শুভজিৎ- এর লড়াই কে কুর্নিশ করুন

শুভজিৎ দত্ত

পৃথিবীর প্রথম লিউকোমিয়া পেশেন্ট যে পৃথিবীর সব থেকে গভীরতম গিরিখাত পেরিয়ে মোটরসাইকেল এ সফলভাবে পৌঁছাতে পেরেছেন নেপালে। নেপালের মুসতাং ভ্যালিতে 3710 মিটার উচ্চতায় অবস্থিত মুক্তিনাথ মন্দির।

যাত্রা পথ – সল্টলেক (পশ্চিমবঙ্গ ,ভারত)- মুজাফরপুর (বিহার, ভারত)- হেতুদা (দক্ষিণ নেপাল)- পোখারা (নেপাল) – বেণী (নেপাল)- জুমসুম (নেপাল)- কাগবেনী( নেপাল)- মুক্তিনাথ (নেপাল)- লেটে (নেপাল)- পোখারা (নেপাল)- রামগরওয়া (বিহার , ভারত) -সল্ট লেক (পশ্চিমবঙ্গ , ভারত )

“You can’t go back and change the beginning but you can start where you are and change the ending” C S Lewis এর এই বিখ্যাত উক্তিটি কোথাও যেন আমার জীবন যুদ্ধে সাহায্য করে| আমি শুভজিৎ দত্ত, বয়েস 30, বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের খড়দহ তে। পেশাগতভাবে আমি এক বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত। মোটরসাইকেল এ ঘুরে বেড়ানোটা আমার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ শখ | 2016 সাল এর নভেম্বর মাসে হঠাত লিউকেমিয়া (এক ধরণের ব্লাড ক্যান্সার ) এ আক্রান্ত হয়ে পড়ি। মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল আমার জীবনের সব থেকে প্রিয় শখটা আর হয়তো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবেনা| গত 2 বছর ধরে চিকিৎসা চলাকালীন মাঝে মধেই মনে হতো সব কিছু হয়তো এখনো শেষ হয়ে যায়নি। আত্মবিশ্বাস আর চেষ্টা থাকলে এখনো হয়তো আমি আগের মতোই জীবন যাপন করতে পারব। তাই কিছুটা মনের জোর বাড়িয়ে 2017 তে স্ত্রী কে নিয়ে বেরিয়ে পরেছিলাম হিমাচল প্রদেশ এর স্পিতি ভ্যালি তে। কিছুতা আন্তবিশ্বাস ফিরে পাই। আরও কিছুটা নিজেকে পরীক্ষা করতেই এই বছর আবার ও বেরিয়ে পড়েছিলাম স্ত্রী কে নিয়ে পৃথিবীর গভীরতম গিরিখাত পেরিয়ে মুক্তিনাথ মন্দিরের পথ এ।

নেপালের মুসতাং ভ্যালিতে 3710 মিটার উচ্চতায় আছে মুক্তিনাথ মন্দির। 21 অক্টোবর এর ভোর 3:30 তে নাগাদ আমরা যাত্রা শুরু করি। কলকাতা থেকে সোজা ধোবি পৌঁছাই 2 নম্বর ন্যাশনাল হাইওয়ে ধর। ওখান থেকে বুদ্ধগয়া, পাটনা হয়ে সোজা মুজ্জাফরপুর। তারপর রাক্সাউল- বীরগঞ্জ আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে পৌঁছে যাই নেপাল।

হিমালয় এ অবস্থিত এই ছোট্ট দেশটি কে প্রকৃতি ঢেলে সাজিয়েছে। বন- জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ি রাস্তা, আর দূরে উঁকি মারছে বরফের চূড়া। বেণী অবধি রাস্তা বেশ ভালই। বেণী পেরোনোর পরই হঠাৎ পাহাড়ি রাস্তা ভরে যায় কাদা আর নুড়ি পাথরে। এক দিকে কালী গান্দাকী নদী আর আর অন্য দিকে তুষারাচ্ছান্ন অন্নপূর্ণা পর্বতমালাকে সঙ্গে নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চললাম গন্তব্যের দিকে।

রাস্তার প্রতিটি বাঁকে দৃষ্টি চলে যাচ্ছিল তুষারাবৃত পর্বতমালা আর কালী গন্ডাকি নদ। সহস্র বছর আগে ভৌগোলিক কারণে তৈরি এই গিরিখাত। নদী কিভাবে গিরিখাত তৈরী করেছে সে এক অপূর্ব দর্শনীয় জিনিস। সব থেকে গভীরতম গিরিখাত এর অংশ তা রয়েছে লেতে নামক একটা পাহাড়ি গ্রামের কাছে আর সেটা পেরিয়েই আমাদের গন্তব্য মুক্তিনাথ মন্দির।

পথে অনেক নাম না জানা ছোট ছোট গ্রাম এ দাঁড়িয়ে প্রকৃতিকে অনুভব করার সুযোগ পেয়েছি। কোথাও পাহাড়ি নদী শুকিয়ে মাইলের পর মাইল নুড়ি পাথরের রাস্তা, কোথাও সরু রাস্তা সোজা উঠে গেছে দুপাশে খাড়া ঢালের মধ্যে দিয়ে| কোথাও ঝর্ণার জল আর রাস্তা মিশে একাকার হয়ে গেছে| নীল মেঘ কোথাও , কোথাও বা ধূসর পাহাড়।মুসতাং ভ্যালিকে বলা হয় নেপাল এর শীতল মরুভূমি। লেটে পেরোনোর পর থেকেই গাছপালা কম হতে থাকে |
আমরা মুক্তিনাথ পৌঁছাই 28 অক্টোবর | এক অদ্ভুত শান্তি, নিস্তব্ধতা আর পবিত্রতার অনুভূতি হয় | মনে হয় বহু বছর ধরে লোক এখানে মুক্তির খোঁজে যে আসে তা সত্যিই পরিপূর্ণ হয় | আমার কাছে এই যাত্রা শুধু সাধারণ কোন তীর্থ যাত্রা নয়।

এই যাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে আমার মনের জোর ফিরিয়ে দিয়েছে আন্তবিশ্বাস| ক্যান্সারের সাথে আমার দৈনন্দিন লড়াই কঠিন ছিল কিন্তু এই লড়াই আমাকে আরো ভেতর থেকে শক্ত করে দিয়েছে। এখানে পৌঁছান আমার কাছে ছিল স্বপ্নাতীত।