সেই ‘ট্যাক্সিচালক’-ই আজ স্বপ্ন দেখাচ্ছেন গোটা দেশকে

অর্কদ্যুতি রায়

great taxi driver show dream all

আজ মস্কোর স্পার্টাক স্টেডিয়ামে ইংরেজ-বধ করলে কিন্তু নিভৃতে হাসবেন সে দিনের সেই ট্যাক্সিচালক। চোখ থেকে দু’ ফোঁটা জলও হয়তো পড়বে।

বছর চল্লিশ আগে সে সংসারে নুন আনতে পান্তা ফোরানোর জোগাড়। কিন্তু সে ছেলে যে দমতে পারে না। থামতে জানে না। চ্যালেঞ্জ নিতেই হবে। হার-জিৎ যাই হোক। তাহলে ফুটবল ? হাঁটুর চোটে যে তার মৃত্যু ঘটেই গিয়েছে। কিন্তু বাঁচাতে যে হবেই সংসারটা।

‘আর্জেন্তিনোস জুনিয়র্স’-এর নাম শুনলেই খুশিতে চোখ দু’টো চিকচিক করে ফুটবলবিশ্বের। কত শত প্রতিভারই না জন্ম সেখানে! দিয়েগো মারাদোনা থেকে রিকেলমে, রেদোন্দো, ক্যাম্বিয়াসো আরও অনেক অনেক নাম। তেমনই এক বাচ্চা ছেলের ফুটবলশৈলীর সৃষ্টিও যে ওখান থেকেই। দু’চোখ জুড়ে স্বপ্ন, একবুক জেদ সেই মিডফিল্ডারের। কিন্তু তেমন কিছু করতে পারলেন কই! এক ধাপ এগোতে চায় তো চার ধাপ পিছিয়ে দেয় অভাব, অনটন। আর্জেন্তিনোস জুনিয়র্সও সেই উঠতি ফুটবলারকে বিক্রি করে দিল কলম্বিয়ার ইন্দিপেন্দিয়েন্তে ক্লাবে। না, সেখানেও জ্বলে উঠতে পারল না সে। তার উপর হাঁটুতে মারাত্মক চোট পেয়ে মাত্র 28 বছরেই ফুটবলার জীবনকে ভাসিয়ে দিলেন যন্ত্রণার কালস্রোতে।

আজ বছর চল্লিশ পরে সেই হোস পেকারম্যানের কাঁধে ভর করেই বিশ্বজয়ের স্বপ্নে বিভোর গোটা কলম্বিয়া। অথচ সংসার বাঁচানোর ভার কাঁধে নিয়ে দুয়ারে দুয়ারে একটা কাজের জন্য ঘুরেছেন একটা সময়ে। কেউ ঘুরেও তাকায়নি। রাতের পর রাত কাটিয়েছেন বন্ধুদের বাড়ি। চেনা-পরিচিত কারোর বাড়ি। দু’মুঠো খাবার পেতেন যে ওখানে থাকলে।

1978 সাল। প্রথমবার বিশ্বকাপ ঘরে তুলল আর্জেন্তিনা। কিন্তু পেকারম্যানের জীবনে ফুটবল যে অতীত। সামনের সব পথ যখন হাত তুলে নিয়েছে, পেকেরম্যান তখন হাতে তুলে নিলেন ‘রেনাল্ট 12’ গাড়িটির স্টিয়ারিং। বুয়েন্স আইরেসের রাস্তায় নেমে পড়লেন ‘ট্যাক্সিচালক’ হোস। আসলে ফুটবল তাঁর জীবনকে ফুটবলার করেনি ঠিকই। কিন্তু স্বপ্ন দেখানো শিখিয়ে গিয়েছে যে। লড়াই করে বাঁচার নেশা ধরিয়ে গিয়েছে যে। তাই তো ধার করা গাড়ি নিয়ে যাত্রীকে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে হোস পেকারম্যানের জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস শুরু।

কিন্তু গন্তব্য যতই ফুটবল থেকে দূর দিগন্তের হোক না কেন, রক্তের কোষে যে ভালবাসার খেলা নিউক্লিয়াস হয়ে ঘুরছে। তা থেকে কি আর বেশিদিন চোখ ফিরিয়ে থাকা যায়! তাই ফুটবলের টানে আবার সে ট্যাক্সিচালক এক অন্য চালিকাশক্তি নিয়ে হাজির সবুজ কার্পেটের দুনিয়ায়। বছর তিনেক টানা স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখার পরে কোচ পেকেরম্যান শক্ত হাতে আর্জেন্তিনার ঘরোয়া ক্লাব চাকারিতা জুনিয়র্সের হাল ধরলেন। জীবনের বদল ঘটা শুরু। শুরু জীবনের তৃতীয় একটা ইনিংস।

জীবনের বৃত্ত অর্ধেক পূর্ণ হল যখন পরের বছরই সেই আর্জেন্তিনোস জুনিয়র্সেরই দায়িত্ব নিলেন পেকারম্যান। তারপর 1994-তে আর্জেন্তিনার যুব দল ঘুরে 2006 বিশ্বকাপে আর্জেন্তিনার কোচ তিনি। তেমন সাফল্য এল না। এরপরে বেশ কয়েকবছর মেক্সিকোয় ঘরোয়া লিগে কাটানোর পরে 2012-তে কলম্বিয়ার দায়িত্ব নেন তিনি। 16 বছর পরে বিশ্বকাপে ভালদেরামার দেশকে পৌঁছে দিলেন পেকারম্যান। সেই থেকে আজও ‘লা ট্রাইকালার’-দের স্বপ্ন দেখিয়ে চলেছেন। ব্রাজিল বিশ্বকাপে দলকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছিলেন। আর আজ ইংল্যান্ডকে হারালে রাশিয়ায় ফের শেষ আটের শান্তি।

এ গল্পের থেমে যাওয়া উচিত এখানেই। কিন্তু সম্প্রতি এক ইংরেজ ফুটবলপ্রেমীর ট্যুইট দেখেছিলাম। সেখানে ‘ট্যাক্সিচালক’ পেকারম্যানের ফুটবল বোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। হয়তো সে ট্যুইট শ্রদ্ধেয় পেকারম্যানের নজরেও পড়েছে।

আজ প্রি-কোয়ার্টারে ইংল্যান্ডকে হারালে কিন্তু সে ট্যাক্সিচালক নিভৃতে হাসবেন। চোখ থেকে দু’ ফোঁটা জলও গড়াতে পারে।