একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি…

ক্ষুদিরাম বসু (1889 -1908 খ্রিষ্টাব্দ)

1889 খ্রিষ্টাব্দের 3 ডিসেম্বর মেদিনীপুর জেলার হাবিবপুর গ্রামে ক্ষুদিরামের জন্ম হয়। বাবা ত্রৈলোক্যনাথ বসু এবং মা লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী। এঁদের দুই পুত্র শৈশবেই মারা যান। তাই তিন কন্যার পর যখন তাঁর জন্ম হয়, তখন পরিবার-পরিজনের কথা শুনে, তিনি এই পুত্রকে তার বড় বোনের কাছে তিন মুঠি খুদের (শস্যের খুদ) বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। খুদের বিনিময়ে কেনা, তাই নাম রাখা হয় ক্ষুদিরাম।

1895 সালে তাঁর বাবা ত্রৈলোক্যনাথ বসু এবং মা লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবীর মৃত্যু হয়। তাঁর বড় হয়ে ওঠা বড় বোন অপরূপা’র কাছে। গ্রামের বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষার পর তমলুকের ‘হ্যামিল্টন’ স্কুলে লেখপড়া করেন। 1902 সালে ক্ষুদিরাম ভগ্নিপতি অমৃতর সঙ্গে মেদিনীপুর শহরে চলে আসেন। এই কারণে তমলুক-এর ‘হ্যামিল্টন’ স্কুল তাঁকে ছাড়তে হয়। তাঁকে মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি করে দেন। 1902 সালে তিনি বিপ্লবীদের একটি নবগঠিত দলে যুগান্তরে যোগদান করেন।

1902-03 সালে যখন বিপ্লবী নেতা শ্রীঅরবিন্দ এবং সিস্টার নিবেদিতা মেদিনীপুরে বক্তব্য রাখেন। তখন তাঁদের এই বক্তব্য শুনেই প্রভাবিত হয়ে ক্ষুদিরাম বিপ্লবে যোগ দিলেন। পরবর্তী সময়ে ঋষি রাজনারায়ণ বসুর (1826-1899) ভাইয়ের ছেলে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সান্নিধ্যলাভ করেন। উল্লেখ্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন তাঁর শিক্ষক। 1903 সালে তিনি মেদিনীপুরের কলেজিয়েট ভর্তি হন এবং অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত তিনি শিক্ষা লাভ করেন। 1905 সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ও স্বদেশী আন্দোলনে ক্ষুদিরাম প্রভাবিত হন এবং পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে সত্যেন বসুর গুপ্ত সমিতিতে যোগ দেন। এই সমিতিতে তিনি আরও কয়েকজনের সাথে শরীরচর্চা ও রাজনৈতিক শিক্ষা গ্রহণ করতে থাকেন। এই সময় সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য নেজেকে তৈরি করার জন্য, পিস্তল চালাতে শেখেন। স্বদেশী আন্দোলনের অংশ হিসেবে, তিনি ইংল্যাণ্ডে তৈরি কাপড় পোড়ানো ও ইংল্যাণ্ড থেকে আমদানিকৃত লবণ বোঝাই নৌকা ডোবানোর কাজে ক্ষুদিরাম অংশগ্রহণ করেন। 1906 খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে মেদিনীপুরের এক কৃষি ও শিল্পমেলায় বিপ্লবী পত্রিকা ‘সোনার বাংলা’ বিলি করার সময়, ক্ষুদিরাম প্রথম পুলিশের হাতে ধরা পড়েন, কিন্তু পালিয়ে যেতেও সক্ষম হন। পরের মাসে একই কাজ করার জন্য তিনি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন এবং আদালতে বিচারের সম্মুখীন হন। কিন্তু অল্প বয়সের জন্য তিনি মুক্তি পান।
1907 সালে বিপ্লবীদের গোপন সংস্থায় অর্থের প্রয়োজনে হাটগাছায় বিপ্লবীরা ডাকের থলি লুঠ করেন। মনে করা হয় ক্ষুদিরাম এই দলের সঙ্গে ছিলেন। সেই বছরের 6ই ডিসেম্বর নারায়ণগড় রেল স্টেশনের কাছে বঙ্গের ছোটলাটের বিশেষ রেলগাড়িতে বোমা আক্রমণের ঘটনার সাথে তিনি জড়িত ছিলেন বলেও ধারণা করা হয়। একই বছরে মেদিনীপুর শহরে অনুষ্ঠিত এক রাজনৈতিক সভায় সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হলে, তিনি তাতে অংশগ্রহণ করেন।
ক্ষুদিরামের স্বদেশী আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকার জন্য, তাঁর জামাইবাবু সরকারি চাকরিতে অসুবিধা সৃষ্টি হয়। তাই তিনি ক্ষুদিরামকে অন্য আশ্রয়ে যেতে বলেন। এই সময় তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিলেন মেদেনীপুরের উকিল সৈয়দ আব্দুল ওয়াজেদের বোন।

এই সময় বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ও স্বদেশী আন্দোলনের কর্মীদের কঠোর সাজা ও দমননীতির কারণে, কলকাতার প্রধান প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড বাঙালিদের অত্যন্ত ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন। বিশেষ করে, আলিপুর আদালত প্রাঙ্গনে ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি উচ্চারণ করার জন্য কলকাতার প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড, সুশীল সেন নামক 16 বছরের এক কিশোরকে প্রকাশ্য স্থানে বেত মারার আদেশ দেন। 1907 সালে অল্প সময় পরে কলকাতার মানিকতলায় মুরারীপুকুরে বারীনকুমার ঘোষের বাগান বাড়িতে একটি সশস্ত্র বিপ্লবী দলটি গঠিত হয়েছিল। এই দলটি পরবর্তী সময়ে ‘যুগান্তর বিপ্লবী দল’ নামে পরিচিতি লাভ করে। যুগান্তর বিপ্লবী দলের পক্ষ থেকে ‘কিংসফোর্ড’কে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। নিরাপত্তার কারণে
কিংসফোর্ডকে বিহারের মজফফরপুরে বদলি করা হয়। ফলে কিংসফোর্ডকে হত্যা করার দায়িত্ব পড়ে প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরামের উপর।

1908 সালের 30 এপ্রিল রাত 8টার সময় ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী রাতের অন্ধকারে, স্থানীয় ইউরোপীয় ক্লাবের গেটের কাছে একটি গাছের আড়াল থেকে কিংসফোর্ডের গাড়ি ভেবে, একটি ঘোড়ার গাড়িতে বোমা মারেন। ফলে এই গাড়িতে বসা নিরপরাধ মিসেস কেনেডি ও তার কন্যার মৃত্যু হয়। পুলিশ তল্লাসি চালায়। ক্ষুদিরাম বসু হত্যাকাণ্ডের স্থল থেকে প্রাণ 25 মাইল দূরে ওয়েইনি 1মে স্টেশনে ধরা পড়েন। ওই সময় বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকীকেও ধরার চেষ্টা করা হলে, তিনি নিজের রিভলবারের গুলিতে আত্মঘাতী হন। তিনি বোমা নিক্ষেপের সমস্ত দায়িত্ব নিজের উপর নিয়ে নেন। কিন্তু অপর কোনোও সহযোগীর পরিচয় দিতে বা কোনও গোপন তথ্য প্রকাশ করতে রাজি হননি। ভারতীয় দণ্ডবিধি 302 ধারায় তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ফাঁসির আদেশ শুনে ক্ষুদিরাম বসু হাসিমুখে বলেন, মৃত্যুতে তাঁর কিছুমাত্র ভয় নাই। ফাঁসি কার্যকর করার আগে তাঁর শেষ ইচ্ছা কি জানতে চাওয়া হলে- তিনি বলেন যে, তিনি বোমা বানাতে পারেন। অনুমতি দিলে তিনি তা সকলকে শিখিয়ে দিতে পারেন। বলাই বাহুল্য এই ইচ্ছা ব্রিটিশ কর্মকর্তারা গ্রহণ করেননি। পরে দ্বিতীয় ইচ্ছা পূরণের কথা বলা হলে- তিনি জানান তাঁর বোন অরূপাদেবীর সাথে দেখা করতে চান। কিন্তু তাঁর জামাইবাবুর বাধায় সে ইচ্ছা পূর্ণ হয়নি। তবে মেদেনীপুরের উকিল সৈয়দ আব্দুল ওয়াজেদের বোন (নাম জানা যায় নি), তাঁকে বোনের স্নেহে আশ্রয় দিয়েছিলেন। তিনি বিপদ মাথায় নিয়ে ক্ষুদিরামের সাথে দেখা করেছিলেন।
মজফফরপুর জেলেই 1908 সালের 11 অগাস্ট ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। এই সময় তাঁর বয়স ছিল 18 বৎসর 7 মাস 11দিন।

এই ফাঁসির সংবাদটি অমৃতবাজার পত্রিকার 12 ই আগষ্ট যেভাবে প্রকাশিত হয়েছিল– সেটি তুলে দেওয়া হল

মজঃফরপুর, 11 অগাস্ট অদ্য ভোর ছয় ঘটিকার সময় ক্ষুদিরামের ফাঁসি হইয়া গিয়াছে। ক্ষুদিরাম দৃঢ় পদক্ষেপে প্রফুল্ল চিত্তে ফাঁসির মঞ্চের দিকে অগ্রসর হয়। এমনকী তাহার মাথার উপর যখন টুপি টানিয়া দেওয়া হইল, তখনও সে হাসিতে ছিল। কথিত আছে, হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যান অগ্নিযুগের প্রথম শহিদ ক্ষুদিরাম বসু। তাঁর নির্ভীক দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ বাংলার যুবসমাজকে বিপ্লবী মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

তাঁর স্মরণে বাঁকুড়ার লোককবি পীতাম্বর দাস রচনা করেন ‘একবার বিদায় দে-মা ঘুরে আসি।’ ভারতের স্বাধীনতার পরে এই গানটি রেকর্ড করেছিলেন লতা মঙ্গেশকর।