বিজেপির মোক্ষম চালে বাম-তৃণমূল বেসামাল, শুভাশিস রায়ের কলম

শুভাশিস রায়

বিজেপির অগ্রগতি এ রাজ্যে ক্রমশ বাড়ছে এবং আগামী কয়েক বছর তা বাড়তেই থাকবে। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং রাজ্য নেতৃত্ব আন্দোলনের ঝাঁজ এবং প্রচার তুঙ্গে নিয়ে যাবে বাংলায়।

বাংলায় মুসলিম ভোট একটা বিশেষ ভূমিকা নেয় যে কোনও নির্বাচনে। কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না বাংলায় প্রায় 70 শতাংশ হিন্দু বাস করে। হিন্দু ভোট (যা প্রায় 74 শতাংশ)বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে যায়। সংখ্যালঘু ভোট সেরকম নয়। এখন যদি মুসলমান ভোট বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে যায় তাহলে স্বভাবতই লাভবান হবে ভারতীয় জনতা পার্টি। আর এটা না হলেও কিছু মুসলমান ভোট পেলেও চলবে। কারণ, ততক্ষণে হিন্দুদের যথেষ্ট চাগানো হয়ে যাবে।

বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নিশ্চয়ই সমীক্ষা মারফত জানতে পেরেছে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সম্ভাবনা আছে তাইতো তারা ঝাঁপাচ্ছে। তারা জানেন বাংলায় তৃণমূল বিরোধী একটা বৃহৎ ভোট আছে। সেটার সিংহভাগ বামেদের, কিছুটা কংগ্রেসের। কংগ্রেসের পুরনো দিনের সিংহভাগ কর্মী তৃণমূলে চলে গেছে, তাই তারা আজ দুর্বল। এই অবস্থায় বিজেপির তিনটি পরিকল্পনা বাজিমাত করতে পারে।

পরিকল্পনা –1

যতটা সম্ভব মমতা বিরোধী কথা বলা এবং মমতা বিরোধী আন্দোলনের ঝাঁজ বাড়িয়ে তোলা। তাতেই কাজ দেবে বাম কর্মী-সমর্থকদের মন জয় করতে। বিজেপির এটাও জানা আছে যেসব বাম কর্মী তৃণমূলের কাছে হেরে দুঃখ পেয়েছে তাদের সবাইকে টানা যাবে না। কিন্তু বাম জামানায় ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া কমরেড দের দলে নেওয়ার সুযোগ আসবেই আসবে। শেষ কয়েক বছর বামফ্রন্টের পাড়ায় পাড়ায় সামনে থাকা মুখগুলো ক্ষমতা চলে যাওয়াতে যথেষ্ট হতাশ। তারা এখন সমাজবাদের কথা চিন্তা করে না তাদের একমাত্র চিন্তা মমতাকে হারিয়ে ক্ষমতা দখল। ভুলে গেলে চলবে না এই তীব্র “মমতা বিরোধী বাদ’ সিপিএম এর নেতৃত্বেই তৈরি। আজ তার সুযোগ নিচ্ছে বিজেপি। সেলিম সাহেব কলকাতায় বসে যতই বলুন না কেন ‘দিদিভাই মোদি ভাই’, সিপিএমের তলার কর্মীরা কিন্তু সেরকম মনে করছে না। তারা বিজেপির সমর্থনে নেমে পড়েছেন এবং আরো নামবে। এর মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ ও থাকবেন।

পরিকল্পনা- 2

তৃণমূলের অন্দরে বিভেদকে আরও উস্কে দিয়ে তার থেকে দল ভারী করা। বিজেপি কিন্তু তৃণমূলের কোনও নেতাকে নিতে চায় না। কারণ, তারা জানেন যে নেতারা তৃণমূলে থেকে সর্বদা দলীয় কোন্দলে ব্যস্ত থাকত তারা বিজেপিতে এসেও একই কাজ করবে। সাংসদ বিধায়ক হওয়ার চেষ্টা করবে তার পরে সুযোগ বুঝে আবার তৃণমূলে চলে যাবে। তার চেয়ে কর্মী-সমর্থকদের টার্গেট করা অনেক ভাল। বহু পুরোনো কর্মী ক্ষমতা পাওয়ার পরে প্রায় অলস জীবন-যাপন করছে। বহু দুর্দিনের কর্মী আজ খবরের কাগজে রাজনৈতিক পাতাটাই পড়ে না। বিজেপির দরকার এইসব সমর্থকদের। স্বভাবতই বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মুকুল রায় কে দায়িত্ব দিয়েছে হতাশগ্রস্ত তৃণমূলীদের একজোট করতে পারলে তাদের দলে নাও না হলে সমর্থন নেওয়ায়ই যথেষ্ট।

পরিকল্পনা-3

সাম্প্রদায়িক জিগির এমনভাবে তোলা যেন বাংলার হিন্দুদের মধ্যে একটা সমর্থন বা দুর্বলতা দেখা দেয় বিজেপির উপর। 1992 এর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রাক্কালে বিজেপি রথযাত্রা করেছিল। তার পরবর্তিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষ করে গো-বলয়ে এই রথযাত্রা দেখা গেছে। ভারতবর্ষে যত সংখ্যক মানুষ নাস্তিক বলে পরিচিত তাদের সিংহভাগই বাংলায় থাকে। বাংলায় যারা নাস্তিক নয় তারাও যে খুব একটা ঈশ্বরে বিশ্বাসী এ কথা বলা যায় না। এ কথা বলা যাবে না পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী হিন্দুদেরকে চট করে সাম্প্রদায়িক করে তোলা যাবে। তবু চেষ্টা করতে ক্ষতি কি, এমন একটা আবহাওয়া তৈরি হয়ে গেছে। শুধু ফসল তোলার অপেক্ষায়, আর ঠিক সেই কারণেই ডিসেম্বর মাসে এই রথযাত্রার পরিকল্পনা।

কোনওরকম সংশয় না রেখে দ্বিধাহীনভাবে বলা যায় যে এই রথযাত্রার প্রচার এবং প্রভাবে সিপিএমের সম্প্রতিক মিছিলগুলো থেকেও অনেক বেশি। যদিও সিপিএমের মিছিল গুলোতে এখন যথেষ্ট মানুষ যোগদান করছেন।

এই তিন চালে বাম ও তৃণমূল  যথেষ্ট চাপে আছেন। বামেদের একটাই ভয় তাদের দীর্ঘদিনের ভোটারদের গেরুয়াকরণ না হয়ে যায়। এটা একটা চ্যালেঞ্জও বটে সূর্যবাবুর সেলিম সাহেবদের। অবশ্যই ওনারা এ নিয়ে চিন্তা করছেন। আর তৃণমূলের নেতৃত্ব নিশ্চিত ছিল গত বিধানসভা ভোটে, যে সিপিএমই বেশি ভোট পাবে। বিজেপি কিছু বাম ভোট কাটবে তৃণমূল হাসতে হাসতে 235 পার করবে। বাম নেতৃত্ব হয়তো স্বীকার করবেন না, কিন্তু তারা তখনও বুঝতে পারেননি বাম শিবিরে গেরুয়া করন শুরু হয়ে গেছে। তাহলে আর যাই হোক সেঞ্চুরি হাঁকানোর কথা বলতেন না।

তাই বামেদের এখন আবার সিঙ্গুর থেকে মিছিল করতে হচ্ছে। রতন টাটা কে সমর্থন করতে গিয়ে বোকা বনে যাওয়া সিপিএম সেই ন্যানোর স্বপক্ষে মিছিল করছে। যে ন্যানো গুজরাট থেকেও উধাও। আর মুখ্যমন্ত্রীকে দীর্ঘদিন বাদে বলতে শোনা যাচ্ছে হার্মাদদের কথা। উনি একথাও স্মরণ করিয়ে দিতে ভুলছেন না, কিছু হার্মাদ এখন বিজেপিতে। দিদির এই সিপিএম বিরোধী কথাগুলো অবশ্যই সিপিএমকে শক্তি যোগাবে কিন্তু বিজেপি সে খেলায় অনেক এগিয়ে। এখন দেখার রথযাত্রা স্বভাব নাস্তিক বাঙ্গালীদের কতটা নাড়া দেয়।