দূর আকাশপারের বন্ধুকে খোলা চিঠি (পাঁচ)

ড.দেবানী লাহা(মল্লিক)

ড.দেবানী লাহা(মল্লিক)

” রে সতী রে সতী কাঁদিল পশুপতি
পাগল শিব প্রমথেশ।”

বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের কাঠফাটা রোদে পুড়ছে ধূ-ধূ দিগন্ত বিস্তারী মাঠ।তীব্র গরমে মানুষ,প্রাণী,কীট-পতঙ্গ সকলেই বৃষ্টিধারার আশায় রয়েছে আকাশের দিকে চেয়ে।চাতক পাখীর অবস্থা তো আরও শোচনীয়!সে বেচারা বৃষ্টির জল ছাড়া খাবে কি?সে যাইহোক,আজকে ত্রিগুণাতীত মহাদেবের কথা কেন মনে পড়ল বল্ তো?যে শিব এমন শান্ত,স্থিতপ্রজ্ঞ,নির্লিপ্ত সেই শিবশম্ভু-মহেশ্বর সতীর বিরহে-সতীর বিচ্ছেদে প্রখর জ্বলন্ত সূর্যের মত জ্বলে উঠল রাগে।শিব তো শক্তি ছাড়া অসম্পূর্ণ।শক্তি ছাড়া শিব শব।দক্ষযজ্ঞে সতীর দেহত্যাগেই তো যত অশান্তির সূত্রপাত।ছোট শিশু যেমন তার আকাঙ্খিত জিনিসটা না পেলে রাগে-দুঃখে-অভিমানে কেঁদে ভাসিয়ে দেয়।যতক্ষণ না সেই আকাঙ্খিত জিনিসটা সে হাতে পায় তার শান্তি নেই।তেমনই সতীবিরহে অশান্ত,ক্রোধে-দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য মহাদেব যতক্ষণ না আবার পার্বতী রূপে তার প্রিয়তমাকে লাভ করলেন ততক্ষণ তার ক্রোধবহ্নি নির্বাপিত হল না।
যিনি সতী তিনিই -পার্বতী আবার তিনিই মহামায়া; জগতের পরিচালিকা।একই অঙ্গে কত রূপ।কখনও ঐশ্বর্যময়ী, কখনও শিবঘরনী হাস্য-লাস্যময়ী-অনন্ত যৌবনা আবার কখনও অপর্ণা বৈরাগিনী।শিব এই সমস্ত রূপেই মুগ্ধ।আত্মভোলা মহাদেব তাই কখন কি চান তা হয়তো নিজেও জানেন না।কখন জ্বলে ওঠেন আবার কখনও ধ্যানমগ্ন গভীর সাধনায়।
আমাদের জীবনেও চাওয়া-পাওয়া মেলে না।মন কি চায়- মন ও কি জানে?কিছুতেই যেন মেলে না তৃপ্তি! তাই অহরহ চাওয়ার সাথে পাওয়ার মেলবন্ধন ঘটাতে আমরা ছুটে চলেছি—-

”হেথা নয় অন্য কোথা অন্য কোনোখানে!”

কখনও পার্থিব বস্তু, কখনও অপার্থিব অনুভব,কখনও বা জ্ঞানসমুদ্র থেকে জ্ঞান আহরণের ঈপ্সিত লক্ষ্যে যখন পৌঁছতে চায় মানবমন,না পাওয়ার যন্ত্রণায় তখনই হৃদয় অশান্ত হয়-ওঠে ঝড়।তাই হয়তো শিবের মত শান্ত, স্থিতপ্রজ্ঞ,নির্লিপ্ত মানুষেরও সাধনার ব্যাঘাত ঘটে।সেটাই হয়তো বৈশাখী রোদের প্রাখর্য।প্রকৃতি যেন ক্রোধের আগুনে জ্বলে পুড়ে ছাড়খার হয়ে যায়।
এরপর যখন ক্রোধ স্তিমিত হয়ে আসে তখন বৃষ্টি নামে ঝমঝমিয়ে-ভিজিয়ে দেয় গাছপালা,মাঠ,ঘাট,ভেসে যায় নদী-নালা-ক্ষেত।ভিজিয়ে দেয় মানুষের অতৃপ্ত মন -প্রাণ-দেহ!বিদ্যুৎ চমকানো দেখে যেন মনে হয় শিবের তৃতীয় নয়ন থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে ক্রোধবহ্নি।ক্রমে নীলাম্বরী-লীলাচঞ্চলা-কলহাস্যময়ী বৃষ্টির আগমনে পশুপতির রাগ গলে জল হয়।পৃথিবীতে নেমে আসে শান্তি-

”বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি।
শুষ্ক হৃদয় লয়ে আছে দাঁড়াইয়ে
ঊর্ধ্বমুখে নরনারী।”

তুই তবু ভাবলি আমি হঠাৎ শিবের গল্প বলে যাচ্ছি কেন তাই না?তোর তো এমন শিব স্বভাব জানিস না বুঝি?যখন ঝড় আসে-আসে দুঃখ-তখন তুই ক্রোধে দিশাহারা-বাঁধনহারা-তুই যে সেই শিবের মতই পাগল ভোলা।তাইতো আমি কখনও পড়ন্ত বেলায় বৃষ্টি-মেঘে ডাক পাঠাই,কখনও লাল গোধূলির সন্ধ্যা নামাই,আবার মেঘ সরিয়ে জ্যোৎস্না -মাখা চাঁদ ওঠাই দূর গগনে,গান শোনাই তোর কানের কাছে–

”চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা।”

তোর রাগ শ্বেত শুভ্র বরফগলা জলের মত গলে যায়।বৃষ্টির মত, মিষ্টি রোদের মত ,অবুঝ শিশুর মত খিলখিলিয়ে হেসে উঠিস তুই।আনন্দে বিশ্ব-ভুবনও হেসে ওঠে।কঠোর-কঠিন-প্রাত্যহিক জীবন পথে শুরু হয় তোর নতুন উদ্যমে পা ফেলা।