টুসকি’-তে সমাজের নির্দয় ছবিটাই তুলে ধরেছেন অনিকেত

কণাদ দাশগুপ্ত

কণাদ দাশগুপ্ত

অনিকেত চট্টোপাধ্যায়কে চিনি পুরোদস্তুর সাংবাদিক থাকার সময় থেকেই। প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক, দুই মাধ্যমেই কাজ করেছেন। বামপন্থী রাজনীতি করেছেন একসময়। তবে সেটা হালের বামপন্থা নয়। বিতৃষ্ণায় রাজনীতির আঙ্গিনা ছেড়েছেন। অন্য কোনও জোয়ারেও গা ভাসাননি। শুনেছি রেলেও নাকি চাকরি করেছেন। তারপর সব ছেড়ে ঝাঁপ দিলেন চরম অনিশ্চিত জীবনে। হলেন চিত্র পরিচালক। একের পর এক বানালেন বাই বাই ব্যাংকক, হইচই আনলিমিটেড, কবীর, ছ-এ ছুটি, মহাপুরুষ ও কাপুরুষ। আরও আছে। কমেডি ছবিতে দক্ষতা প্রমান করেছেন একাধিকবার।

অনিকেতের সঙ্গে টুসকি

এবার ‘টুসকি’ নিয়ে হাজির অনিকেত। টুসকির জীবনের মতোই এই ছবি নির্মানেও ওঠানামা বিস্তর। সে সব নিয়ে অভিমানও আছে তাঁর। এই ছবির একটি দৃশ্যের জন্য দীর্ঘদিন ধরে সেন্সরের সঙ্গে ‘ঝগড়া’ চলছিলো পরিচালকের। অবশেষে একাধিক জট কাটিয়ে শুক্রবার, 24 আগস্ট ‘টুসকি’র মুক্তি।

একটা বাচ্চা মেয়ের গল্প ‘টুসকি’। টুসকি বস্তির একরত্তি মেয়ে। এই চরিত্রে দেখা যাবে প্রিয়াঙ্কা দত্তকে।
টুসকি বড় হচ্ছে তার মাসির কাছে। মা নেই। তাই মাসিকেই মা বলে। মাসির চরিত্রে অভিনয় করছেন কাঞ্চনা মৈত্র। লোকের বাড়িতে কাজ করে । তাঁর ইচ্ছে, টুসকিকে বড় ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়াবে। টুসকির ইচ্ছাও তাই। বড় স্কুলে ভর্তি হবে, পড়াশোনা করবে। স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায় একসময়ে। স্কুলে গিয়ে যাদের পাশে বসতো, তারা প্রায় সবাই উচ্চবিত্ত পরিবারের। অনেকে বন্ধু হয়, অনেকে এড়িয়ে যায় টুসকিকে। বস্তিতে থাকা নিম্নবিত্ত পরিবারের ছোট্ট টুসকির সঙ্গে উচ্চবিত্ত ঘরের মেয়েদের আদব-কায়দা, চালচলন, পোশাক-পরিচ্ছেদ, খাওয়া-দাওয়া, কিছুই মেলেনা। প্রশ্নের মুখে দাঁড়ায় অসম মেলামেশা। বাড়ির কাজের মাসিকে পরিবারের একজন ভাবতে পারেন না অনেকেই। তাঁদের থালা-গ্লাসও আলাদা। তাঁদের বাচ্চাদের স্কুলও আলাদা। ভালো স্কুলে পড়ার অধিকার তাদের নেই।ফিরে আসে দুটো ক্লাসের চিরকালীন লড়াই। ছবিতে সমাজের এই নির্দয় চিত্রটাই তুলে ধরেছেন পরিচালক অনিকেত চট্টোপাধ্যায়। অভিনয় করছেন প্রিয়াঙ্কা দত্ত, মৌমি বসু, কাঞ্চনা মৈত্র, সৌরভ চক্রবর্তী, খরাজ মুখোপাধ্যায়, কৃষ্ণকিশোর মুখোপাধ্যায়, অনামিকা সাহা, রাজেশ শর্মার মতো শিল্পীরা।

কাঞ্চনা মৈত্র দারুন কাজ করেছেন। তাঁর চরিত্রের নাম রণিতা। লোকের বাড়ি ঠিকে কাজ করে। টুসকির মা জন্মের পরই মারা যায়। মাসি রণিতার কাছেই টুসকি মানুষ হতে থাকে। মেয়েকে ভালোভাবে মানুষ করার জন্য গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় এসে বস্তিতে ওঠে রণিতা। একদিন টুসকির সম্পর্কে ‘বস্তির মেয়ে’ শব্দটা শোনে। সেদিনই রণিতা চ্যালেঞ্জ নেয় টুসকিকে বড় স্কুলে ভর্তি করাবে। সবাইকে দেখিয়ে দেবে। অনবদ্য কাঞ্চনা।

‘মা’ কাঞ্চনা মৈত্র, মেয়ে টুসকি

খরাজ মুখোপাধ্যায় অভিনীত চরিত্রের নাম ডি’সুজা। একটা ব্যান্ড পার্টিতে স্যাক্সোফোন বাজায়। পৌলমী বসু শ্রাবণী। টুসকির মা রণিতা শ্রাবণীদের বাড়িতেই কাজ করে। টুসকির সঙ্গে নিজের মেয়ে টুয়ার বন্ধুত্ব মানতে পারে না শ্রাবণী। রণিতাকে কাজ থেকে তাড়িয়ে দেয়। কৃষ্ণকিশোর মুখোপাধ্যায় ফাদার লোপেজ। খুব বলিষ্ঠ চরিত্র। টুসকির স্কুলে ভর্তি হওয়া নিয়ে জটিলতার সময় ফাদার টুসকির পাশে দাঁড়ান। সৌরভ চক্রবর্তী এক শিক্ষকের ভূমিকায়। টুসকিকে পড়ান। মানসিকভাবে অতি বাম। অনিকেত সবার অভিনয় নিয়ে খুশি। “দু’টি বাচ্চা মেয়েই অপূর্ব অভিনয় করেছে। ওয়ার্কশপে তাঁদের যেমন বুঝিয়েছিলাম, ঠিক তেমই কাজ করেছে ওঁরা। দর্শক পর্দায় দেখলে বুঝতে পারবেন।”

পাশাপাশি ‘টুসকি’ নিয়ে একাধিক ক্ষোভও আছে পরিচালকের। প্রথম ক্ষোভ, সেন্সর বোর্ডের আচরন নিয়ে। উগড়ে দিলেন, “গল্পটা তো বস্তির জীবনযাপন নিয়ে। তাঁরা যে ভাষায় কথা বলে সেটাই আমি তুলে ধরেছি। সেন্সর বোর্ডের যদি ধারনা হয় বস্তির লোকেরা বঙ্কিমচন্দ্র-রবীন্দ্রনাথের ভাষায় কথা বলে, আমার কিছু করার নেই। এই মেধার লোকজন নিয়ে তৈরি সেন্সর বোর্ড না থাকলেও কোনও ক্ষতি নেই।”

দ্বিতীয় ক্ষোভ সবকিছু মিলিয়ে। সেটা কেমন, বললেন অনিকেত, “একটা সিনেমার প্রচার দরকার সব স্তরে। নাহলে লোক জানবে কীভাবে, আসবেই বা কেন ? প্রচারের জন্য হোর্ডিং দরকার, আরও অনেক পথে প্রচার করতে হয়। সেটা টুসকিতে হয়নি। এমনকী রিলিজের প্রচারও নেই। আমি নিজে উদ্যোগ নিয়ে নন্দনে একটা শোয়ের ব্যবস্থা করেছি। বন্ধু-সাংবাদিকদের বলছি, সিনেমাটা নিয়ে লিখুন। কিছু লোক এলে সিনেমাটা রক্ষা পাবে।”
পোড়খাওয়া মানুষ অনিকেত।বাস্তববাদীও। জীবন দেখেছেন অনেক ‘অ্যাঙ্গেল’ থেকে। তাই হতাশা কোনওদিন ছুঁতে পারেনি।

এবার নিখাদ একটা কমেডি বানান অনিকেত।এটা অসম্ভব ভালো পারেন আপনি। এখন নির্মল হাসির খুব অভাব। হাসিয়ে সবাইকে সবকিছু ভুলিয়ে দিন, অনিকেত।