জন্মদিনে মঞ্চস্থ হল মিউনাসের নতুন নাটক ‘দূষণ’

এসবিবি : 18 বছর সম্পূর্ণ করে 19 এ পা দিল নাট্যগোষ্ঠী ‘মিতালী উৎসব নাট্য সংস্থা’ (মিউনাস )। সেই উপলক্ষ্যে 31 অগাস্ট তপন থিয়েটারে মঞ্চস্থ হল মিউনাসের নতুন নাটক ‘দূষণ’।

সমাজকে দূষণ মুক্ত করতে নাট্যকার উৎসব দাস তুলে ধরেছেন বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থাকে। গল্পের শুরুতে দেখানো হয়েছে, টিউশন ফেরৎ একটি মেয়েকে কয়েকজন ধাওয়া করেছে। সে দ্রুত সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরে আসে কোনওমতে। এরপর পরিচালক তুলে ধরেছেন স্কুলে পড়া ওই মেয়েটির মানসিক অবস্থা। সে কিছু একটা দেখে ভয় পেয়েছে। কিন্ত সেটা কী? বিধ্বস্ত অবস্থায় বাড়ি ফেরার পর অজ্ঞান হয়ে যায়। তারপর চিকিৎসক আসেন ও তাকে 7 দিন বেড রেস্ট নিতে বলেন। এরপরই ধীরে ধীরে সামনে আসে আসল ঘটনা।

স্কুল ফেরৎ পাড়ার কোনও মেয়েকে খুন হতে দেখেছিল সোনা। এবং চিনে ফেলেছিল অপরাধীদের। সেখান থেকেই শুরু গল্পের টানাপোড়েন। খুনিরা সোনার মোবাইল লোপাট করে। আর সোনার মা মমতা ও বাবা পলাশকে বলে তাদের মেয়ে যেন মুখে কুলুপ এঁটে থাকে পুলিশ আসে জেরা করতে। সমস্যার সমাধান না করে 5 লক্ষ টাকার বিনিময়ে রফা করতে চায় জগৎপুর থানার ওসি। এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এক মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের কথা। যারা জড়িয়ে পরছেন অসামাজিক বেড়াজালে।অসহায়, নিরুপায় এক পরিবার। যারা শুধু চেয়েছিলেন সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে। অপরদিকে পুলিশও 5 লাখের গল্প শোনাচ্ছে। যা ন্যায় সঙ্গত নয় ।এরপর শেষ দৃশ্যে দেখা যায় কাউন্সিলরকে। যিনি শুধু নিজের ভাবমূর্তি বজায় রাখার কথা ভাবছেন। শেষমেশ তার পকেট থেকেই বেড়োলো সোনার মোবাইলটি। যা প্রমাণ করছে অপরাধ ও অপরাধকারী দুজনের সঙ্গেই যোগসূত্র রয়েছে তার। অর্থাৎ সর্ষের মধ্যেই ভূত রয়েছে।

বর্তমানে ঘটা অপরাধ জনক ঘটনা, তার প্রভাব, সামাজিক প্রতিক্রিয়া, হয়রানি সবদিক যথার্থই তুলে ধরেছেন নির্দেশক। তবে,উনি যেভাবে নাটকটি শেষ করেছেন তাতে মনে হতে পারে, ‘শেষ হয়েও হইল না শেষ’। আসলে নাট্যকার নাটকের শেষ পরিণতি টুকু ছেড়ে দিয়েছেন দর্শকদের উপরে। তাদের চিন্তাভাবনা গুলিকে একত্রিত করে নাটকটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান তিনি। সামাজিক দূষণ রোধের এক অনবদ্য প্রয়াস ‘দূষণ’। মুখ্য চরিত্র অর্থাৎ সোনার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী টিনা মণ্ডল। বাবা ও মায়ের ভূমিকায় দেখা গিয়েছে শঙ্কর চক্রবর্তী ও রত্না ধরকে। ডাক্তারের ভূমিকায় ছিলেন অমল চক্রবর্তী, জগৎপুরের ওসির ভূমিকায় সোমনাথ পাল ও কাউন্সিলরের চরিত্রে অভিনয় করেছেন প্রণয় শর্মা। মিউনাসের প্রত্যেক শিল্পী যথার্থভাবেই ফুটিয়ে তুলেছিলেন নিজেদের চরিত্র গুলিকে।

নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার পাশাপাশি এদিন প্রকাশিত হয় মিউনাসের বার্ষিক মুখপত্র । যা প্রকাশিত করেন যাদবপুর ব্যতিক্রম এর কাণ্ডারী দেবাশিস রায়। এছাড়াও ছিলেন বিশিষ্ট অতিথি রাকেশ ঘোষ। যার নির্দেশনায় সাফল্যের সাথে মঞ্চস্থ হচ্ছে দমদম শব্দমুগ্ধের নাটকগুলি। প্রতি বছরের মত এবছরও দেওয়া হল আলোক শিল্পী চিত্ত সরকার স্মৃতি থিয়েটার সম্মান। যা উত্সর্গ করা হয়ে থাকে স্বর্গীয় আলোক শিল্পী চিত্ত সরকারকে। নাটককে এতটাই ভালবাসতেন যে নিজের গ্যাঁটের টাকা খরচ করে বহু নাট্যদলকে পথ চলতে সাহায্য করেছেন তিনি। ওনার সুযোগ্য পুত্র বাবলু সরকার এখন মিউনাসের আলোক শিল্পী।

এবছর এই বিশেষ সম্মানে সম্মানিত করা হল- থিয়েটারটার ফোরামের সদস্যদের, বিশিষ্ট অতিথি ও সমাজ কর্মী স্বপন ঘোষকে ও নাট্য প্রেমী মিতা ভাওয়াল নন্দীকে। এদের প্রত্যেকের চিন্তা-ভাবনা জুড়ে রয়েছে নাটক। নাট্যকর্মীদের সুস্থতার কথা ভেবে কয়েকজন চিকিত্সকদের নিয়ে চিকিত্সার বন্দোবস্ত করেছেন থিয়েটার ফোরামের কর্মীরা। শুধু নাটকের প্রচার নয়। তারা চিন্তিত নাট্যকর্মীদের শরীর-স্বাস্থ্য নিয়েও। এদিন স্বপন ঘোষের কথায় স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে আবেগ। ইনি এমন একজন ব্যক্তি যিনি পথ চলছেন প্রায় 2500 জন গরীবঘরের ছেলেমেয়েদের নিয়। সকলকে পড়াশোনা করিয়ে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছে শহরের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন বয়সী বাচ্চারা। যাদের মধ্যে অনেকেই আজ স্বাবলম্বী। সমাজের কল্যাণ করতে নিজের সাধ্যমত চেষ্টা করে চলেছেন তিনি। একজন নাট্যপ্রেমী হিসেবে নাট্যমনস্ক জনমত গড়ে তুলতে যিনি সদা তত্পর তিনি হলেন মিতা ভাওয়াল নন্দী। সোশ্যাল সাইটে তিনি অনবরত করে চলেছেন নাটকের আলোচনা ও সমালোচনা। বিশেষ সম্মানে সম্মানিত গতে পেরে তিনি খুবই আনন্দিত। এদিন তপন থিয়েটারের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, শাড়ি গয়না না কিনে যদি সেই টাকাটা নাটকের জন্য খরচ করা যায় তবে তা বেশি কার্যকরী। তিনি নিজেও এই পথ অবলম্বন করেছেন অনেকদিন আগেই। সবকিছু মিলিয়ে উত্সবের মেজাজে ছিলেন মিউনাসের সকল শিল্পীরা।