ইমলির ‘আড়ি’

ত্রিশঙ্কু নফর

ত্রিশঙ্কু নফর

কি যে হল কে জানে !

মানসের ওপর ইমলি আজ বেজায় চটে।

আড়ি,আড়ি,আড়ি।

যাও তোমার সঙ্গে বিচ্ছেদ। থাকব না তোমার সাথে। লুঙ্গিতে নস্যির গন্ধ।বিছানায় গন্ধ। দম আমার বন্ধ হয়ে আসে। আজ থেকে সব আলাদা।হাঁড়িও আলাদা।

মানস ঘুম চোখে ভাবতেই সময় নিল , এখন ভোর না বিকেল। দুই সময়েই গোধুলি।

মানসের বদভ্যেস, লুঙ্গি এমন ভাবে গায়ে জড়ায় শুতে গিয়ে যে চাদরও হয় আবার লজ্জানিবারণীও হয়। তবে বিপদসীমা অনেক সময় ইমলিকেই খেয়াল রাখতে হয়। কোমরে এক প্যাঁচ কষে ডিবে থেকে এক টিপ নাকে ডলে তারপর নাক ও আঙুল লুঙ্গিতে মুছে চশমাটা বার করল বালিশের তলা থেকে।ঝাপসা পড়া চোখ এবং চশমাও । তাই কাচ দিয়ে যতটা দেখে তারচে কাচের ওপর দিয়েই দেখে বেশি।সেই ভাবেই এক পলক চাইল ইমলির দিকে।

কোনদিনই মানস ইমলির সাথে তর্ক করে না। এটাতে আরো রাগ ইমলির ।

মানস ইমলির রায় শিরোধার্য করে নিল বিনা বাক্য ব্যয়ে । যেন কিছুই হয়নি । ডেটা অন করে দেখে নিল রাতের খেলাটার রেজাল্ট আর পয়েন্ট টেবিল।

একলা চলা শুরু হল দুজনার। পার্স একটাই। গ্যাস ওভেন একটা। আর বিছানাও একটা। বাসন কোসন অবশ্য একগাদা। তাই থেকে কয়েকটা থালা বাটি নিল মানস। প্রতিটির তলায় লিখল নীল মার্কার দিয়ে ‘মানস’ ‘মানস’ ‘মানস’।

মানস ঢুকল টয়লেটে প্রাতঃকৃত্য সারতে।

ইমলি এবার লাল মার্কার দিয়ে একটা করে অ আর উ-কার যোগ করে লিখল,’অমানুস’ ‘অমানুস’ ‘অমানুস’! স কেটে ষ লিখল না ওভার রাইট হয়ে যাবে দেখে।

কিভাবে পৃথকান্ন হয় সেটাই দেখার।

ইমলির বাপের বাড়ি নেই। নেই বলা ভুল। বাপ-মা নেই। ভায়েরা সম্পর্ক রাখে না।তাই কোর্টের রায়ে(ইমলির হুকুমে) বিচ্ছেদ হলেও বাড়ি ভাগ হল না।

মানস ভাবছে,শালা একেই বলে হতভাগা । পুরুষেরা বলে তিন তালাক। আর এখানে ইমলি দিল তিন আড়ি। ভালোই।

ইমলি একটা টপে ভাত চাপিয়েছে। ছোট হাঁড়ি নেয়নি। নরমালটাই নিয়েছে। চালও নিয়েছে দুজনের মত। চাল ছেড়ে ভুলটা বুঝতে পারল। যাকগে ও বেলা আর রাঁধবে না,তাহলেই হল।

মানস পাশের টপটায় চাপিয়েছে চায়ের জল। সেও ভুল করে দু কাপ জল মেপেছে। ভুলটা ধরতেও পারেনি।

গ্যাসের কাছে কেউ নেই।

ইমলি অন্য কাজ করছে। মানস দাড়ি কামাচ্ছে।

গ্যাসের গন্ধ পেয়ে ছুটে যায় ইমলি । ভাতের মাড় পড়ে গ্যাস অফ হয়ে গন্ধ বেরচ্ছে।

পাশেরটায় দু কাপ জল ফুটে ফুটে এক কাপ।

মানসের অনভ্যাসে জল,চিনি,দুধ,চা সব এক সাথে চাপানো।

ছুটে আসে মানসও। এক গালে ক্রিম । কিচেনে ঢুকতেই দুজনে ধাক্কা।

ইমলি জিভ ভ্যাঙচাল ।

মানস চা ছেঁকে চুমুক দিল।

থু থু থু…

কালো কাথ মুখে দেওয়া গেল না।

ইমলি আঁচল চাপা দিয়ে হাসল। বোঝো ঠ্যালা এবার।

মানস টিভিতে দেখেছে যত ছোট অর্ডার হোক না কেন, এই কোম্পানিটি সাপ্লাই দেয়। ও এক থালা সাদা ভাত অর্ডার দিল। দুপুরে সেটা নুন লঙ্কা আচার দিয়ে সাপটে দেবে। লঙ্কা নিতে গিয়ে দেখল একখানাই পড়ে আছে। তাকিয়ে দেখল ইমলির তখনো আলু সেদ্ধটা মাখা হয়নি। রেখে দিল লঙ্কাটা ।

ইমলি আবার ভুল করল। দুটো থালায় ভাত বাড়ল।

যেই দেখল মানস ইতিমধ্যে খাওয়া শুরু করেছে,ইমলির রাগ মাথায়।

এত বেইমান ? আমাকে ছাড়াই খেয়ে নিল ? এত বছরের সংসার তিন আড়িতে শেষ ? আমিও পারব তাহলে। খেতে তো শুরু করল আলু সেদ্ধ ভাত। কিন্তু নুনের আধিক্য পেল চোখের জল গ্রাসে মিশে গিয়ে ।

ইমলির রাতে প্রথম কাজ চাদরটা পাল্টানো।

মানস ফিটফাট বিছানা আবার সহ্য করতে পারে না। কেমন গেস্ট গেস্ট মনে হয়।

আলমারির পাশ থেকে মাদুর বার করল। এ হে হে। ব্যবহার না করে করে ভাঁজে ভাঁজে কত জায়গা ফেটে গেছে। ওটাই কোন রকমে পাতল। বালিশের বদলে কতক বই ইমলির শাড়ি দিয়ে ভাঁজ করে মাথায় দেবার মত করে রেডি রাখল। বাথরুম থেকে এসেই শুয়ে পড়বে একটু আগে আগে। রাত সাড়ে এগারোটার খেলা দেখতেই হবে। একটাই টিভি। আদালত অবমাননা হয় হোক। না হয় আরেকবার তিন আড়ি দেবে। কিন্তু তাই বলে খেলা দেখবে না ?

মানস বাথরুমে ঢুকতেই রাগে গজগজ করতে করতে ইমলি কাঁথা টাথা জড়ো করে একটু মোটা করে মাদুরের ওপর পেতে দিল।

কান্ডজ্ঞানের বলিহারি যাই। মেঝেতে শুয়ে বুকে পিঠে ঠান্ডা লাগুক আরকি।মরণ যত আমারই। ইমলি গজগজ করল।

মানস খেয়াল করল না যে বিছানাটা বেশ আরামদায়ক হয়েছে। মোবাইলে লাস্ট আপডেট দেখে অফ করে দিল।

ইমলির কিন্তু ঘুম আসছে না।

বিছানায় এ পাশ ওপাশ করছে। আর থেকে থেকে গন্ধ নিচ্ছে। নস্যির গন্ধ না পেয়ে অস্থির। ঘুম আসবে কি করে ? এত দিনের অভ্যেস।

রাত সওয়া এগারোটার অ্যালার্ম বাজল। টিভিটা অন করল মানস অন্ধকার ঘরেই।

কখন চুপিচুপি উঠে পাশে বসেছে ইমলি। খেলার উত্তেজনায় টের পায়নি মানস।

একসময় গোওওওল বলে ইমলি চেঁচিয়ে উঠল।

মানস তাকিয়ে দেখল।জড়িয়ে ধরতে যাচ্ছিল আর একটু হলেই।

না, অত বাড়াবাড়ি ভাল না। এমনিতেই আদালত অবমাননা একবার হয়ে গেছে।অন্তত একটা পুরো দিন কাটুক।

আর ইমলি ভাবছে, তিন আড়িতে বিচ্ছেদ।

মিলন তবে কি বলে ? ভাব ভাব ভাব ? সে তো ছোটবেলার খেলায় ? আর বড়বেলায়?