সুমির স্বপ্ন

ড.দেবানী লাহা(মল্লিক)

”উফফ্ সুমি ছটা বেজে গেল।ওঠো ওঠো উঠে পড়ো।ড্রাইভারকাকু এসে যাবে,স্কুলে দেরী হয়ে যাবে।পড়াগুলো রিভিসন করার কথা ছিল করলে না,আজ ক্লাসে শর্ট টেস্ট আছে,ক্যুইজ কম্পিটিশান আছে।জেনারেল নলেজগুলোও একটুও দেখলে না।এত লেজি আর ইরেসপন্সিবিল হয়ে যাচ্ছ কি বলব!”

রোজ-রোজ সক্কাল-সক্কাল মায়ের এই বকুনি খেতে-খেতে ঘুম ভাঙে সুমির।এক-একদিন এক-একরকম।একটুও ভাল লাগে না ওর।একটু বেলা অবধি ঘুমোতে ইচ্ছে করে।ইচ্ছেমতো খেলা করতে ইচ্ছে করে।পরমা মুখার্জ্জী আর সোহম মুখার্জ্জীর এইসময় খুব তাড়া থাকে।দুজনেই অফিস বেরোবে।ওরা সুমিকে স্কুলে নামিয়েই অফিস চলে যাবে।অফিস, টাকা,স্ট্যাটাস,মান-সম্মান,খ্যাতি এই নিয়েই ওরা মশগুল।এখন টিঁকে থাকতে গেলে অনেক-অনেক টাকা চাই।ওরা বাড়ী ফিরবে সেই-ই রাতে।বিকেলে সুমি স্কুল থেকে বাড়ী ফিরবে।একা-একা বসে সুজাতা দিদির বানিয়ে দেওয়া টিফিন খেতে না খেতেই পিউ আন্টি চলে আসবে পড়াতে।এইসময়টা তবু একটু ভাল। পিউ আন্টি পড়ালেও সুমিকে খুব ভালবাসে।কিন্তু হলে হবে কি!এরপরই গাদা-গাদা হোমওয়ার্ক,তারপর ড্রইং,তারপরই প্রোজেক্ট,তারপর—তারপর—তারপর—-। খুউউউব ঘুম পেয়ে যায় সুমির।কিছু আর ভাল লাগেনা।পিঠে খুব ব্যথা করে–ব্যাগটা কি ভারী–চোখে জল এসে যায় ওর।কখন ঢুলতে -ঢুলতে টেবিলে মাথা রেখে বই-খাতার ওপরেই ঘুমিয়ে পড়ে ছোট্ট সুমি।

”সুমি এই সুমি আজ ক্যুইজ কম্পিটিশানে প্রাইজ পেলে?পাওনি তো?জেনারেল নলেজ তো জিরো!দেখেছো তো প্রতিবার রিয়া কেমন ঐ প্রাইজটা জিতে নেয়!তুমি কিছুই পারো না।যুগের সাথে একটু আপ ট্যু ডেট করো নিজেকে!”

সকালের মত রাতেও মায়ের বকুনিতেই ঢুলু-ঢুলু চোখ মেলে তাকায় ন-বছরের সুমি।

”মাম্মাম আজ যে বলেছিলে ক্ষীরের পুতুল আর টুনটুনির বই কিনে আনবে?এনেছো?”

সুমির কথার কোনো উত্তর দেননা পরমা মুখার্জ্জী।মনে-মনে ভাবেন পড়া শেষ করতে পারে না।আবার গল্পের বই!কান্না উথলে ওঠে সুমির মনের ভেতর।

”মাম্মাম কত কি সব বলে যাচ্ছে কিছুই তার মাথায় ঢুকছে না।মাম্মাম খালি বকে!এই কর সুমি! ঐ করো সুমি!তুমি কিচ্ছু পারোনা।আমি পারি– গান গাইতে পারি,রাইমস বলতে পারি,ড্রইং পারি— সব পারি সব—।”

এক আকাশ অভিমান নিয়ে মনে-মনে বলে সুমি।উদাস হয়ে টিভির খবরের দিকে তাকিয়ে থাকে।

”পাপাও কিছু শোনে না ওর কথা।খালি ফোন আর টিভি।”

কেউই ওর কথা শোনেনা।

”আজও মনে হয় আন্টির সাথে এইসব আজগুবি গল্প করেছো?দেড় ঘন্টার ভেতর যদি চল্লিশ মিনিট গল্প শুনে কাটিয়ে দাও তো পড়াশোনা হবে আর?মাস গেলে এতগুলো টাকা যাচ্ছে।খালি অন্যদিকে মন আর চঞ্চলতা!তোমার যে কি হবে সুমি!আর ভাবতে পারছি না আমি।এইবারও পি টি এমে ক্লাস টীচার কমপ্লেন করলেন তুমি ভীষণ অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছ।পড়ায় মন নেই।শুধু খেলা আর ফ্যান্টাসির জগতে ঘুরে বেড়াচ্ছ।”

পরমা দেবীর গলায় আক্ষেপের সুর।

”না না এইবার তো দেখছি তোমাকে বোর্ডিং এ পাঠাতেই হবে।আর পিউ আন্টির কাছে তোমার পড়াও বন্ধ।মোনালিসা ব্যানার্জ্জী কেই ঠিক করব নেক্সট মান্থ থেকে।ঐ রকম কড়া টীচারই তোমার জন্য ঠিক।”

কঠিন গলায় পরমা মুখার্জ্জী জানিয়ে দেন সুমিকে।

”না গো মাম্মাম না! পিউ আন্টিকে তুমি ছাড়াবে না।পিউ আন্টি খুব ভাল।আমাকে গান শোনায়,আবোল -তাবোলের ছড়া শোনায়,টুনটুনির গল্প বলে।আমাকে কত্ত আদর করে।রোজ টফি দেয়,চকোলেট দেয়।তুমি তো রোজই সব আনতে ভুলে যাও।”

সুমির গলায় অভিমান ঝরে পড়ে।জানো মাম্মাম পিউ আন্টি আমায় কি সুন্দর রাইমস ওয়ালা গল্প বলে-

”রাজার ঘরে যে ধন আছে
টুনির ঘরেও সে ধন আছে।”

” কি মজা কি মজা
রাজা খেল ব্যাঙ ভাজা।”

তারপর ঐ যে-

”কে ভাই টুনি ভাই
খাট পেতে দিই
ভাত বেড়ে দিই
খাবে ভাই?”

” বোম্বাগড়ের রাজা ছবির ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখে আমসত্ত্ব ভাজা—–”

সুর করে-করে ছোট্ট সুমি বলে যায়।কি উৎসাহ! কি উদ্দীপনা!এখন আর তার ঘুম পাচ্ছে না।আশ্চর্য! পরমা দেবী অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন।পড়ার বইয়ের রাইমস বলতে, টেবিলস বলতে কতবার হোঁচট খায় সুমি।এরবেলা দিব্যি গড়-গড় করে বলে যাচ্ছে তো!বাড়ীতে আন্টি এসে যদি এইসব শিখিয়ে টাইম ওয়েস্ট করে তো কি আর করা যাবে!একটা স্টেপ নিতেই হবে এইবার।নাহলে এবারেও কোনো পজিশান পাবে না মেয়েটা। চিন্তার ভাঁজ পড়ে সুমির মায়ের কপালে।মেয়েটা কি আর মানুষ হবে না?রাতে সুমির বাবার সাথে সুমির মায়ের গভীর আলোচনা হয় সুমির অন্যমনস্কতা,
সিলি মিস্টেক,ক্লাসে পিছিয়ে পড়া।তাহলে কি সুমির কাউন্সেলিং করাতে হবে?ব্যস্ত যান্ত্রিক জীবনের একরাশ ক্লান্তি মেখে ঘুমিয়ে পড়েন সুমির বাবা-মা দুজনে।
ছোট্ট সুমিও তার একলা খাটে মনের দুঃখে ঘুমিয়ে পড়ে।ঠাম্মা কেমন গল্প বলতো,রাতে কোলের কাছে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিত।এখন আর কেউ তাকে ভালবাসে না,আদর করে না।শুয়ে-শুয়ে ক্লান্ত সুমির চোখে নামে ঘুম।আসে স্বপ্নের দল।

”ঐ তো ঐ তো পিউ আন্টি না?ঠিক যেন পরীদের রাণী!কি সুন্দর লাগছে!সাদা দুটো ডানা,গোলাপী গাল,নীল চোখ! কি মিষ্টি করে হাসছে!পাহাড়ের ওপর বিরাট বড় নীল আকাশ।সেখানে চাঁদ তারাদের রাজত্ব।তার নীচে বড় সবুজ মাঠে কত্ত বাচ্ছারা খেলা করছে!কেউ ওদের বকছে না,পড়তে বলছে না,কি আনন্দ!আচ্ছা পিউ আন্টির মুখটা আস্তে-আস্তে মাম্মামের মত হয়ে যাচ্ছে কেন?এইটা কি মাম্মাম?নাকি পিউ আন্টি?সুমিকে কত্ত আদর করছে মাম্মাম,গান গাইছে,ক্ষীরের পুতুল,টুনটুনির গল্প বলছে।আবোল-তাবোলের ছড়া বলছে।কোলের কাছে বসে খাইয়ে দিচ্ছে।এই মাম্মামটাই খুব ভাল।উফ্ফ! মাম্মাম! পিঠে কি ব্যথা লাগছে!ব্যাগটা কি ভারী!আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেবে?বইয়ের লেখাগুলো খুব ঝাপসা—মাথায় ব্যথা করে—মনে পড়ছে না কিছু—অন্ধকার হয়ে গেল কেন সব?পিউ আন্টি তুমি কোথাও যাবে না—কোনোদিনও যাবে না —তুমি কি মাম্মাম?মাম্মাম—মাম্মাম—।”

ভোরের আলো এসে পড়েছে সুমির চোখে-মুখে।

”সুমি ওঠো,ওঠো, উঠে পড়ো ড্রাইভারকাকু এসে যাবে—স্কুল দেরী হয়ে যাবে—এত লেজি হয়ে যাচ্ছ না আজকাল—আজ আবার ক্লাস টেস্ট—সুইমিং—।”

একরাশ বিষাদ এসে সুমিকে জড়িয়ে ধরে।স্বপ্নেরা এইরকম রোজ রোজ হারিয়ে যায় কেন?ছোট্ট সুমি বুঝতে পারে না।