কেউ তো আছে

ত্রিশঙ্কু নফর

ত্রিশঙ্কু নফর

যখন সংসারে কেউ তাকে বুঝতে পারে না। সকলে নিজেরটা নিংড়ে নিতে চায় অন্নপূর্ণার কাছ থেকে। অন্নপূর্ণা খেতে পেল কিনা তাও ঘুরে দেখে না। তখন অন্নপূর্ণা জানে তার যাবতীয় দুঃখ কষ্টে ভাগ ব সাবার জন্যে ওরা সাত জনে আছে সারা বছর।

মাদুরটা নিয়ে অন্নপূর্ণা ছাদে চলে যায়। অন্ধকারেও ও জানে কতদূর যেতে হবে। কোথায় পা দিলে ছাদটা ভেঙ্গে পড়বে। অনেক পুরনো ছাদ। সংস্কার না করলে তো … ! এই টানাটানির সংসারে কোনও রকমে দুটো মুখে জোগানোই তার একমাত্র চিন্তা। শ্বশুরেরও বাবার আমলের বাড়ি। পাঁচটা ঘরের এই একটাই টিকে আছে। তাতেই মাথা গোঁজা চারটি মানুষের। সন্তানেরা ছোট ছিল তখন রাতের সোহাগ টোহাগ ছিল তাও। এখন ওদের জ্ঞান হয়েছে। কাজেই সে বালাইও নেই। ভরা যৌবনে কত আশা আকাঙ্খা থাকে। কিন্তু সেসব ইচ্ছে টিচ্ছের গলা টিপে মেরেই ফেলে অন্নপূর্ণা। তাই ও অপেক্ষা করে এই তারা ভরা রাত টুকুর। তেলচিটে বালিশে মাথা দিয়ে ও আকাশের দিকে তাকায় । অত্রি নেমে এসে বসে ওর মাথার কাছে। ওর ভাষা বুঝতে পারে না অন্নপূর্ণা । অত্রি মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। এক অপরূপ আনন্দে চোখ ভিজে যায় অন্নপূর্ণার। বেঁচে থাকা সার্থক হয় শত অভাবেও। এইভাবে আদর খেতে খেতে কখন ওর ঘুম এসে যায়। আধঘুমে দেখে এক বুড়ো মুখ ভর্তি দাড়ি নিয়ে এসে অত্রিকে টেনে নিয়ে যায়। অন্নপূর্ণা জানে ওর নাম মরীচি। স্বপ্নে নিজের ভাষায় ও তাদের সংলাপ বানিয়ে নেয়।

অত্রি-তুমি কত রূপসী অন্নপূর্ণা। এত অভাব অভিযোগ তাও কোনও অনুযোগ নেই কারও নামে। দূর থেকে আমরা সব দেখতে পাই। তোমার প্রাণপাত। তোমার নিষ্ঠা। তোমার সততা। তাই তো রোজ আদরটুকু দিতে আসি তোমায়। আর তো কিছু নেই আমাদের। পারিজাতের সৌরভ নাও। ঘুমিয়ে পড়। আবার আসব।

মরীচি-অত্রি ! এটা কিন্তু একদম অনুচিত হচ্ছে। পার্থিব কিছুর মায়ায় পড় না। কষ্ট পাবে। কোনও বারণ শুনবে না তবু। এ বড় জেদ তোমার। অন্নপূর্ণার কষ্টের কি ভরপাই করতে পারবে বল? চল এবার আমরা যাই।

অত্রি-আহা! কেন বাপু অবুঝ হও? আমরা আছি তাই না অন্নপূর্ণা রোজ ছাদে আসে। অভুক্ত পেটের যণ্ত্রণা মিলিয়ে যায় পলকে। এটাই বা কম কি? ওকে আপন ভাবতে বড় ভাল লাগে।

মরীচি-ভুল করছ। মস্ত ভুল। যার যা কাজ তা প্রতিটি পর্যায়ে নির্দিষ্ট করেছেন বিধাতা। তুমি তা খণ্ডাবে কি করে? এতে তুমি নিজেও ধর্মচ্যূত হবে। ওর কালকাটানো তুমি বন্ধ করবে সে ক্ষমতা তোমার নেই।

অত্রি-তাই তো ! বিধাতা কি অদ্ভুত নিয়ম গড়েছেন। এ অচলায়তন কি কখনোই কাটবে না? হায় রে! চল, এবার যাই। ঘুমো রে মা অন্নপূর্ণা।

ধ্রুবতারা অবিচল নিশ্চুপ। কেবল একটু মৃদু হাসল এসব লীলাখেলায়।

অন্নপূর্ণা দিন যাপন করে আবার একটি রাতের পথ চেয়ে।

প্রকৃতির তিল তিল সহানুভূতি আশীর্ব্বাদের মত ঝরে পড়ে অন্নপূর্ণাদের মাথায়। অন্ন দিয়ে যিনি জগৎকে প্রতিপালন করেন তিনি সকলের দুঃখ কষ্ট হরণ করে নেন। তুলে রাখেন নিজের হৃদয়ের কুঠুরিতে। সেখান থেকে উপচীয়মান বেদনা ফল্গুধারার মত তির্ তির্ স্রোতে প্রতিদিন একটু একটু করে মিলিয়ে যায় অসীম অনন্তলোকের গায়ে।