রবিবারের বাবুইবাসা : 28.10.18

।। আত্মকথা, ফৌজিজীবন 2।।

হুমায়ুণ রানা

মরা বোম্বে এক্সপ্রেস ধরে(ভায়া নাগপুর) ভূপাল যাচ্ছিলাম।ট্রেনটি হাওড়া থেকে রাত্রি এগারোটায় ছাড়ে।মিলিটারি কম্পার্টমেন্টে চড়েছিলাম।অনেক ফৌজীলোক আমাদের ভয় দেখাচ্ছিলো।অনেকেই উৎসাহ দিচ্ছিলেন। আমাদের গ্রুপে, আমি ছিলাম সবদিকে এক্সপার্ট।হিন্দী কিছুটা NCC-ক‍্যাম্প করবার দৌলতে শিখেছিলাম। তেজপুরে আর্মিট্রেণিং নিয়েছিলাম। কল‍্যানীতে পুলিশ ট্রেণিং নিয়েছিলাম ইত‍্যিমধ‍্যে। সুতরাং, আমার মনে ভয় বিন্দুমাত্র ছিল না। আমি কিছুই তোয়াক্কা করতামনা। গায়ে অসুরের শক্তি ছিল পূর্বেই বলেছি।ভয় কাকে পাবো? যারা আমাদের ভয় দেখাচ্ছিলো, তাঁদেরকে বললামঃ”আপলোগোকা শরম আনা চাহিয়ে, আপলোগ হামলোগোকো সাহস দেনা চাহিয়েথা লেকিন বহ্ না করকে ডরারহেহো। ভাইয়া আপলোগ ঠিক কাম নেহি কর রহেহো “ওদের সঙ্গে খুব তর্কাতর্কি ও হলো।আমাদের ক’য়েকজন ওদের কথায় ভয় পেয়ে বাড়ি ফিরে আসবার কথা বলছিল।আমি ওদেরকে বুঝিয়ে, আশ্বস্ত করেছিলাম।পরবর্তী জীবনে ওরাই প্রমোশন নিয়ে, জুনিয়র কমিশন অফিসার(jco)হয়েছিল।আমি মেডিক্যাল ডিসচার্জ নিয়েছিলাম।

ভূপাল স্টেশানে নামতেই,একদল ফৌজী আমাদের ঘিরে ধরলেন। আমরা নতুন ট্রেনিজ কিনা জানতে চাইলেন। আমরা সম্মতি জানালে,ওরা আমাদের শক্তিমান গাড়িতে চাপিয়ে র ওনা দিলেন। শহর,জনপদ ছাড়িয়ে,দূর—বহুদূরে সেই ট্রেণিং ক‍্যাম্পে একসময় পৌঁছুলাম। বিশাল বড় তোরণে লেখা ছিল—3 EME TRG centre, BHOPAL যাক ধড়ে প্রাণ এলো। দুদিনের জার্নিতে শরীরমন দুটিই বেকাবু ছিল। একটু আশ্রয়,পেটে অন্ন –দুটোর চাহিদা বেশ ভালোমতন অনুভব করছিলাম। দুইদিকে সুসজ্জিত পাকাবাড়িঘর,ব‍্যারাক,প্লেগ্রাউন্ড চোখে পড়ছিল।মনটায় শান্তি ফিরে আসছিলো। যাক,মাওবাদীদের মত এতকষ্টের ট্রেণিং অন্ততঃ নয়।আমার সাথীদের মনেও একটু আনন্দের ঝিলিক মারছিলো।গাড়িটি একটা ব‍্যারাকের সামনে এসে দাঁড়াল।আমাদের নেমে যেতে বলা হলো।আমরা নিজেদের তল্পিতল্পা নিয়ে, গেটের মধ‍্যে প্রবেশ করলাম।কয়েকজন জুনিয়র অফিসার এগিয়ে এসে,আমাদের অভ‍্যর্থনা জানালেন।তারপর গাছের নীচে মাটি দিয়ে নিকানো (বন্নি)বেদীর উপরে বসতে বললেন।আমি ডকুমেন্ট একজনের হাতে ধরিয়ে দিলাম।তিনি চোখ বোলাচ্ছিলেন।অন‍্যেরা আমাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় মাতলেন।হাসিতামাশাও করছিলেন।বুঝলাম, আমাদের ট্রেণজার্নি এবং বাড়ি ছেড়ে আসার দুঃখ–কষ্টের উপর ভালোবাসার প্রলেপ দিয়ে মন ভোলানোর প্রচেষ্টা।সত‍্যিই তাই,আমরাও অনেকটা মানসিক চাপমুক্ত হয়েছিলাম।ঘন্টাখানেকের পর,আমাদের বিশাল একটি ব‍্যারাকের মধ‍্যে নিয়ে যাওয়া হলো।একজন অফিসার স্টোর খুলে,তিনটে করে কালো কম্বল এবং ট্রেনিং–এর জন‍্য যেসব পোষাক–আশাক সব ইস‍্যু করে দিলেন।আমরা সেই ব‍্যারাকে,পাখার নীচে কম্বল বিছিয়ে ,শোবার ব‍্যবস্হা করলাম।তারপর দুপুরে মেসে খেয়ে এসে লম্বা ঘুম।

বিকেল চারটের দিকে বিশাল বাঁশির ফুৎকারে,বিছানায় ওঠে বসেছি।আমার আগের অভিজ্ঞতা ছিল।আমি সবাই কে ঘুম থেকে ওঠালাম।ফৌজে হাতের ঈশারায় কাজ হয়না।মুরলীর জোরে কাজ হয়।এ যেন মোহন বাঁশী!!এখনো ও বাঁশী আমার পিছু ছাড়েনা!স্বপ্নেও শুনি মুরলীধ্বনি।ইয়াব্বড়ো মোছ ওয়ালা ওস্তাদ স্বপ্নে মাঝে–সাঝে হাজির হয় এ্যাদ্দিন পরেও!!!….তো ঘুম থেকে ওঠে পুনরায় গাছের নীচে গিয়ে বসলাম।একজন মোছ ওয়ালা ওস্তাদ আমাদের গম্ভীর স্বরে হুকুম দিলেন,”সভলোগ চায় পিজিয়ে।”আমরা ইস‍্যু করা ইয়াব্বড়ো মগ নিয়ে মেসের দিকে পা বাড়ালাম।চা খেয়ে ফিরে আসতেই,সেই ওস্তাদ পুনরায় আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন।নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন:—মেরা নাম প্রভাত ভাই।আজসে হম আপলোগোকা ব‍্যারাক ওস্তাদ।কিসিকা কৈ প্রব্লেম হোনেসে হমকো পহ্ লে বতানা।অউর এক বাত।ইস ব‍্যারাক কা মেন্টেন‍্যান্স আপলোগকোই করনা হ‍্যায়।কোই শুখা পাত্ তা,পেপার,গন্দেগি নহি হোনা চাহিয়ে।সভিলোগ সাফসুত্ রা রহেনা বচ্চো।যাও সভি কামমে লগ যাও”।উনি চলে গেলেন।আমরা ব‍্যারাকের আশেপাশে ঘুরে কাগজ,শুকনো পাতা কুড়োতে লাগলাম।শুরু হয়ে গেল ট্রেনিং।সকাল চারটেতে ওঠা।চা খেয়ে,দাড়ি সেভিংকরা ।পিটি করে আসা।টিফিন খাওয়া।হিন্দীশেখা ক্লাসে যাওয়া।আর্মস শিক্ষা।ছুটে,ছুটে পিটি গ্রাউন্ডে।সেখানে মোছ ওয়ালা ওস্তাদ একঘন্টা রানিং,কুস্তিকসরত করাতো।পুনরায় ছুটতে,ছুটতে ব‍্যারাকে ফিরতাম।দুপুরে খাওয়া–দাওয়া,ঘন্টা দুয়েক রেস্ট।আবার ছুটোছুটি।এইভাবে ছ’মাস ট্রেনিং হলো।কিন্তু মজার কথা,প্রায়দিন বৃষ্টি লেগেই থাকতো।ব‍্যারাকে বসেই ট্রেনিং চলতো।এইভাবে বেসিক ট্রেনিং শেষ হলো।পাশিংআউট বেশ ভালোভাবে আমরা উৎরে গেলাম।সবাইকে একমাস ছুটি দেওয়া হলো।একসঙ্গে বেশকিছু টাকাও হাতে পেলাম।ট্রেণ সফরের ফ্রি ওয়ারেন্ট পেলাম।আমরা তখন খুব খুশী।অফিসারদের সঙ্গে গ্রুফ ফটো তুলছি।এ ওর পিছনে লাগছি।মুক্তির উল্লাস।এতদিন বাড়ী ছাড়া।মনে সবার ভিন্ন ,ভিন্ন স্বপ্ন।আমি ক‍্যান্টিনে ছুটলাম, সাবান, ঘড়ি,পাউডার, ক্রিম,সেন্ট কিনতে।ভাই–বোনদের জন‍্য গিফ্ ট কিছু কিনতে।আমার দিদি রীতার বিয়ে হয়েগেছিল।ওরজন‍্য একটি শাড়ি নিলাম।কত স্বপ্ন দুচোখে তখন।আমরা হৈ-ছৈ করে রাত্রের ট্রেণে চড়ে বসলাম।

ইতিমধ্যে বাড়িতে একটি দূর্ঘটনা ঘটে গেছিল।আমার রীতাদির অকস্মাৎ মৃত‍্যু।আমার ট্রেনিংয়ের ক্ষতি হবে বলে কেউ আমাকে জানতে দেয়নি।পরেশরায়চৌধুরী, আমার গ্রামের বন্ধু ব‍্যাপারটা চেপে ছিল।সেও আমাকে ঘূর্ণাক্ষরে বুঝতে দেয়নি।বাড়ি ঢুকতেই,মায়ের হাহাকার কান্না আমার গলা ধরে।আমার দুচোখ জলে ভরে এলো।মনের সব খুশী কর্পূরের মতো উড়ে গেল।আমার দুচোখে অন্ধকার নেমে এসেছিল।মনে হলো আমি অজ্ঞান হয়ে যাব।রীতাদি পণপ্রথার শিকারহয়েছে,কথাটি বিশ্বাস করতেইপারছিলামনা।বুকে বড্ড কষ্ট হচ্ছিলো।বাড়ীর সবার চোখে জল।শান্তাদি আমাকে একগ্লাস শরবত এনে,জোরপূর্বক খাইয়ে দিলো।আমার মনে বদলার ভাবনা জাগছিলো।ক্রোধে চোখদুটো রক্তবর্ণ ধারণ করেছিল।জিজ্ঞেস করলাম, শূয়ারের বাচ্চাটা এখন কোথায়?বাবা বললেন, ওকে পুলিশ এ্যারেস্ট করেছে।

*****************************

।। এত্তা জঞ্জাল ।।

পার্থসারথি গুহ

কদিন সকালে উঠে গোটা দুনিয়া আবিষ্কার করল তাদের সৌন্দর্যায়নের একেকটা অংশ হিসেবে গড়ে ওঠা পার্ক, মল, সিনেমা হল, থিয়েটার, বাজারহাট সব কেমন যেন পালটে গিয়েছে। অন্যান্য সব কিছু অবিকৃত থাকলেও এইসব জায়গায় বাহারি ডাস্টবিনের জায়গা হিসেবে যে সব প্রাণিদের প্রতিমূর্তি তৈরি করা হয়েছিল, সেগুলো বেমালুম পালটে গিয়েছে। আরও অদ্ভূত যেটা তা হল, কুমির, শিম্পাঞ্জি, বাদর, ডলফিন, ভাল্লুকদের জায়গায় সব কটা ডাস্টবিনে রাতারাতি খোদাই করা হয়েছে নানা ঢংয়ের মানুষের মূর্তি। ডাস্টবিনের অবয়বে সুবেশা নারী, পুরুষ তথা পরিচিত সেলিব্রিটিরা যেন বলছেন, ইউজ মি। হায়, এমন দিনও দেখার ছিল। কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই, চেন্নাই বলে নয় এই একই ছবি বিশ্বের সর্বত্র। লন্ডন, ওয়াশিংটন, মিউনিখ, প্যারিস, রোম, মেলবোর্ন, ওয়েলিংটন, জোহানেসবার্গ, বেজিং, টোকিও সব বড় শহর আর শহরতলি জুড়ে জঞ্জাল ফেলার ডাস্টবিনে এক রাতের মধ্যেই গজিয়ে উঠেছে নানা বেশের বাহারি মানুষের মূর্তি। দুনিয়ার সব থেকে অস্বচ্ছ, কূটিল মননশীলতার অধিকারীদের এ যেন এক চরম পুরস্কার। মানবজাতির মধ্যে এই ঘটনা তোলপাড় ফেলে দিলেও এর বীজ কিন্তু বোনা হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগেই।
‌কোনও গভীর জঙ্গল বা গোপনে জায়গায় ওরা সমবেত হয়নি। ওরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছে অস্থায়ী পুলিশ কিয়স্কের একদম উলটোদিকে। তার আগে অবশ্য পুলিশ মামারা জায়গাটা ছেড়ে কোথায় যেন সেঁধিয়ে গিয়েছে। তখন ঘড়ির কাটা জানান দিচ্ছে রাত ২ টো।
‌এমন একটা জায়গা ওরা বেছেছে যেখানে চট করে কোনও বাইরের পাবলিক এসে ভিড় জমায় না। এমনকি ভ্যাবাগন্ড বা ভবঘুরে জাতীয়রাও সহজে এই আস্তানায় আসে না। তার ওপর আশে পাশে বাড়িও সেরকম নেই। রাস্তার অপর প্রান্তে যেহেতু জমজমাট বাইপাস তাই ওদিকটার খেয়াল রাখার জন্যই এই পুলিশ ক্যাম্পটা তৈরি হয়েছে। তাই এখানে সেভাবে দেখা মেলে না কারোরই। আসলে নামেই পুলিশের ক্যাম্প। অন্যান্য ক্যাম্পে যে ব্যস্ততা চোখে পড়ে তার ছিঁটেফোটাও
‌ দেখা যায় না এখানে। এরকম জনবিরল জায়গা তথাকথিত রাষ্ট্রদ্রোহী সংগঠন বা অতি বাম সংগঠনের গুপ্ত মিটিং করার আদর্শ জায়গা বটে। অবশ্য যারা এই বৈঠকের মধ্যমণি তারা কোনও রাষ্ট্র বা দেশ বিরোধিতায় সামিল হন নি। তাদের মূল প্রতিবাদ দুনিয়ার দখলদার মানবজাতির বিরুদ্ধে। সেজন্যই এরা এখানে হাজির হয়েছে জল-জমি-নগর-গ্রাম মায় জঙ্গলের মাতব্বর বলে নিজেদের জাহির করা মানব জাতির বিরুদ্ধে এক নতুন ধরনের লড়াইয়ের মঞ্চ তৈরি করতে।
‌ এদের অনেকের আদি বাড়ি বলতে গেলে জঙ্গলের কথাই বলতে হবে। আবার কেউ কেউ উভচরেও বিচরণ করে থাকে। যেমন এই সভার বয়োজেষ্ঠ সদস্য কুমির জেঠু। তিনিও এই সভা আলোকিত করছেন। অ্যান্টার্টিকা থেকে আসা কচি বয়সের একটি ডলফিনকেও দেখা যাচ্ছে সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বক্তব্য রাখতে। সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে ক্যাঙারু বাবাজীবনও এসেছেন। তাছাড়া দূরের জঙ্গল থেকে বাঁদর, ভল্লুক, শিম্পাঞ্জিদেরও দেখা যাচ্ছে এই বিশেষ মিটিংয়ে হাজির হতে। তা প্রশ্ন উঠতেই পারে জঙ্গলের নিরাপদ আস্তানা ছেড়ে কেনই বা শহরের বুকে এই সভা। সেক্ষেত্রে একটা কথাই জানা গিয়েছে যে শহরকে নিজেদের আড়ত বানিয়ে রেখেছে মনুষ্য সমাজ তাদের কর্মকাণ্ডই টার্গেট এই সভার। রঙবেরঙের শহুরে সভ্যতার সৌন্দর্যায়নের শরিক করে তুলতে অবলা প্রাণিদের যেভাবে চলমান ডাস্টবিন বানানো হয়েছে তার বিরুদ্ধে জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলাই প্রধান লক্ষ্য এই সভার।
‌ মানুষের কিতাবে তো পড়ানো হয় যে কাক হল জমাদার শ্রেণির প্রাণি। তা সেই কাউয়া খুড়োর সঙ্গে ওদের কোনও বিবাদ নেই। আর মানুষ এই কাউয়া জাতিকে জমাদার বলে হয়তো কাকেদের কিছু বৈশিষ্ট্য দেখে। ওরাই তো মানুষের সব রাশি রাশি জঞ্জাল মুখে করে এদিক-ওদিক ফেলে শহরটাকে পরিস্কার রাখে। সে পর্যন্ত না হয় মানা গেল। কিন্তু, হালফিলে ( তাও বেশ কয়েক বছর হল) মানুষ যে জিনিসটা শুরু করেছে তা কিছুতেই ভালো মনে মেনে নিতে পারছে না ওরা, মানে এই মিটিংয়ের মূল উদ্যোক্তারা। আরে বাবা কাউয়া খুড়ো না হয় তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তির জন্য তোমাদের পড়ার বইতে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু, তা বলে ঝাঁ চকচকে মল, রেস্তোরাঁ, বাজার, পার্ক ইত্যাদিতে কোন আক্কেলে ডাস্টবিনের মতো খাড়া করে রাখা হয়েছে ডলফিন, বাদর, শিম্পাঞ্জি, কুমির ইত্যাদি প্রাণিকে।
যেন সবজান্তা মানুষ বার্তা দিচ্ছে, দেখ দেখ, এই হচ্ছে গিয়ে তোমাদের যাবতীয় নোংরা ফেলার জায়গা। যত খুশি জঞ্জাল এখানে ফেল। সে তোমাদের বাড়ির ডাই করা আবর্জনাই হোক আর মল বা পার্কে বেড়াতে গিয়ে এটা-ওটা খেয়ে ফেল না কেন। এমনকি রাতে ছাইপাশ গিলে সেই বিচ্ছিরি গন্ধওয়ালা বোতলগুলোও ওই অসভ্য লোকগুলো মাঝেমধ্যে ফেলে দিয়ে যায় এই প্রাণিদের আকারে সজ্জিত ডাস্টবিনে। এ ব্যাপারেই একটা হেস্তনেস্ত করতে এই সভা ডাকা হয়েছে রাতের অন্ধকারে। যে মানুষ জাতি সারা বিশ্বটাকে এমন নরক-গুলজার বানিয়ে তুলেছে, যাদের মাত্রাতিরিক্ত জ্বালানি ও ভোগ্য পণ্য ব্যবহারের ফলে দুনিয়াটা এখন বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে, তাপমাত্রার রকমফেরে ভয়াবহ সব মহামারি এসে বাসা বাঁধছে, তাঁরাই তো সব চেয়ে বেশি জঞ্জাল-আবর্জনার ধারকবাহক। ওপরে এটা ওটা মেখে যতই প্রলেপ দিক না কেন, ভিতরের শয়তানটা তো ওদের আচার আচরণের মধ্যেই প্রকাশ পাচ্ছে। কুমির জেঠু নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলে উঠলেন, আরে ওরা অলিম্পিক্স, এশিয়ান গেমসে দেশের পতাকা নিয়ে এমনভাবে মার্চ করে যেন দেশপ্রেম উথলে উঠছে। আগে নিজের চারপাশটা ঠিক কর। তাহলে বুঝব তোরা ভগবানের তৈরি শ্রেষ্ঠ জীব। কুমির জেঠুর মুখ থেকে কথা প্রায় কেড়ে নিয়ে শিম্পাঞ্জি মুখ বেঁকিয়ে বলে উঠল, আরে রাখ কুমিরদা, শিষ্টাচার কিনা মানুষের কাছে শিখতে হবে। যারা নিজেদের স্বার্থ ছাড়া কিছু বোঝে না। তাৎক্ষণিক লাভ ওঠাতে অন্য জীবজন্তু বা গাছগাছালিদের কোনও দয়ামায়া দেখায় না তাদের কাছে কি-ই বা আশা করা যায়। ফিচেল ডলফিনের বয়স কম, মিটিং শোনার থেকে এদিক ওদিক ঝাঁপাঝাঁপিতে বেশি মন। সেজন্য একটু আগেই সভার বয়স্ক সদস্যদের কাছ থেকে কড়া ধমক শুনতে হয়েছে। সেই ডলফিন হঠাৎ তিড়িং করে লাফিয়ে উঠে বলে উঠল, আরে মানুষের বন্ধু বলে তোমরা আমায় হয়তো বদনাম দাও ঠিকই। বিশ্বাস করো, যেদিন থেকে ওই ডাস্টবিনে আমাদের মূর্তি খোদাই করেছে বেয়াক্কেলে মানুষ সেদিন থেকে ওদের প্রতি যাবতীয় ভক্তি শ্রদ্ধা উবে গিয়েছে। ওরা শুধু জীবজন্তু বা উদ্ভিদ নয়, নিজেদের পরবর্তী প্রজন্মের কথাই ভাবে না, এতটাই স্বার্থপর। বাদর সব শুনে মাথাটা দিগ্বজের মতো নাড়াতে নাড়াতে বলল, শুধু কি তাই, এখন তো শুনছি, ওদের মধ্যে যারা ধনবান ও ক্ষমতাশালী তারা মঙ্গল গ্রহ আর চাঁদ মামার আস্তানায় পর্যন্ত ডেরা বাঁধার চেষ্টা চালাচ্ছে। ভাব কি মনোবৃত্তি। দশভাগ লোক সুযোগ সুবিধা আছে বলে ফূর্তি করবে, বাকিরা পচেগলে মরবে বসবাসের অযোগ্য হয়ে ওঠা পৃথিবীতে। আমরা বাবা যতই পশু হই না কেন, দল বেঁধে থাকি, যাবতীয় শখ-আহ্লাদ, দুঃখকষ্ট একসঙ্গে ভাগ করে নিই। ওরা পারবে? ভাগ্যিস, মানুষ হয়ে জন্মাইনি। বস্তুত, এই মিটিংয়েই সিদ্ধান্ত হয়েছিল, পদে পদে যে মানুষ অন্য জীবকে ছোট করে দেখায়, তাদের চরম শিক্ষা দিতে হবে। বুঝিয়ে দিতে হবে, হে মানব, কুমির, ভাল্লুক, শিম্পাঞ্জি, বাদররা নয়, এত্তা জঞ্জাল তোমরাই।

*****************************

।। মূল্যায়ণে বাংলা সিনেমা ।।

সুনন্দ সান্যাল

লতি বছরের দুর্গাপুজো ও উৎসব মরসুমের কথা মাথায় রেখে মুক্তি পেয়েছে ছয় ছটি বাংলা ছবি। এমনিতেই সিঙ্গেল স্ক্রিনগুলো বন্ধ হওয়ার মুখে, মাল্টিপ্লেক্সে হিন্দি ছবির দখলদারী, সব মিলিয়ে বাংলা ছবির অবস্হা তথৈবচ। এর জন্য অবশ্যই পূর্ব ভারতের সবথেকে ক্ষমতাশালী প্রযোজনা সংস্হা সম্পূর্ণরুপে দায়ী। তবে ধন্যবাদ জানাই মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মহাশয়াকে যে এখন প্রেক্ষাগৃহে প্রাইম টাইমে বাংলা ছবি দেখানোকে বাধ্যতামূলক করার জন্য। অন্যান্য রাজ্যে প্রথম থেকেই এই আইনটি ছিল।
6টি ছবির মধ্যে 3টি ছবি সেই ক্ষমতাশালী প্রযোজনা সংস্হার। এরাই আবার এই রাজ্যে বাংলা ছবি পরিবেশকের পুরোটাই অধিকার করে বসে আছেন। পরিচালক, প্রযোজক, পরিবেশক, ইম্পা সব কিছুর মাথায় এরাই একচ্ছত্র শাষণ করছেন। তাও যদি সত্যি উন্নয়ণ বা উন্নতি ঘটাতে পারতেন তাহলে কিছু বলার ছিল না, কিন্তু এরা বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পকে শুধুমাত্র ধ্বংসের পথে নিয়ে গেছেন ও যাচ্ছেন।
এরা অনেক প্রতিশ্রুতিবান পরিচালক ও অভিনেতাদের ধ্বংস করেছেন তারও প্রচুর উদাহরণ আছে। প্রথমত, দক্ষিণ ভারতের ছবির হুবুহু রিমেক করে বাংলা চলচ্চিত্র প্রেমীদের আবেগ ও আগ্রহ নষ্ট করে দেওয়া, দ্বিতীয়ত, অন্য কোনও প্রযোজনা সংস্হা ভালো ছবি তৈরি করলে সেই ছবিকে ক্ষমতার জোরে হল না দিয়ে, শো না দিয়ে ধ্বংস করে দেওয়া এই দুই প্রকারে বাংলা ছবির জগতকে কলুষিত করেছে ও করছে এই সংস্হা।
শুধু পুজোর মরসুম বলেই নয়, বছরের যে কোনও সময় তারা এইসব কর্ম করে বেড়াচ্ছে। সবথেকে বড়ো উদাহরণ এই বছরের শ্রেষ্ঠ রহস্য ছবি আলিনগড়ের গোলকধাঁধা। ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে ব্যাপক সাড়া পেলেও 4দিন পর থেকে বহু মানুষ প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি দেখতে গিয়েও দেখতে পাননি, কারণ তখন সেই ক্ষমতাশালী প্রযোজনা সংস্হার একটি ছবি মুক্তি পায়। সমানে সমানে লড়াই হলে জনতার বিচারে যে আলিনগড়ের গোলকধাঁধা অনেকটাই এগিয়ে যেতো তা বলাই বাহুল্য। এরকম অজস্র উদাহরণ আছে। সহজ পাঠের গপ্পো থেকে ককপিট বা বিবাহ ডায়েরিজ।
এই কারণে বাংলা চলচ্চিত্র জগত চলে যাচ্ছে অন্ধকারের দিকে যেখানে বিলু রাক্ষস বা পিউপার মতো ছবি স্হান পায় না, বা মেঘনাদবধ রহস্য হাউসফুল হওয়া সত্ত্বেও প্রেক্ষাগৃহ ছেড়ে দিতে হয়।
তবে এতো করেও ওরাও যে খুব সুবিধা করে নিয়েছে তাও নয়। হিট বা সুপারহিট তো দূর অস্ত ছবির নির্মাণের টাকাই তুলতে হিমশিম খাচ্ছে। শেষ একটি বাণিজ্যিক ছবি ব্লকবাস্টারের মুখ দেখেছিলো 2015 সালে, বিরসা দাশগুপ্তের শুধু তোমারই জন্য, তারপর সব ডাহা ফেল। আমাজন অভিযান ছবি নির্মাণের টাকা তুলে মুনাফা দিয়েছিলো এবং স্যাটেলাইট রাইটসে রেকর্ড করেছে। এরপর যশ বা অঙ্কুশ কেউই জিত বা দেবের মতো ব্যবসা বক্স অফিসে দিতে পারেনি, বলা বাহুল্য ধারেকাছেও যায়নি।
তবুও তারা দক্ষিণী ছবির রিমেক করে যাচ্ছেন, আবার মৌলিক গল্পের প্রতি অতি নজর দিয়েছেন সম্প্রতি। তবে একটা কথা তো মানতেই হবে অপরের ব্যবসা মেরে তো নিজের লাভ হয় না। তবে ওরা যেহেতু ক্ষমতাশালী তাই ছবি ব্রেক ইভেন করলেই বলে দেন ব্লকবাস্টার যেমন এই পুজোয় এক যে ছিলো রাজা এখনও বাজেট তুলতেই অক্ষম তাই রোজ তাবেদারী করা সংবাদমাধ্যমে নিজেদের প্রচার করে চলেছেন। তা করুন কিন্তু অপরকে ছোট দেখিয়ে নিজেকে বড়ো বলা কি সত্য এক শিল্প সংস্হা বা শৈল্পিক মনের প্রকৃত উদাহরণ ? বোধহয় নয়। জনতা জনার্দন তাদের ওপর বিচারের দায়িত্ব দেওয়া জোর করে কিছু চাপিয়ে দিলে তার মধ্যে স্বত:স্ফুর্ততা থাকে না। তাই তো হল সংখ্যা কমিয়ে দিলেও, অসম লড়াইয়ের ময়দান তৈরি করলেও সাধারণ মানুষ হইচই আনলিমিটেড (12দিনে 2.72 কোটি) কিশোর কুমার জুনিয়র (12দিনে 1কোটি 25 লক্ষ) ও মনোজদের অদ্ভুত বাড়ী (12 দিনে 1কোটি) দেখেছেন এই পুজোয়, নিজেদের ছবির বাজেট তুলে ব্লকবাস্টার হয়ে গেছেন।
সর্বশেষে বলবো, পুরোনো প্রবাদটি একটু অন্যভাবে, আপনারে রাজা বলে, রাজা সেই নয়, লোকে যারে রাজা বলে রাজা সেই হয়।

*****************************