এ এক আশ্চর্য আত্মঘাতী মানসিকতা….অশোক মজুমদারের কলম

অশোক মজুমদার

দক্ষিণেশ্বরের স্কাইওয়াকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গিয়ে মনটা সত্যি ভালো হয়ে গিয়েছিল। বহু প্রতীক্ষিত এই জরুরি কাজটির জন্য সাধারণ মানুষ, সংশ্লিষ্ট হকাররা, পরিবেশপ্রেমী এবং তীর্থযাত্রীরা অবশ্যই বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাধুবাদ দেবেন। সৌন্দর্য ও প্রয়োজনীয়তা এই স্কাইওয়াকে একসঙ্গে মিলেছে। কিন্তু আমাদের অভ্যাস আর বদলালো কই! উদ্বোধনের ভাললাগার রেশ মিলিয়ে গেল একশ্রেণীর মানুষের ঔদ্ধ্বত্য, দায়িত্বজ্ঞানহীন মনোভাব ও বদভ্যাসের কারণে। দেখলাম দুচোখ ভরে দেখার মত আকাশপথটি ইতিমধ্যেই গুটখা ও পানের পিক রঞ্জিত হতে শুরু করেছে। আমরা কিছু হচ্ছে না বলে সমালোচনায় সবচেয়ে এগিয়ে; খবরের কাগজ ও সোশ্যাল মিডিয়াতে লাগাতার শুনে চলেছি বাংলা ও বাঙালি গোল্লায় গিয়েছে বলে প্রলাপ; কিন্তু যা এখানে আছে এবং যা হচ্ছে তাকে সুন্দরভাবে বাঁচিয়ে রাখার ব্যাপারে আমাদের কোন আগ্রহ নেই। এ এক আশ্চর্য আত্মঘাতী মানসিকতা।

নীরদ সি চৌধুরীকে অনুসরণ করে এখানে আমি আত্মঘাতী বাঙালি কথাটা সচেতনভাবে ব্যবহার করলাম না। কারণ, এই অপকর্মটি রাজ্যের বহু মানুষের মজ্জাগত অভ্যাস। এদের অনেকে আজীবন বঙ্গবাসী হলেও বেশিরভাগই এসেছেন বাইরে থেকে। জীবন ও জীবিকার সুযোগ করে দেওয়া বাংলা নামক রাজ্যটির প্রতি এদের যেন কোন মমতা নেই। এটা যেন শুধুই করে কম্মে খাওয়ার জায়গা। এরা কেমন যেন মার্সিনারির মত, যারা কোনকিছুতেই ভ্রূক্ষেপ না করে যন্ত্রের মত মানুষ খুন করে চলেন। এরা খুন করছেন পরিবেশ, পাড়া, পাবলিক প্লেস এবং নিজেদের ভদ্রতা, সভ্যতা ও বিবেচনাবোধকে। বাড়ির দোরগোড়া থেকে সিঁড়ি, রাজপথ থেকে রেল ষ্টেশন, শিক্ষায়তন থেকে হাসপাতাল, প্রেক্ষাগৃহ থেকে পার্ক সবকিছুই তারা প্রতিনিয়ত গুটখা, পানপরাগ ও পানের পিক ফেলে ভরিয়ে তুলছেন। আরও আশ্চর্য লাগে রাজনীতি ও শিল্পসচেতন বলে বহু বিজ্ঞাপিত বাংলায় এদের অপকর্মের প্রতিবাদ করার মত কেউ নেই। শুনতে খারাপ লাগলেও এটা একটা সার্বিক ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতার দায় আমাদের সবার। শুধু পলিটিক্যালি কারেক্ট থাকার জন্য দীর্ঘদিন এই বেয়াদপিকে চলতে দিলে আমাদের পরে অনুতাপ করতে হবে।

বেশ কয়েকবছর আগে করা একটা সমীক্ষায় দেখছিলাম, পানপরাগ ও পানের পিক হাওড়া ব্রিজের মত একটি ঐতিহাসিক নির্মাণকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে। তা নিয়ে কিছুদিন অনেক হৈচৈ হল, অবস্থা কিন্তু এখনও বদলায়নি। তাহলে কি আমাদের সমাজ জীবনের কোন জায়গায় এই অপকর্মটির প্রশ্রয় আছে? আমি বলবো হ্যাঁ, তা না হলে এই অপকর্মটা দিনের পর দিন চলছে কী করে? চলছে এই কারণেই যে, যারা এটা করছেন তারা জানেন তাদের রক্ষা করার মত লোক আছেন। কোন না কোন সামাজিক শক্তি তাদের প্রশ্রয় দেওয়ার জন্য নিঃশব্দে অপেক্ষা করছেন।

নিঃশব্দে কথাটা শুনে অনেকে এতক্ষণে নিশ্চয়ই ভ্রু কুঁচকেছেন, আমি বলি অত উত্তেজিত হবেন না। এদের কে আমি নিঃশব্দে প্রশ্রয়দাতা বলছি, কারণ, এরা ঘোষিতভাবে পানপরাগ, গুটখা বা পান দিয়ে চারপাশ রাঙিয়ে তোলার বিরোধী কিন্তু কখনোই লাগাতারভাবে এর বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধে নামেন না। সেমিনার, পদযাত্রা, বক্তৃতায় কিংবা টিভির টক শোতে কে কী বলেছেন তা আমি ধরছি না। আমি বলছি, বেশ কিছু রাজনৈতিক দলের কথা। ব্যাপারটা যে খারাপ হচ্ছে তা নিয়ে সব দলই সচেতন। শহর সাফ রাখার কাজে সরকারি উদ্যোগের এখন যে কোন ঘাটতি নেই তা বিরোধীরাও স্বীকার করেন। কিন্তু যত্রতত্র পিক ফেলার অভ্যাস সেই উদ্যোগে লাগাতার জল ঢেলে চলেছে। নীল সাদা দেওয়ালগুলো এখন জায়গায় জায়গায় হয়ে উঠেছে পিক লাঞ্ছিত।

এটা শুধুমাত্র পানের পিক নয়, এ যেন আমি যা ইচ্ছা তাই করবো এমন এক মনোভাবের ঘোষণা। এটা রোখা শুধু সরকারের দায় নয়। এব্যাপারে বিরোধীদেরও ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু কোন বিরোধী দলই একক বা যৌথভাবে এই পরিবেশ লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে লাগাতার লড়াইয়ে নামেন নি। শহরকে সুন্দর করতে এখন সরকারিভাবেই নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই উদ্যোগগুলো সুরক্ষার মানসিকতা তৈরি করার কাজে ঘাটতি রয়ে গেছে। মানুষ সচেতন না হলে দৃশ্যদূষণ আটকাতে ২৪ঘন্টা নজরদারি সম্ভব নয়। এটা কোনভাবেই শুধু পুলিশ, শুধু পরিবেশপ্রেমী বা শুধুই সচেতন সাধারণ মানুষের কাজ নয়। শাসক ও বিরোধী দলগুলি যৌথভাবে উদ্যোগ নিয়ে এদের� সবার মধ্যে সমন্বয়সাধন করতে পারেন। তা না হলে কাজের কাজ কিছুই হবে না।

একটি এলাকার সব মানুষ সচেতন হয়ে পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ নিলে কী হয় তা আমরা বাঙ্গুরের মত এলাকায় দেখেছি। তৎকালীন তৃণমূলের পুরপিতা মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য এই উদ্যোগের সূচনা করেছিলেন। পরে তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন দলমত নির্বিশেষে পাড়ার সবাই। প্লাস্টিকদূষণ থেকে দেওয়াল লাঞ্ছনা দুটোই কিন্তু সেখানে অদৃশ্য হয়ে গেছে। এই দৃষ্টান্ত থেকে মানুষ কোন শিক্ষা নেয়নি। ক্ষতিকর বলে সতর্কীকরণ করা হয়েছে এমন সামগ্রীরও বিজ্ঞাপন নিচ্ছেন পাড়ার বারোয়ারি পুজোর উদ্যোক্তারা। স্বাভাবিকভাবেই পানপরাগ ও গুটখার পিকে দৃশ্য ও পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ দুর্বল হতে বাধ্য। মানুষই বা তাদের জ্ঞানের কথা শুনবেন কেন? রাজনৈতিক দলগুলি উদ্যোগ না নিলে এই লড়াই ব্যর্থ হতে বাধ্য। এটা দলগুলি যত তাড়াতাড়ি বুঝবেন ততই মঙ্গল।

প্রতিবাদে, প্রতিরোধে, ত্যাগে, নিষ্ঠায় বাংলার রাজনীতি এমনিতেই বর্ণময়। আমাদের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, উৎসবও স্বাভাবিকভাবেই রঙিন। মুখগহ্বর থেকে বেরিয়ে আসা পান, গুটখার পিকের মত রুচি ও পরিবেশবিরোধী রঙে আমরা তাকে কলুষিত হতে দেব কেন?