নির্ভয়া-কাণ্ডে “নাবালক” বলে মুক্তি পাওয়া আফরোজ এখন কোথায়? কণাদ দাশগুপ্তর কলম

কণাদ দাশগুপ্ত

নির্ভয়াকাণ্ডে মোট অভিযুক্তের সংখ্যা ছিলো ছ’জন। সোমবার চারজনের ফাঁসির সাজা বহাল রেখেছে শীর্ষ আদালত। পঞ্চম জন, রাম সিং। 2013 সালের মার্চ মাসে তিহার জেলে বন্দি থাকার সময় তাঁকে ঝুলন্ত অবস্থায় মৃত পাওয়া গিয়েছিলো।

ষষ্ঠ জন, মহম্মদ আফরোজ। সেদিন, 2012 সালের 16 ডিসেম্বর, দিল্লির রাজপথে ‘নির্ভয়া’-কে ধর্ষন করে যৌনাঙ্গে লোহার রড ঢুকিয়ে দিয়েছিলো এই আফরোজই। আর সেই কারনেই নির্ভয়ার শারীরিক পরিস্থিতি আরও সঙ্কটজনক হয়েছিলো বলেই দেশের এবং সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকরা সে সময় জানিয়েছিলেন।

ঘটনার দিন, অভিযুক্তদের মধ্যে যার বয়স 17 বছর ছিলো, তাঁরই নাম মহম্মদ আফরোজ। ফলে, আইনের দৃষ্টিতে আফরোজ ‘নাবালক’। তাই জঘন্যতম অপরাধ করেও দেশের আইন অনুযায়ী কারাবাস বা ফাঁসির সাজা থেকে আফরোজ অব্যাহতি পেয়ে যায়। সোমবার চূড়ান্ত রায় ঘোষনা করেছে সুপ্রিম কোর্ট। এই প্রশ্ন এখন কি স্বাভাবিক নয় যে আজ কোথায় সেই ‘নাবালক’? কী করছে?

দিল্লি থেকে 240 কিলোমিটার দূরের একটি গ্রামেই ছিলো আফরোজদের বাড়ি। ছয় জনের সংসার চলতো আফরোজের দিদির রোজগারে। আফরোজের বয়স যখন 11, তখনই সে রোজগারের আশায় দিল্লি চলে আসে। সেখানেই রাম সিং এবং ধর্ষণ-কাণ্ডে অভিযুক্ত অন্যদের সঙ্গে তার আলাপ হয়। যে বাসে 2012 সালের 16 ডিসেম্বরে নির্ভয়া ধর্ষিতা এবং বীভৎস ধর্ষণের কারনেই মৃত্যু হয় , সেই বাসটি ধোওয়ার কাজ করত এই আফরোজ। ধর্ষণের সময়ে আফরোজও রাম সিংহদের সঙ্গে অপরাধে যুক্ত হয়েছিলো এবং নির্ভয়ার গোপনাঙ্গে লোহার রডও ঢুকিয়েছিলো এই আফরোজই।

এরপরে অপরাধীদের গ্রেফতার হওয়া, বিচারপর্ব এবং শাস্তির কথা সকলেরই জানা। নিম্ন আদালতে সাজা ঘোষণার সময়ে আদালত “নাবালক” আফরোজকে তিন বছরের জন্য একটি হোমে রাখার নির্দেশ দেয়। সেই মতো উত্তর দিল্লির মজনু-কা-টিলা নামে একটি হোমে রাখা হয় তাকে। সেখানে তাকে পড়াশোনা শেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু পড়াশোনাতে তার বিন্দুমাত্র উৎসাহ ছিল না। বহু পরিশ্রম করে ওই হোম কর্তৃপক্ষ তাকে কেবলমাত্র নাম সই করাটা শেখাতে সক্ষম হয়। শোনা যায়, তাকে শেখানো হয়েছিল দেওয়াল রঙ করার কাজ, রান্নার কাজ-সহ অন্যান্য কাজও। কিন্তু একমাত্র রান্নাবান্নাতেই তার উৎসাহ দেখা গিয়েছিল। সে রান্নাটাই শেখে।

2015 সালের 20 ডিসেম্বরে হোম থেকে মুক্তি পায় আফরোজ। মুক্তির পরে দক্ষিণ দিল্লির একটি এনজিও নিয়ন্ত্রিত পুনর্বাসন কেন্দ্রে সে ছিল এক বছর। তার পরে ওই এনজিও-র উদ্যোগেই দক্ষিণ ভারতের একটি রাস্তার ধারের ধাবায় রাঁধুনির কাজ পায় আফরোজ। এখনও নাকি আফরোজ সেখানেই কাজ করছে বলে জানা গিয়েছে। সংশ্লিষ্ট এনজিও-টি আফরোজের নিরাপত্তার কথা ভেবে কোন দোকানে সে কাজ করছে, তা পুলিশ ছাড়া কাউকে জানায়নি।

এদিকে সোমবার, সুপ্রিম কোর্ট চার অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার পর নির্ভয়ার মা আশা দেবী সাংবাদিকদের অনেক কথা বলেছেন। গণধর্ষণ ও খুন কাণ্ডে “নাবালক” আফরোজের মুক্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নির্ভয়ার মা। তিনি বলেছেন, “নাবালক বলে যাকে ছেড়ে দেওয়া হল, সে এখন বছর কুড়ির তরুণ। ধর্ষণের প্রবৃত্তি নিয়ে আমাদের সমাজের মধ্যেই সে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সংশোধনাগারে মাত্র তিন বছর থেকে তার মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না।”