ভারী শিল্পমন্ত্রীর এলাকাতেই শিল্প ক্রমশ নির্ভার

গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতীকী ছবি
গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়

এ রাজ্যে শিল্পাঞ্চল বলতে ব্যারাকপুর বোঝাত না, কল্যাণী বোঝাত না, উত্তরবঙ্গ তো নয়ই। বোঝাত আসানসোল-দুর্গাপুর। কারণ? কারণ মূলত দু’টি। প্রথম কারণ, কয়লা এবং লোহার সুবাদে এই এলাকায় একাধিক শিল্পের সমারোহ। আর দ্বিতীয় কারণ মাফিয়ারাজ। শিল্পাঞ্চলের বাসিন্দা যাঁরা নন, তাঁদের ওই এলাকা সম্পর্কে বিস্ময় এবং ভীতিমিশ্রিত একটি অনুভব ছিল। এখনও মহানগরের অনেকের মধ্যে সেটা দেখে থাকি, কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, যে কারণে শিল্পাঞ্চলের এত নামডাক বা বদনাম, সেগুলি অস্তাচলের পথে। বেঁচে আছে শুধু কপট রাজনীতি এবং কাঁচা টাকার প্রতি দুর্মর লোভ।

এ রাজ্যের এমনই ভবিতব্য যে বাম আমলে শিল্পাঞ্চলের যে অধোগতি শুরু হল তা আর রোধ হল না। আসানসোল শহরের কপালে দু’- দু’জন মন্ত্রী বহাল। একজন কেন্দ্রের, একজন রাজ্যের। বাবুল সুপ্রিয় এবং মলয় ঘটক। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর আওতায় আবার ভারী শিল্প মন্ত্রক, ভাগ্যের কি নিদারুণ পরিহাস। তাঁর আমলের অল্প আগে ধুঁকতে ধুঁকতে চলা বার্ন স্ট্যান্ডার্ড সংস্থার কোমা থেকে বার হওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। বরাত জোটায় ওয়াগন তৈরির কাজও চলছিল। কিন্তু গায়ক-নায়ক-মন্ত্রীর আমলেই কারখানার ঝাঁপ চিরতরে বন্ধ হল। বন্ধ হল রূপনারায়ণপুরের কেবলস কারখানা।

কারখানা বন্ধের এ ঘটনা নতুন নয়। শিল্পাঞ্চলবাসী জানেন, সবই মায়া। বিয়ের বাজারে জামাইয়ের জন্য র‌্যালে সাইকেল, দেশজোড়া নামডাকে হইচই বাঁধানো কাচ কারখানা, ওদিকে দুর্গাপুরের সার কারখানা, এমএএমসি- সবই মায়া। লোহা এবং কয়লার যেটুকু পড়ে আছে সেসবও যাব যাব করছে। বার্নপুরের ইস্কো কারখানার পুনরুজ্জীবনের নামে যা হয়েছে তাতে আর যাই হোক, শিল্পাঞ্চলের কলি ফেরেনি। দুর্গাপুরের কেমিক্যাল কারখানার অবস্থাও তথৈবচ। সুদর্শন সাংসদ অবশ্য তাতে দমে যাননি, তিনি দু’পাঁচশো লোকের ভিড় দেখলেই গাড়ি থেকে নেমে দু’চার কলি শুনিয়ে দেন। তাতে মন ভরে ঠিকই, পেট ভরে না। অন্যদিকে রাজ্যের মন্ত্রী মলয় ঘটক মাঝে একটু বেকায়দায় পড়লেও এখন বেশ গা ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। তাতে তাঁর দলে যাঁরা এতদিন তাঁর বিরুদ্ধে দল ভারি করছিলেন তাঁরা রিংয়ের মধ্যে গড়াগড়ি খেলেন, আসানসোলের মেয়র জিতেন্দ্র তেওয়ারি মুষড়ে পড়লেন কিন্তু শিল্পাঞ্চলের ভাগ্যে শিকে ছিড়ল না।

কয়লার আগুনে নয়, বর্ধমান (পশ্চিম) জেলায় (যা কিনা আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল নামে বেশি পরিচিত) তাপমাত্রা বাড়ছে তৃণমূলের কোন্দলেই। আসানসোল কর্পোরেশন নির্বাচনের পর তৃণমূলের দুই বিধায়ক, তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মলয় ঘটকের দড়ি টানাটানি সামলাতে তৃণমূল নেত্রী মেয়র পদে বসিয়ে দেন জিতেন্দ্র তেওয়ারিকে। তৃণমূলের অন্দরের খবর, অল্পদিন পরেই তাঁর পাখা গজায়। আসানসোলে তাপস-মলয়ের বিরোধীরা সদলবলে তাঁকে নেতা মেনে ছট পূজা সফল করতে পুকুর ঘাটে পাড়ি জমান। তাই দেখে মলয়ের ভাই অভিজিত ঘটক বিপদ বুঝে রামনবমী সার্থক করতে নেমে পড়েন। মনে রাখা দরকার, আসানসোলের বিস্তীর্ণ এলাকায় হিন্দিভাষী ভোটাররা এখন হালে পানি পেয়েছেন। বিজেপি তাঁদের ওপরে ভর করে গতবার জিতে এসেছে। এবার তৃণমূল সেই সমীকরণ মাথায় রেখেছে। কুলটি বিধানসভা এলাকায় হিন্দিভাষীদের প্রাবল্য। খোদ নরেন্দ্র মোদি সেখানে প্রাক নির্বাচনী সভা করেছিলেন। সেখানে চোখ পড়ে জিতেন্দ্রর। সেখানকার তৃণমূল বিধায়ক উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধী শিবিরের দুই কংগ্রেস কাউন্সিলরকে তৃণমূলে সামিল করে দলে নিজের পাল্লা ভারি করে ফেলেন। তৃণমূলের অন্দরে এই কাণ্ডকারখানা রুখতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পাঠিয়েছিলেন অরূপ বিশ্বাসকে। তিনি দলের আগুন সামলাতে গিয়ে আরও খানিক ঘৃতাহুতি দিয়ে এসেছেন। অন্যদিকে দুর্গাপুর অনেকটাই নিস্তরঙ্গ, তবু তারই মাঝে মেয়র অপূর্ব মুখোপাধ্যায়ের দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রার ঠেলায় কলহের আগুন বাড়ছিল বলে আসানসোলের তাপসকে সেখানে এডিডিএ-র চেয়ারম্যান করেছেন মমতা। মন্ত্রী আর নেতায় ছয়লাপ শিল্পাঞ্চল ম’ ম’ করছে। তবু মধুভাণ্ড শেষ হয়ে আসছে। লোহা কারখানার চিমনি থেকে ধোঁয়া ক্রমেই কমছে, আর কয়লার আয়ুও বেশি দিন নেই।

সারা রাজ্যে শিল্প যখন ধুঁকছে তখন, এই আসানসোল-দুর্গাপুর ঘিরে যে স্বপ্ন সেদিন পর্যন্ত রাজ্যবাসী দেখত, তা এবার সত্যিই স্বপ্ন রয়ে গেল। ভাগের মা বলে সকলে মিলে মায়ের সম্পত্তির বাটোয়ারা করে নিল, কিন্তু মায়ের পরণে নতুন শাড়িটি যে শতচ্ছিন্ন সেদিকে কারোর নজর গেল না।