স্বাধীনতা দিবসে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে কিছু কথা, মনোজ ঘোষের কলম

মনোজ ঘোষ

72 তম স্বাধীনতা দিবসে অধিকাংশ মানুষই আজ ছুটির মেজাজে। তবু তারমধ্যে কতকগুলি কথা বলতে চাই আমার অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে। যেহেতু সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছি, তাই আজ স্বাধীনতার দিনে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে দু চার কথা বলতে চাই।

মাঝে মাঝে একটা কথা শুনি সংবাদমাধ্যম কি আদৌ স্বাধীন? সব সত্যি কথা, সব বাস্তবচিত কথা সংবাদ মাধ্যম কি তুলে ধরতে পারে? এ প্রশ্নটা বড়ই গোলমেলে। তার কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় জনগণের ইচ্ছা, ভাবনা, চাহিদার প্রতিচ্ছবি সংবাদমাধ্যমে প্রতিফলিত হচ্ছে না। আর সেই কারণেই সংবাদমাধ্যমের পাশে বেশ কিছু প্রতিশব্দ জুড়ে যায়— যেমন, একপেশে, নির্দিষ্ট দলের উমেদারি করা, হলুদ সাংবাদিকতা কিংবা নতুন সংযোজন পেইড জার্নালিজম। কাঠগড়ায় তোলা হয় সাংবাদিকদের, বলা হয় সাংবাদিকরা বিকিয়ে গিয়েছেন। একটি ছোট্ট হাউস চালানোর ন্যূনতম কয়েকদিনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বিষয়টির বোধহয় এতখানি সরলীকরণ করা ঠিক হবে না। কারণ আর চারটি ব্যবসার সঙ্গে সংবাদমাধ্যম চালানোর বিষয়টি একটু পৃথক। এখানে প্রথমে লগ্নিকারিকে চোখ বুজে লগ্নি করতে হয়, তারপর একে একে রেভিনিউ অর্থাৎ উপার্জনের দিকটি খুলে যায়। কিন্তু তার জন্য একটা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। যেটাকে সংবাদ মাধ্যমের ভাষায় struggling period বলা যেতে পারে। আর এই struggling period এর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে আসল রহস্য। যাঁরা সাহস এবং পুঁজির জোরে এই সময়টিকে অতিক্রম করতে পারেন, তাঁরা টিকে যান। নইলে অচিরেই দরজা বন্ধ করে দিতে হয়। যে কারণে বাংলার সংবাদপত্র জগতে বিশেষত বিগত পাঁচ বছরে এবং তার আগেও বহু প্রতিষ্ঠিত হাউস বন্ধ হয়েছে যার তালা চাবি আজও খোলেনি।

এটাই বাস্তব, সংবাদমাধ্যম চলে বিজ্ঞাপনের অর্থে। বিজ্ঞাপন দুই তরফে আসে। একটি সরকারি এবং অন্যটি বেসরকারি। সরকারি বিজ্ঞাপন পাওয়ার নিয়ম নীতি রয়েছে আর বেসরকারি ক্ষেত্রে সেগুলি নেই। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় সরকার প্রতিষ্ঠিত বা পুরনো সংবাদমাধ্যমকে বিজ্ঞাপন দেওয়ার ক্ষেত্রে বেছে নেয়, নতুন সংবাদ মাধ্যমকে অপেক্ষা করতে হয় বহু বছর। এই নিয়মকে যদি একটু শিথিল করে ছোট-ছোট হাউসগুলির পাশে সরকার বাড়ির অভিভাবকের মতো এসে দাঁড়ায়, তাহলে সংস্থাগুলি একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পায় এবং কর্মসংস্থান তৈরির জায়গা ক্রমশ বাড়তে পারে। আর সরকার যদি একটু ইতিবাচক মনোভাব দেখায় তাহলে বেসরকারি সংস্থাগুলিও সংস্থার পাশে এসে দাঁড়ায় এবং সংবাদমাধ্যম ক্রমশ লড়াই করার রসদ পেয়ে যায়। কারণ ব্যবসায়ীমহল অনেক ক্ষেত্রেই বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রশ্নে সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এই জায়গাটিতেই আমাদের রাজ্য সরকারের ইতিবাচক ভূমিকার কথা অবশ্যই বলতে হয়। কারণ, তারা কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ছোট ছোট সংস্থা এবং বর্তমানে জনপ্রিয় হওয়া ডিজিটাল মিডিয়াগুলির পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে। এটা অবশ্যই আগামী দিনে উদাহরণ হয়ে থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছেও আমার একই আবেদন থাকবে। সারাদেশে তারাই পারে নীতির সরলীকরণ করে সংবাদমাধ্যমকে বেঁচে থাকার রসদ জোগাতে।

এবং সর্বশেষে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা তথা নিরপেক্ষতার প্রসঙ্গটিতে আসা যাক। আসলে নিরপেক্ষতা কথাটি একটি ‘বায়বীয়’ ব্যাপার ছাড়া আমার অন্য কিছু মনে হয় না। যখন কেউ সরকারি নীতির সমালোচনা করেন, তখন তার গায়ে সরকার-বিরোধী লেভেল আটকে দেওয়ার চেষ্টা হয়, আবার সরকারের পক্ষে লিখলে বলা হয় সরকারের উমেদারি করছে। আসলে পাঠককেও বুঝতে হবে কোনও একটি ঘটনা ঘটার পর প্রত্যেকটি সংবাদমাধ্যমই সেই বিষয়টি নিয়ে লেখে। এরপর সেই বিষয়টির নিয়ে পর্যালোচনা বা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এক একটি মত বা অবস্থান তুলে ধরা হয়। এখন কেউ সেই মতের অনুপন্থী হতে পারেন, আবার পরিপন্থীও হতে পারেন। কিন্তু তা বলে কোনও একটি সংবাদ মাধ্যমের গায়ে এভাবে লেভেল সেঁটে দেওয়া যুক্তিযুক্ত হবে না। যেমন, কোনও সংবাদমাধ্যম কর্তৃপক্ষ জিএসটি পছন্দ করতে পারেন আবার কেউ নাও করতে পারেন। ফলে তাঁদের লেখায় অর্থাৎ বিশ্লেষণে সেই ধারণার ছাপ উঠে আসবে আর সেটাই স্বাভাবিক। তাই সে নিয়ে সংবাদ মাধ্যমকে দোষারোপ করা বা নির্দিষ্ট সাংবাদিককে কাঠগড়ায় তোলা ঠিক হবে না, যুক্তিযুক্ত হবে না। কারণ, সাংবাদিকরা তাঁদের সংবাদমাধ্যমের নির্দিষ্ট নীতিরই প্রতিফলন ঘটান। সেটাই তাঁদের দায়িত্ব। তবে সংবাদ মাধ্যমেরও কিছু দায়িত্ব থেকে যায়। কোনও একটি ইস্যুতে পক্ষে বা বিপক্ষে যে ভাবেই লেখা হোক না কেন, তার স্বপক্ষে যেন যথাযথ যুক্তি থাকে। নইলে পাঠক একপেশে কিংবা পেইড সাংবাদিকতা অভিযোগ তোলার সুযোগ পেয়ে যাবেন।

তবে সব পেশাতেই ব্যতিক্রম কিছু থেকেই যায়, সেই ব্যতিক্রমকে সামনে এনে অযথা লড়াইয়ের ময়দানে না নামাই উচিত। শুভবুদ্ধি সম্পন্ন সকলেরই উচিত সংবাদমাধ্যমকে বিস্তৃত করতে সকলের সাহায্যের আবেদন করা এবং কর্মসংস্থানের জায়গা বাড়িয়ে তোলা। তাতে রাজ্যের লাভ দেশের লাভ নতুন প্রজন্মের লাভ।