মোদির নোটবন্দির জেরে বাড়ির পুজোই বন্ধ হতে যাচ্ছিল

কণাদ দাশগুপ্ত

কণাদ দাশগুপ্ত

“Give me 50 days, burn me alive if I’m wrong: PM”

….. না, এই বেআইনি কাজটা সেরে ফেলা কারো পক্ষেই সেদিন সম্ভব হয়নি। এটা করতে পারলে ভাল হত না খারাপ হত, তা পরের কথা। কিন্তু তিনি নিজে এই “আবেদন” জানালেও একজন ‘জীবন্ত’ প্রধানমন্ত্রীকে জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া যায় নাকি ? তাই তাঁর ডাকে কেউ সাড়া দেয়নি। বাস্তবের আগুন তাঁকে স্পর্শ করেনি, কিন্তু দেশবাসীর ক্ষোভের আগুন মোদিজিকে ছেড়ে কথা বলবে বলে তো মনে হয়না।

8 নভেম্বর,2016, ঠিক দু’বছর আগে, রাত 8টা নাগাদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ডি-মনিটাইজেশন বা নোটবন্দির ‘ঐতিহাসিক’ ঘোষণা করেছিলেন। কেন্দ্রীয় সরকার, শাসক বিজেপি বা বিজেপির সব স্তরের নেতা-কর্মী- সমর্থকরা নরেন্দ্র মোদি সরকারের এই নোটবন্দির মতো পদক্ষেপকে সেদিন স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু গত 2016 সালের সেই ঘটনার 21 মাসের মাথায় ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বা RBI-এর পেশ করা রিপোর্টে কেন্দ্র কিছুটা ব্যাকফুটে চলে যায় বলেই অনেকের ধারণা। RBI রিপোর্টে বলেছিল, নোটবন্দির সময় বাতিল করা 1000 এবং 500 টাকার নোটের 99.03 শতাংশই পুনরায় ফিরে এসেছে। অর্থাত্‍, ওই পরিমাণ টাকা ফের ব্যাঙ্কে জমা পড়ে গিয়েছে। RBI-এর পরিসংখ্যান আরও বলছে, বাতিল হিসাবে গণ্য করা 1000 এবং 500 টাকার মাত্র 10,720 কোটি টাকা জমা ফিরে আসেনি ব্যাঙ্কের ভাণ্ডারে। RBI আরও স্পষ্ট করে বলছে, 2016 সালে 8 নভেম্বর বাজারে ছিল 15.41 লক্ষ কোটি টাকার 1000 এবং 500 টাকার নোট। কিন্তু সেই নোট বাতিলের পর 15.31 লক্ষ কোটি টাকা ফের সিস্টেমে ফিরেছে। এরপরেই প্রশ্ন ওঠে, তা হলে আয়কর বিহীন কালো ট‌াকা যে নোটগুলির হদিশ পেতে সরকার সাধারণ মানুষের উপর ডি-মনিটাইজেশন নামে এক অবর্ণনীয় হয়রানি চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কেন নিয়েছিল? RBI-এর এই রিপোর্টের পর তা কী ভাবে সফল হয়েছে বলে দাবি উঠতে পারে? আজও এমনটাই প্রশ্ন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের। অর্থনৈতিক বিষয়ে সূক্ষ মন্তব্য করার মত জ্ঞানগম্যির অভাব আছে আমার। সে প্রসঙ্গ থেকে সরে যাওয়াই শ্রেয়। বরং নোটবন্দিতে আমার বিপদটা বলি।

2016 সালের 8 নভেম্বর রাতে নোটবন্দি ঘোষণা হয়েছিল। আর সে বছরের জগদ্ধাত্রী পুজো ছিল ঠিক পরের দিন, 9 নভেম্বর। আমাদের বাড়িতে পারিবারিক জগদ্ধাত্রী পুজো হয়। যাদের বাড়িতে একটু বড়ভাবে কোনও পুজো-আচ্চা হয়, তাঁদের একটা ধারনা আছে পুজোর ঠিক আগের রাতে আয়োজক পরিবারের হাল কেমন হয়। বিচ্ছিরি ব্যস্ততা। যতই আগাম সব গোছানো থাক, তবুও পুজোর আগের রাতে ঝামেলা থাকেই। ডেকোরেটর, লাইট, ক্যাটারার, ফুল-মালা, বাজার-হাট,পুরোহিত, ঢাকি, মানে পুজোর সব ক’টি ক্ষেত্রের সঙ্গেই টাকাপয়সার একটা যোগ আছে। সঙ্গত যোগ। ওদিকে টাকাও আছে। কিন্তু প্রায় সবটাই 500 বা 1000 টাকা, মোদিজির অমৃতবাণী শোনার পর যা নিতান্তই কাগজের টুকরোতে পরিনত হয়েছে। কেউই সে টাকায় হাত লাগাতে চাইছেনা। তখনও স্পষ্টভাবে অনেককিছুই ঘোষণা হয়নি। এসব টাকার ভবিষ্যত কি, বদল হবে কিনা, হলে তা কেমনভাবে হবে, সেসব কিছুই জানানো হয়নি নির্দিষ্টভাবে। ফলে 8 নভেম্বর রাতেই পুজো বন্ধ করে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হল। 50% চেকের মাধ্যমে সামাল দেওয়া যাবে, কিন্তু বাকি 50% ? দোকান-বাজার, ঢাকা, পুরোহিত তো নগদেই করতে হবে। সেটাও কম বড় পরিমান নয়।
মোদি সাহেবের কল্যানে সেবার পুজো বন্ধ হওয়ার মুখে। জগৎ জননীর আশীর্বাদে একেবারে শেষমুহূর্তে রক্ষা করল আমার তিন ছোটবেলার বন্ধু, যার দু’জনই অবাঙালি, বড় ব্যবসায়ী। তৃতীয়জন রেলের বুকিং অফিসার। শোনামাত্রই গাদা গাদা 100 টাকার নোট নিয়ে হাজির। 500- 1000 টাকার নোট বদলে দিল 100 টাকায়। কোনওক্রমে মান ও পুজো বাঁচাতে পারলাম। আমি নিশ্চিত, সেদিন আমার মতো একই বিপদে আরও অসংখ্য মানুষ পড়েছিলেন। সবাই রক্ষা পেয়েছেন কিনা জানিনা।

নোটবন্দির ফলে দেশজুড়ে মৃত্যু বা হয়রানির শিকার কম নাগরিক হননি। এবং শেষপর্যন্ত RBI জানালো, এই নোটবন্দিতে লাভের লাভ কিছুই হয়নি। তবে কিছু ‘বোদ্ধা’ এখনও সক্রিয়, যারা নিজেদের বড় মাপের অর্থনীতিক বা নিজেদের রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ঠাকুর্দা ভাবতে ভালোবাসেন, আজও তাঁরা খাওয়া-ঘুম ভুলে নিজেদের স্তাবক প্রমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় বড়ই ব্যস্ত। এটা বেশ চোখে পড়ছে এবং হাসিও পাচ্ছে।