মেঘলা আকাশ

ড.দেবানী লাহা(মল্লিক)

ড.দেবানী লাহা(মল্লিক)

আজকাল মেঘের আর কিছুই ভাল লাগে না।সবসময় মনের ভেতরটা কেমন হু-হু করতে থাকে।অথচ একটা সময় কত হৈ-চৈ আনন্দ করে থাকতে ভালবাসতো ও।তখন জীবনটা কত সুন্দর ছিল আশেপাশের মানুষ-গুলোকে কত নিজের ভেবে ফেলত মেঘ সহজেই।এইটা ওর ভাল গুণ নাকি খারাপ গুণ আজও বুঝে উঠতে পারেনি ও।মেঘ অনেকটাই ওর বাবার মত।বড় তাড়াতাড়ি মানুষকে বিশ্বাস করে যে ও।কি করবে! কবিগুরু যে বলে গেছেন মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ।কি করে বিশ্বাস হারানোর মত সেই পাপ করবে।রবি ঠাকুর যে ওর হৃদয়ের ধন, তিনিই পরম আত্মা।আজও যে মেঘ বেঁচে আছে সে তো ঐ মানুষটার জন্য।সত্যি কত কষ্ট পেয়েছেন মানুষটা সারা জীবনে। যত কষ্ট পেয়েছেন তত হৃদয়ের উৎসারিত বেদনার ধারায় সিক্ত হয়েছে তাঁর সব রচনা সম্ভার।তাই মনে হয় রবি ঠাকুরই ওর একমাত্র বন্ধু।

”জীবনমরণের সীমানা ছাড়ায়ে
বন্ধু হে আমার রয়েছো দাঁড়ায়ে।”

অথচ জীবনে চাওয়া-পাওয়া ওর খুব সামান্যই ছিল।সেটুকু অনায়াসেই পেতে পারতো ও।মেঘ যখন যে কাজটা করে খুব মনোযোগ দিয়ে করার চেষ্টা করে।ছোট থেকেই মা-বাবা, ঠাম্মাকে দেখে কাজের প্রতি ও শিখেছে নিষ্ঠা।ভালবাসতে শিখেছে সকলকে প্রাণ দিয়ে।মানুষকে যতটা সম্ভব সাহায্য করার চেষ্টা করতে শিখেছে।মা শিখিয়েছে-

”মেঘ জীবনে কখনও ফলের আশা করবি না।সকলের মঙ্গল চাইবি।দেখবি তোরও কখনও অমঙ্গল হবে না।”

কিন্তু যত দিন গেছে আশেপাশের মানুষদের থেকে আঘাত পেতে-পেতে এখন ও বুঝেছে জীবনে যত ভালবাসবে ততই কষ্ট পাবে।যত বিশ্বাস করবে ততই বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণা পাবে।প্রতিদিনকার ছোট-ছোট ঘটনা থেকে একটু-একটু করে মন ভেঙেছে ওর।বাবা-মা এই বিরাট পৃথিবীতে ওকে একলা রেখে কোথায় যে লুকিয়ে পড়েছে আর খুঁজে পায় না মেঘ।ঠাম্মা তো কবেই চলে গেছে তারাদের দেশে।মায়ের হয়েছিল দুরারোগ্য মারণ রোগ।ও জানতো মা আর বেশীদিন নয়।কিন্তু বাবার তো যাবার সময় হয়নি।বাবা চলে গেল আকস্মিক আঘাতে।কি করত মেঘ?একদিন না একদিন বাবাকে তো সব বলতেই হতো। হঠাৎ করে পাওয়া আঘাতটা সহ্য করতে পারেনি বাবা।একসময়ের আদর্শবান ডাকসাইটে হেডমাস্টার কি করে যে অমন চুপ করে গেল এখনও মেঘ ভেবে পায় না।আর কথা বলল না বাবা।খালি ফ্যাল-ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতো।আর চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়ত।একদিন সকালে বাবা আর চোখ খুলল না।মেঘকে একলা ফেলে দূরের পথে পাড়ি জমালো।মেঘও যদি চলে যেতে পারত তো ভাল হতো।দার্জ্জিলিং এ থাকে এখন মেঘ। একটা স্কুলে পড়ায়।এখানকার অনাথ আশ্রমের বাচ্চাগুলো বড় মায়ায় জড়িয়েছে ওকে।তবু সূর্য ডোবার পর যখন ঝুপ ঝুপ করে পাহাড়ী পথ দিয়ে সন্ধ্যে গড়িয়ে যায়;পাহাড়ের মাথাটা ঢেকে যায় ঘন কুয়াশায় আর মেঘে নীল আকাশটা ঢেকে যায় অন্ধকারে,
তখন এক মুঠো বিষাদ যেন জোর করে কে ওর মনের ভেতর ছড়িয়ে দেয়।-

”উফ্!আকাশ, আকাশ, আকাশ এই পাহাড়ের ওপারে আকাশটার দিকে তাকাতে পারি না কেন আমি?কেন এই আকাশ শব্দটা আমার জীবনকে এমন দুর্বিষহ করে তুলেছে?ভুলতে চাই আমি আকাশকে ভুলতে চাই।”

মনের ভেতর গানের লাইন ভেসে ওঠে মেঘের-

”এই করেছো ভাল নিঠুর হে ,
নিঠুর হে
এই করেছো ভাল।
এমনি করে হৃদয়ে মোর
তীব্র দহন জ্বালো।”

আস্তে-আস্তে মনটাকে শান্ত করার চেষ্টা করে ও।শান্ত হয়না কিছুতেই।মনে পড়ে যায় সব, দমটা বন্ধ হয়ে যায়।বাবার কাছে আকাশ পড়তো।রাস্তা থেকে তুলে আনা একটা ছেলে।নাম বলেছিল আকাশ মুখার্জ্জী।ওর বাবা মা বন্যায় হারিয়ে গেছে।গ্রাম থেকে শহরে আসা একলা, অনাথ একটা ছেলে।সরল চোখের দৃষ্টি,মায়ায় জড়ানো গলার শব্দ।বলতে গেলে মেঘের সাথেই আকাশের বেড়ে ওঠা।বাবার স্কুলেই ভর্তি করে দিয়েছিল ওকে বাবা।পড়াশোনায় অসম্ভব ভাল, আর মেধাবী ছেলেটা।বাবার চোখের মণি হয়ে উঠেছিল ও।মা আপত্তি করেছিল।বলেছিল-

”বাড়ীতে একটা অচেনা অজানা চাল-চুলোহীন ছেলেকে পুষবে?”

কিন্তু বাবা শোনেনি।কি না করেছে বাবা আকাশের জন্য।নিজে না খেয়ে ওকে খাইয়েছে বই কিনে দেওয়া, জামাকাপড় কিনে দেওয়া,হাতে ধরে পড়ানো।মেঘও কেমন আকাশের অন্ধ ভক্ত হয়ে উঠেছিল।আকাশ আকাশ।আকাশ ছাড়া কেন যে কিছু ভাবতে পারতো না জানে না ও।আকাশ বলেছিল-

”মেঘ তোমরা আমায় নতুন জীবন দিয়েছো।তোমাদের ঋণ কখনও শোধ করতে পারব না আমি।তোমাকে কখনও কষ্ট দেবোনা আমি।যেদিন তোমাকে কষ্ট দেব সেদিন যেন আমার মৃত্যু হয়।”

একুশ বছরের মেঘের চোখে ঘনিয়ে এসেছিল সেদিন কাজল কালো বর্ষা মেঘের জল।বৃষ্টি ভেজা ছল ছল চোখে আকাশের ঠোঁটের ওপর আলতো করে আঙুলটা রেখে মেঘ বলেছিল-

”ছিঃ অমন কথা আর কখনও বলবে না আকাশ।তুমি যে আমার জীবন আকাশকে রঙীন করেছো।বাঁচবার মানে খুঁজে দিয়েছো।তুমি না থাকলে আমি বা বাঁচব কি করে?আকাশের মেঘ যে তৃষ্ণা নিয়ে পৃথিবী ছাড়বে তবে।”

কিন্তু এইতো!এইতো!দিব্যি বেঁচে আছে মেঘ! যন্ত্রণায় ক্ষত বিক্ষত হয়ে; বিষাক্ত স্মৃতিগুলোকে বুকে আঁকড়ে ধরে।মরেনি তো আকাশকে ছাড়া।মরলে যে বেঁচে যেত।যাকে জীবনের অমৃত দিয়েছিল সেই ই যে অনায়াসে বিষের পেয়ালা তুলে দিতে পারে ভাবতে পারেনি মেঘ।আসলে কারোর জন্যই কিছু আটকে থাকে না এই জগতে।
বাবার মনে চিরকালই একমাত্র মেয়ে মেঘকে হারানোর ভয় ছিল।তাছাড়া বাবার এই ছেলেটার প্রতি মায়া পড়ে গেছিল বড্ড।যদি মেঘ আর আকাশের চারহাত এক করে দেওয়া যায়।তাহলে মেঘ বাবার কাছেই থাকবে।বড় সহজ অঙ্ক।মেঘের সাথে যে আকাশের বিয়ে হচ্ছে একথাটা সকলেই জানতো।আকাশের মত ছেলেকে পাওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার।যেমন রূপ তেমন গুণ।কিন্তু জীবনের অঙ্ক যে মেলেনা।মেঘ তখন পিএইচ ডি করছে।সরকারী একটি পরীক্ষায় পাশ করে আকাশ ভাল চাকরি পেয়ে গেল।চলে গেল মেদিনীপুর।অফিসের কোয়াটার, মোটা মাইনে,তাকে আর পায় কে।কেমন যেন বদলে যেতে লাগল আকাশ।বাবা ফোন করলে তার ধরবার সময় নেই।মেঘের সাথেও যেন তার সব কথা ফুরিয়েছে।সব সময়ই সে ব্যস্ত।সরকারী অফিসারের ধনী রূপসী মেয়ে তোর্সার প্রেমে মাতোয়ারা আকাশ খুব দ্রুত তার মনের মেঘটাকে সরিয়ে দিল অনেক দূরে।তোর্সাকে নিয়ে ভাসতে থাকলে তার পদোন্নতি আটকায় কে?মিথ্যে প্রতিশ্রুতির মুখোশ খসে পড়ল দ্রুত।একদিন ফোনে মেঘের বাবাকে চিনতেই পারল না আকাশ।

”কে বলছেন আপনি?মনে হয় রঙ নাম্বার। এখানে আকাশ বলে কেউ থাকেনা।”

তবু মেঘ পারেনি আকাশের দুর্বার আকর্ষণকে তুচ্ছ করতে।নির্লজ্জের মতো ছুটে গেছিল মেদিনীপুরে,
আকাশের কাছে। আকাশ বলেছিল-

”তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে মেঘ।তোমাকে আমি কোনোদিনই ভালবাসিনি।তোমাকে আমি আমার সহপাঠী ছাড়া আর কিছুই ভাবিনি কোনোদিন।আচ্ছা এখন এসো আমি একটু ব্যস্ত আছি।”

ফিরে এসে মেঘ কান্নায় ভেঙে পড়েছিল বাবার সামনে।সবই কি অভিনয় ছিল তবে?আকাশ কি তবে প্রেমের মুখোশ পরা জীবন্ত ফসিল?সেই যে বাবা চুপ করল।অন্ধকার ঘরে গিয়ে বসলো, আর কথা বলল না।নীরব হয়ে পৃথিবী থেকে চলে গেল বাবা।

ছিঁড়ে যাওয়া প্রেমের মেকী মুখোশটাকে আর জুড়তে পারেনি মেঘ।কেন যে আকাশ এমন করেছিল তার উত্তরও আজও মেঘের অজানা।তবু কেন আকাশকে ভুলতে পারল না মেঘ?শব্দতরঙ্গের ইথারে দুঃস্বপ্নের মত আকাশের মুখটা ভাসে,তার বলা কথা গুলো ঢেউয়ের মত বুকের ভেতরটায় আছড়ে পড়ে!বড় অসহ্য যন্ত্রণা।মুখোশের মত টেনে ছিঁড়ে ফেলতে পারল না কেন মেঘ এই মিথ্যে ভালবাসাটাকে?সকলের উপেক্ষা,অপমান,করুণা নিয়ে কেন বেঁচে আছে সে এখনও?জানেনা! মেঘ জানেনা!কিছু আর জানতে চায় না সে।মেঘ এখন শুধু জানে-

”যে পথে যেতে হবে
সে পথে তুমি একা
নয়নে আঁধার রবে
ধেয়ানে আলোকরেখা।”