতো মানুষেরা। কিন্তু তা-ও কেমন অবসাদ চেপে বসেছিল। তখন সাইকেলে গোটা দুনিয়া ঘুরে-বেড়ানোর একটা বাসনাও গেড়ে বসল মাথায়। বন্ধু বিমানকে নিয়ে গুপ্তিপাড়ায় এক আশ্রমে চলে গেলেন তিনি। তিনমাস ধরে চলল বিবেকানন্দকে নিয়ে পড়াশোনা আর সাইকেল- চালানো অভ্যাস করা। তবু সেখানে থাকতেও আর ভালো লাগছিল না। মনের মধ্যে কাজ করছিল, নতুন কিছু করতে হবে- অন্য রকম কিছু।

এর মধ্যে প্রকাশিত হল নতুন কাগজ আজকাল, সম্পাদক গৌরকিশোর ঘোষ। অশোক যোগ দিলেন চিত্র-সাংবাদিক হিসেবে। কোনও স্থায়ী চাকরি নয়, তুলে-আনা ছবির মধ্যে থেকে গৌরবাবু কোনোটা বাছলে তবেই পয়সা। শুধু অশোক একা নন, যোগ দিয়েছেন একদল নতুন ফোটোগ্রাফার  অমিত ধর, দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবাশিস রায়, ভাস্কর পাল। ছবি তোলাটা রীতিমতো প্রতিযোগিতার মতো বিষয়। অশোক বন্ধুবান্ধবের সাহায্যে ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলে বেড়াতে লাগলেন। রানি রাসমণির বাড়ির কাছে একটা দোকান থেকে সে-টা ডেভেলপ করে প্রিন্ট করে জমা দেওয়া অফিসে। মাসে লক্ষ্য চারশো টাকা। লক্ষ্যে পৌছলে নিশ্চিন্তি। আর কাজ নয়। এবার বেরিয়ে পড়ো পথে-পথে, রেলের কামরায়, অজানাপুরের দিকে।

এভাবে চলতে-চলতেই মা-র কাছে বায়না ধরে নিজের প্রথম ক্যামেরা কেনা অলিম্পাস ও এম-টেন, ছ-হাজার টাকায়। ছোটোবেলা থেকে দেখা গ্রামবাংলা, প্রকৃতি, মানুষ, তাঁকে নতুনভাবে দুনিয়াকে দেখতে দিত। লড়াই করে ছবি বের করতে তাঁর কোনো কুণ্ঠা ছিল না। কেন-না তিনি জানতেন, যে-কোনো ক্ষেত্রে যদি সুস্থ প্রতিযোগিতা হয়, তবে সবাই অন্যদের ছাপিয়ে যেতে চাইবে আর এর ভিতর দিয়ে সকলের সেরাটা বেরিয়ে আসতে বাধ্য। ফোটোগ্রাফির ক্ষেত্রেও এটা সমান সত্যি। গৌরদা এই মনোভাবটা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন সেই তরুণ আলোকচিত্রীর দলবলের ভিতর। কিন্তু কিছুদিন পরেই নিজেই আবার আজকাল ছেড়ে গৌরদা চলে গেলেন আনন্দবাজার-এ। আর তার কয়েক বছর পর অশোকের কাছেও এল আনন্দবাজার-এ যোগ দেওয়ার প্রস্তাব। বন্ধুবান্ধবদের বারণ তাঁকে প্রথমে থামিয়ে দিলেও পরে গ্রহণ করলেন সেই প্রস্তাব। অলোক মিত্র, নিখিল ভট্টাচার্য, তপন দাস, তারাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবীপ্রসাদ সিংহ- এর মতো বাঘা-বাঘা ফোটোগ্রাফাররা আছেন, এবার তাঁদের সঙ্গে ছবির লড়াই হবে, এটা ভেবেই যাওয়া। পদটা স্ট্রিংগারের, আটশো টাকা মাইনে, তারপর ছাপা হলে ছবি পিছু পয়সা। বন্ধুর বাড়ি ছেড়ে এবার অশোকের ডেরা কলেজ স্ট্রিট বসন্ত কেবিন। আনন্দবাজার অফিসের কাছেই, তাই যাতায়াতের সুবিধার জন্য ওই ডেরা বাছা। সকাল-সকাল কোনো ফোটোগ্রাফার আসার আগেই তিনি চলে যান অফিসে, বসে থাকেন টেলিপ্রিন্টারে আসা নানা ঘটনার কথা জানতে, সূত্র ধরে পৌঁছে যান অকুস্থলে, সবার আগে। ছবি ওঠে। জমা দেন। কখনও-কখনও ছাপাও হয়। আবার কোনও সময়ে সিনিয়ার ফোটোগ্রাফার যাওয়া সত্ত্বেও চলে যান একই অ্যাসাইনমেন্টে কিছু করে দেখাবার তাগিদে। দ্বন্দ্বও বাধে আকছার। চলে মন কষাকষি। কিন্তু অশোক তো এ ধরণের চ্যালেঞ্জের জন্যই এসেছেন, প্রতিযোগিতা করে ছবি বের করার যে- মন্ত্র গৌরদা দিয়েছিলেন তা তাঁকে ঠেলে দেয় অসম সংগ্রামে। অনেকে বারণও করেন, কিন্তু অশোক অকুতোভয়।

এই ভাঙাগড়ার মধ্যে দিয়ে আনন্দবাজার- এর ভাবধারায় অশোক নিজেকে তৈরি করে নিলেন। রাত-দিন না-মেনে তিনি কাজ করে চলেন। তিনি জানতেন, ছবি তোলাটা যেমন সহজ নয়, তেমনি সহজ নয় ছবি তুললেই সেটা কাগজে ছাপাটা। কারণ কাগজে পেজ মেক-আপ করাটা অন্য জিনিস। সেখানে হঠাৎ ঘটে যাওয়া বড় খবর বা বিজ্ঞাপনকে জায়গা দেওয়ার জন্য ভালো ছবি তুললেও ছবি না-ও ছাপা হতে পারে। এইভাবে সংগ্রামের রাস্তায় অশোক মজুমদার ধীরে-ধীরে হয়ে উঠলেন আনন্দবাজার-এর স্থায়ী কর্মী, পরবর্তীকালে চিফ ফোটোগ্রাফার।

নিউজের জন্য ছবি তো তুলেছেন, সব সময়ে চেষ্টা করে গেছেন যাতে অন্য ধরনের ছবি তুলতে পারেন। তাতে অনেকের বিরাগভাজনও হয়েছেন। তেমনি তিনি অনেক সময় ছবি তুলে প্রশংসাও পেয়েছেন প্রচুর। এক সময় কলকাতার জন্য বিশেষ পাতায় অনেক বিখ্যাত মানুষের অন্য ধরনের ছবি তোলা ও ছাপার সুযোগ পেয়েছেন টানা তিন বছর। চেনাছকের বাইরে গিয়ে পরিচিত মানুষটির অপরিচিত রূপ তিনি মেলে ধরেছিলেন। যেমন গায়িকা সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে আমরা তাঁর লেন্সের সৌজন্যে দেখেছি দীপাবলি লক্ষীপুজোয় আলপনা দিতে। সাধারণ পাঠককে যেমন চমকে দিয়েছিলেন, তেমনই ছবি তুলে পেয়েছিলেন সুমন চট্টোপাধ্যায়ের প্রশংসা। এছাড়া ডোভার লেনে অনুষ্ঠান করতে আসা উস্তাদ বিসমিল্লা খানের হোটেলের ঘরে ঢুকে তুলেছেন অন্যরকম বিসমিল্লার ছবি তিনি সাধারণ পোশাকে ভৈরবী গাইছেন। একইভাবে পরিচিত অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে খবর পেয়ে অশোক সকাল সকাল চলে গেছেন লেকে হাঁটতে থাকা উস্তাদ আলি আকবর খানের ছবি তুলতে। হাঁটা শেষে উস্তাদের পিছু পিছু গিয়ে তুলেছেন তাঁর দাড়ি কাটাতে সেলুনে-বসা ছবি। আবার সেই সুমন চট্টোপাধ্যায়, ফের প্রশংসা। মনে একটু দ্বিধা ছিল চিরকাল সরোদ বাজানোর ছবি ছাপা হয়েছে যে মানুষটির তিনি ওই ছবি দেখে কী প্রতিক্রিয়া জানাবেন, সাধারণ মানুষই বা কীভাবে নেবেন, খবরের কাগজের বড়োকর্তারা দেখে কী বলবেন। না, যে কারণেই হোক তাঁর ভয়-সংশয় দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কোনো কিছুই বাস্তবে কার্যকর হয়নি। সেদিন অশোকের তোলা ছবিতে সেলুনের আয়নাতে প্রতিফলনসহ নিজের ছবি দেখে স্বয়ং বাবা আলি আকবর খানসাহেব খুশি হয়ে স্বভাবসুলভ সারল্যে বলেছিলেন, এতদিন ছবিতে একটা আমিকে দেখতাম, আজ দুটো আমিকে দেখছি। একই সুরে তুলেছেন হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার ময়দানে দাঁড়িয়ে চানা খাওয়ার ছবি।

সুমন চট্টোপাধ্যায় কাজের নিরিখে অশোককে নিয়ে যেতেন রাজ্যব্যাপী পরিক্রমায়। অশোকও তাঁর মনমর্জিমতো ছবি তুলতেন। তাঁর লেখার সঙ্গে দারুণ মিলে যেত অশোকের তোলা সেই ছবি। একবার মালদায় কাজ করতে গিয়ে সুমন চট্টোপাধ্যায়ের নির্দেশ অমান্য করে সকালে বেরিয়ে গিয়েছিলেন স্থানীয় সংবাদপত্রের খবরের সূত্র ধরে রাজনৈতিক প্রচারকারী মালদা-র ডাকাতদের গ্রামে। ফিরে এসে বকাবকির পর যখন অশোক ওই খবরের কথাটা বলেন সুমনদাকে তিনি তাঁকে সাধুবাদ দিতে দ্বিধা করেননি, এবং ওই রিপোর্টটিকে দ্রুত লিখে পাঠান অফিসে প্রকাশের জন্য।

তবে চিত্র-সাংবাদিকের জীবন তো সর্বদাই বিপদসংকুল। তাই অশোককে বিপদে পড়তে হয়েছে বহুবারই। একবার যেমন বউবাজার মোড়ে বিধানসভা নির্বাচনের সময় বোমাবাজির ছবি তুলতে গিয়ে তাঁকে তুলে নিয়ে যায় দুষ্কৃতিরা। বসিয়ে রাখে কাছাকাছি কোথাও। প্রায় চল্লিশ মিনিট ওখানে থাকার পর ওদেরই একজনের সাহায্যে মুক্তি পান তিনি। ফিরে আসেন অফিসে। তাঁর অভিজ্ঞতার কথাও পরদিন অনুলিখিত হয় কাগজে। এরপর নেপালে রাজা-রানির খুন হয়ে যাবার খবর ছবি তুলতে গিয়ে পড়েন চরম বিপদে। তখন নেপালে কারফিউ। বিকেল চারটের পর বেরলেই বিপদ। ছবি ডেভেলপ-প্রিন্ট করে নিয়ে আসার পথে অশোক পড়েন মিলিটারির খপ্পরে। তারা তুলে নিয়ে যায় তাঁকে সেনাছাউনিতে। বের হওয়ার কোনো সুযোগই তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন না। ওদিকে খবর রটে গিয়েছিল তাঁর নিখোঁজ হওয়ার। তাঁর সহকর্মী, ওই সফরের সঙ্গী হীরক বন্দ্যোপাধ্যায় পর্যন্ত দারুণ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন সেবার। সুমন চট্টোপাধ্যায় দিল্লি থেকে যোগাযোগ শুরু করেছিলেন দূতাবাসে। আর অশোক তখন প্রায় প্রাণের মায়া ছেড়ে দিয়েছিলেন সামরিক কর্মীদের মনমেজাজ দেখে। বারবার মনে পড়ছিল মায়ের কথা, মনে পড়ছিল পরিজনবন্ধুদের কথা। চোখের জল বাধ মানছিল না যেন। অবশেষে এক উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মীর বদান্যতায় রক্ষা পান সেবার।

তিনি মনে করেন, চিত্র-সাংবাদিকের পেশাটাই এমন অনিশ্চিত। এ পেশাকে বেছে নেওয়ার সময় তিনি তা স্বীকার করে নিয়েছিলেন। আর তাই আনন্দবাজারে-এ দীর্ঘদিন চাকরি করার পর আবার বেছে নেন অনিশ্চয়তার ভ্রূকুটি কর্তাদের সঙ্গে মনমালিন্যের জন্য পদত্যাগ করে। ভেবে ছিলেন আবার ফ্রি-ল্যান্স করবেন শুরুর দিনের মতো। চাকরি ছাড়ার পর সেইমতো কথা হয়েছিল এই সময়-সম্পাদক সুমন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। কিন্তু তাঁকে নবান্ন থেকে ডেকে নেন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যাঁর সঙ্গে আলাপ সেই উত্থানের দিন থেকে। দিনের পর দিন তাঁর ছবি তোলার পর যখন ছাপা হত না, অশোক কিন্তু তাঁর ছবি তুলে গেছেন। তাঁর মনে হয়েছিল, মমতার সংগ্রামের গতিপথের একটা ছবিলিপি তৈরি থাকা উচিত। তাই চিত্র-সাংবাদিক হিসেবে অশোক পালন করেছিলেন এক গুরু দায়িত্ব, লেন্স-বন্দি করেছিলেন এক সাধারণ নেত্রীর অসাধারণ হয়ে ওঠার উপাখ্যান। তা-ই এখনো করে চলেছেন, তবে সরকারি তকমা নিয়ে।

জীবনে সফল হয়েছেন কিনা এ নিয়ে এখনও ভাবেন না। ভাবেন গৌরকিশোর ঘোষ থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় থেকে গৌতম চট্টোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময় দত্ত থেকে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় প্রভৃতি যে- গুণীজনের সান্নিধ্য তিনি পেয়েছেন, যা সামান্য জ্ঞান তিনি আহরণ করেছেন তা তাঁকে সঠিক জিনিসকে সঠিকভাবে দেখতে-দেখাতে সাহায্য করেছে। ভুলে যাননি, মায়ের স্বার্থত্যাগ-স্বপ্নের কথা, সেই বন্ধুদের সাহায্যের কথা, আর লড়াই করে উঠে আসার কথা। তাঁর অভিমত, চিত্র-সাংবাদিকতায় এলে চাকরির স্থায়িত্ব নিয়ে ভাবলে চলবে না, অস্থায়ী কাজ নিয়ে চলে যেতে হবে কোনও ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে ছবি তুলতে হবে প্রতিষ্ঠিত ফোটোগ্রাফারদের সঙ্গে। এভাবে উঠে এলেই তবে সম্ভব হবে বিষয়কে জানা-বোঝার। খবরের কাগজে কাজ করতে গেলে শুধু নিজের পছন্দ-অপছন্দর কথা ভাবলে চলবে না, ভাবতে হবে নিউজ-এডিটরের মনের কথা। এ শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন, আনন্দবাজার-এর নিউজ এডিটর বিজয় চক্রবর্তীর কাছে

তবে ফোটোগ্রাফার হিসেবে সংগ্রামে বিশ্বাসী অশোকের কোনোদিন যাওয়া হয়ে ওঠেনি কোনো আসল যুদ্ধক্ষেত্রে। ইচ্ছা থাকলেও যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির কথা ভেবে তিনি মানুষ হিসেবে চান না ওই ভয়াবহ পরিস্থিতির অভিজ্ঞতার অংশীদার হতে। ফোটোগ্রাফার হিসেবে বিধ্বংসী যুদ্ধক্ষেত্রে গেলে তিনি হয়তো পেতেন অহরহ মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ। যুদ্ধের কথা ভাবলেই তাই ভারী খারাপ লাগে। যেমন খারাপ লাগে রাস্তাঘাটে ছবি তুলতে গিয়ে অনাথ বাচ্চাদের দেখে। ইচ্ছে আছে ওদের জন্য একটা হোম বানানোর। আর অভাবী উদ্বাস্তু পরিবারের সন্তান অশোকের বড়ো ইচ্ছে কাজ ছাড়ার আগে পৃথিবীর নানা কোণে বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরের ছবি তোলার। তাদের ছবির ভিতর দিয়ে ফুটিয়ে তুলতে চান কোনো উদ্বাস্তু শিবিরে না থেকেও আশৈশব দেখে আসা কষ্টের ছবি, বেঁচে থাকার জন্য নিত্যদিনের লড়াইয়ের ছবি। হয়তো তারই কোনও একটা ছবির দিকে তাকিয়ে তাঁর নিজেরও মনে পড়ে যাবে মা-র সেই বঁটিতে বাঁধা সুতো দিয়ে একটা গোটা ডিমকে চার টুকরো করে কাটা আর সেই কাটা ডিম হাসি মুখে সবার সঙ্গে ভাগ করে খাওয়ার দৃশ্যটা।