সিরিয়াল কিলার, স্টুডিও পাড়ার সান্নাটা ও ঝাঁটা হাতে বিক্ষোভ

ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ

ফাইল ছবি

আচ্ছা কেরালার বন্যার খবর নিয়ে ঠিক কতটা উৎসাহী থাকতে পারবেন আপনি, যদি ইতিমধ্যে আপনাকে দিপিকা পাদুকোনে ও রনবীরের বিয়ে কবে তার হাড়ির খবর দিই? একদম ফ্রম দা বেডরুম। যদি বলি আমার কাছে ওদের বিয়ে কোথায় হবে, কারা কারা আসছে, রনবীর কাপুর আর অনুষ্কা খবরটা শুনে ঠিক কি বললো তার সব খবর আছে। সিক্রেট ব্যালট হলে সত্যিটা বলবেন তো? না সান্নাটা চারিদিকে।

আপনি মানুন ছাই না মানুন, বাস্তবটা আমরা দেখে নিয়েছি। যেদিন দুটো খবর একসাথে এলো, সেদিন টুইটার থেকে ফেসবুক পয়লা নম্বর ট্রেন্ড “দীপিকার বিয়ে হবে”, ভাঁড় মে যায় বন্যা। যে যে চ্যানেল দীপিকার বিয়ে নিয়ে ধ্যাষ্টামি শুরু করলো প্রাইম টাইমে, তারা উইনার। আপনার যতই খারাপ লাগুক শুনতে, জী জনাব এটা প্রতি ঘন্টার ইঁদুর দৌড়ই। আপনি খবরের বাইরে ও কোটি টাকার স্যাটেলাইট, মাল্টিপল ডিশ, হাইএন্ড সেট আপ, সিক্স ডি ক্যামেরা, এইচডি আউটপুট এর ঝকমারি করবেন যখন, তখন টিভিটা তো শেষমেশ ব্যাবসাই নাকি?

কাল পেছনে আধময়লা পর্দা টাঙিয়ে ঢোলা কোট পরে কয়েকটা কাগজ হাতে আমি বসবো দেশ দুনিয়ার খবর বলতে। মাঝে মাঝে কাগজ পাল্টানোর খশখশ আওয়াজ হবে, ঘোলাটে ঘামতে থাকা লো লাইট ক্লোজ ফ্রেম। আপনি আপনার ইএমআই তে কেনা বুদ্ধিদিপ্ত টিভি আর মাস গেলে ৬০০টাকা খরচা করেন যে কেবলের পিছনে, তাতে আমাকে দেখবেন তো? না চুপচাপ চ্যানেল পাল্টে দেবেন “চলো পাল্টাই, নতুন বাঙালি” ক্ল্যরিয়ান কল শুনে? সত্যি বলুন।

বহু দশক আগে, মনমোহন দেসাই গ্রামার টা মুখস্থ করিয়ে দিয়েছেন৷ যে রিক্সাচালক সারাদিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করে, টু পাইস উপার্জন করে ফেরে, সে বাড়ি ফিরে জিডিপি নিয়ে খবর চালিয়ে বসে না। সে ইচ্ছেনদীতে ভেসে যেতে চায়। একটা বাচ্চা মেয়ের মাকে ছাড়া কেন ঘুম আসেনা তার জন্য চিন্তিত থাকে। একবার ও তার মনে হয়না, কাঁদার সময় ও এরা এতো মেকআপ করে কেন? বরং এখন থেকেই খোঁজখবর নিতে শুরু করে এবার কালীপূজোয় একে দিয়ে উদবোধন করাতে কতো খরচা হতে পারে৷ এতদূর পড়ার পরে, তাক থেকে ঝুল ঝেড়ে কোন মোটা বই এর অমুক পাতার তমুক পয়েন্ট উদ্ধৃত করে আমি কতোটা বাজারি তথা সংশোধনবাদী তার পোস্টমর্টেম শুরু করবেন। হুজুর আপনারাই তো সাময়িক রিলিফের কথা কন। ওই যে ততক্ষনাৎ সমাজ বদল না করতে পারলে আপাত স্বাচ্ছন্দ্য দাও। আমি ধরিয়ে দিলাম নিঃসঙ্গতা, রাগ, গ্লানি, যন্ত্রনা ভুলানো অডিও ভিজুয়াল আফিম। উইন উইন সিচ্যুয়েশন।

এবার আসি কনটেন্ট এ। কিছু মানুষ ফেসবুকে- টুইটারে হাপিত্যেশ করেন ভালো ছবি নেই, পাতে দেওয়ার মতো সিরিয়াল নেই আর সত্যিটা তুলে ধরবে এমন নিরপেক্ষ খবরের চ্যানেল নেই বলে। এদের অবশ্য সন্ধেবেলা স্কচ খেতে খেতে এটাও মনে হয় যে এই দেশে যা হচ্ছে সব বোগাস। মন্ত্রী আমলা সবাই চোকাবোদা তাঁদের বাদে। তারা মন্ত্রী হলে ঢের ভালো কাজ করতেন। অথচ এরাই ভোটের দিন রোদের মধ্যে ভোট দিতে যাওয়ার ঝক্কির থেকে বেশী গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন এসি- টিভি চালিয়ে, বিয়ার খেতে খেতে ভোট সন্ত্রাস নিয়ে ফেসবুকে আপডেট দেওয়াকে। এরা বাংলা ছবির মান নিয়ে খিস্তি করেই বউ বাচ্চাকে নিয়ে ‘জুড়ওয়া ২’ দেখতে ছোটেন৷ ‘সহজপাঠের গল্প’ প্যানপ্যানানি। ওসব দেখে রবিবার নষ্ট করার মানেই হয় না। একদিন ছুটি পাই বাপ। ওদিন আর সংস্কৃতি মাড়ালে চলেনা। ওদিকে ছেলে আবার ম্যাড ম্যাক্স দেখতে চায়৷

সুতরাং আজ টলিপাড়াতে ধর্মঘট চলছে বলে, কোন সিরিয়ালের শুটিং হচ্ছেনা বলে, রিপিট টেলিকাস্ট হচ্ছে বলে যারা হেব্বি খিল্লি করছেন, তারা মাথায় রাখুন, এর সাথে কয়েক লাখ মানুষ ও তাদের রুটি রোজগার যুক্ত। আপনার বিপ্লব করতে হলে ওদের হয়ে করুন যারা ঠিক সময় পেমেন্ট চেয়ে, ওভারটাইম চেয়ে ধর্মঘট ডেকেছে। এদের সমস্যা শুনুন। প্রযোজকরা কি বলছে পড়ুন৷

আজ রিপিট, কাল রিপিট, পরশু রিপিট- তরশু থেকে যদি গায়ের জোড়ে চ্যানেল হিন্দি বা তেলেগু সিরিয়াল বাংলায় ডাব করে দেখাতে শুরু করে বা মুম্বাইতে বাংলা ভাষার কনটেন্ট শুট করে কিছু বলতে পারবেন নিয়মকানুন দেখিয়ে? একটা সেটে ও তো আলো জ্বললো না এ ক’দিন৷

ধর্মঘট বাঙালির প্রতিবাদের ব্রহ্মাস্ত্র৷ এটা ব্যবহৃত হচ্ছে হোক। প্রযোজকেরা ও এবার একটু ভাবনাচিন্তা করুক এথিকাল বিজনেসের মডেল নিয়ে৷ কারন টলিপাড়ায় কাজ করিয়ে টাকা না দেওয়াটা বিরল নয়৷ দস্তুর। সাথে সাথে প্রতিবাদী কলাকুশলীরা ও একটু নরম হোক৷ হাজার হোক, দর্শক অনাহারে হাপিত্যেস করছে। আরসালান বা গোলবাড়ির কষামাংসের দোকানে ধর্মঘট বেশী দিন চলতে পারেনা। গোলপার্ক আমিনিয়ার মতো বন্ধ শাটারের সামনে ফুটপাথে হাড়ি নিয়ে বসলে ও দু ঘন্টায় সেল হয়ে যায়। সেভাবেই এ জিনিস স্বার্থপর দর্শক বেশী দিন বরদাস্ত করবে কেন সিরিয়াল কিলারের এই বেয়াদবী?

আমার ঠাকুমার ঘরে দিনে ১০ঘন্টা টিভিটা চালু থাকে৷ ইদানীং ঠাকুমার প্রবল মনখারাপ৷ মা ও অধৈর্য্য হয়ে পরছে৷ আফিমের ঘোর কাটলে ভয় হচ্ছে, ঘরে ঘরে না ঝগড়া শুরু হয়। আর আপনারা যারা চ্যানেল, স্টুডিও পাড়ার লোক, তারা সমাধানসূত্র বের করুন নয়তো ঝাঁটা খুন্তি, বেলনা, চিরুনী হাতে, কোমড়ে কাপড় গুঁজে, ট্রেন ট্রেন বিক্ষোভকারী আসতে পারে। কাউন্টার অবস্থান বিক্ষোভ শুরু হতে পারে আপনার অফিসের সামনে। বর ছেলেপুলে ও চলে আসতে পারে চাপে পরে স্টুডিও পাড়ায় নতুন এপিসোডের রক্তক্ষয়ী দাবীতে। পুরোটাই নন-ফিকশন হবে কিন্তু, অ্যাকশন কমেডি ড্রামার ভরপুর প্যাকেজ। ও জিনিস কিন্তু ‘গ্রেট টেলিভিশন’। লাইভ দেখাতে পারেন এই ফাঁকে৷ বা গোটাটা নিউজ চ্যানেলকে সামলাতে দিন৷ আর কয়েকদিন আপনাদের এপিসোড না তৈরি হলে, ও জায়গা টা ওরা পুরন করার জন্য রেডিই। বাড়ি ফিরে পাব্লিক হেব্বি খাবে। কিন্তু Nothing compared to serial !

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)