‘মীরজাফর’ চরিত্র নির্মাণে গৌতম ফিরিয়ে আনলো মার্লোন-এর স্মৃতি

বিশিষ্ট নাট্যকার, পরিচালক, অভিনেতা এবং অধ্যাপক হিসাবেই তাঁর পরিচিতি। রাজনীতিতে এসেছেন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে। পরিবর্তনের ডাকে সামিল হয়েছিলেন, পরে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে এখন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। তবুও ব্রাত্য বসুর আসল দুনিয়া সেই নাট্যমঞ্চেই। শত ব্যস্ততার মাঝেই বারবার ছুটে গিয়েছেন সেখানে। কখনও নাটক লিখে, কখনও পরিচালক হয়ে, কখনও বা অভিনেতা হিসাবে।

ব্রাত্য আবার আসছেন নাটক নিয়ে। ‘কালিন্দী ব্রাত্যজন’-এর প্রযোজনায় নতুন নাটক ‘মীরজাফর’। মীরজাফর চরিত্রে  বাংলা নাট্যজগতের এই মুহূর্তের মুকুটহীন সম্রাট গৌতম হালদার। সঙ্গে আরেক সফল মঞ্চাভিনেতা ‘মীরন’ কাঞ্চন মল্লিক।

গৌতম হালদার ‘মীরজাফর’ চরিত্র নির্মাণে যে টেকনিক নিয়েছেন, তাতে ব্রাত্য বসু খুঁজে পেয়েছেন মার্লোন ব্র্যান্ডোকে। ব্রাত্য’র ভাষায় মার্লোন-এর সেই গল্পের স্মৃতি গৌতম হালদার আবার ফিরিয়ে এনেছেন।  সোশ্যাল মিডিয়ায় সে কথাই অকপটে জানালেন ব্রাত্য বসু।

সেই অনুভূতির কথাই অবিকল তুলে ধরা হলো আপনার জন্য।

জার্নাল : এক

ব্রাত্য বসু

‘গডফাদার’-এর বছরখানেক বাদে মার্লোন ব্র্যান্ডো অভিনীত বহুচর্চিত ও  বহু প্রতীক্ষিত বারনারদো বার্তোলুচির ‘লাস্ট ট্যাঙ্গো ইন প্যারিস’ যখন আমেরিকায় 1973-এর গোড়ায় মুক্তি পেল, (ছবিটি নিউইয়র্ক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রথম দেখানো হয়েছিলো যদিও 1972-এর অক্টোবরে। কিন্তু ইতালিয়ান সেন্সরবোর্ড ছবিটিকে ‘আনকাট’ অবস্থায় ছাড়তে রাজি ছিল না। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত  কোর্টে যায়, অবশেষে ইতালির এক নিম্ন আদালত ‘পর্নোগ্রাফি’ তকমার থেকে ছবিটিকে মুক্ত করে ও সাধারণ্যে মুক্তির পক্ষে রায় দেয়)। বহু সমালোচকই ছবিটি ও ব্র্যান্ডোকে  নিয়ে খুশি হতে পারেননি। ব্র্যান্ডো নিজেও একথা আগে থেকেই জানতেন। ছবিটির শ্যুট শেষ হওয়ার পর নাকি ব্র্যান্ডো বারতোলুচিকে বলেওছিলেন, ‘‘আমি এই ধরনের ছবি আর কখনও করবো না। এই প্রথম আমি আমার ভেতরে আত্মসত্তার লঙ্ঘন টের পেলাম। এই শেষ’’। নিজের আত্মজীবনীতেও এই অভিজ্ঞতা আরও বিশদে লিখেছেন ব্র্যান্ডো, ‘‘আমি যখন চরিত্রটি অভিনয় করছিলাম, আমার ভেতরে একটা যন্ত্রণাবোধ হচ্ছিলো। আমাকে ওই যন্ত্রণাটা নিতে হচ্ছিলো। তুমি এটাকে অস্বীকার করতে পারবে না। তোমাকে সারাদিন ধরে ওই যন্ত্রণাটা টিঁকিয়ে রাখতে হবে, জমিয়ে রাখতে হবে ক্লোজ আপ শটের জন্য। লং-শট,  মিড্ শট বা কাঁধের ওপর দিয়ে শটগুলির সময় আবার সেই মন ছেড়ে দিতে হবে। তুমি তোমাকে চাবকাবে ওই মন ধরে রাখার জন্য, যাতে তোমার মন ওই ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় থাকে, শটের পর শট ওই মনকে পুনরাবৃত্ত করবে, টেকের পর টেক, তারপর ঘন্টাখানেক বাদে জানতে পারবে তোমার মনকে আবার ওই রকম ভেঙেচুরে ফেলতে হবে, কারণ নির্দেশক কিছু একটা ভুলে গেছেন’’। যদিও ব্র্যান্ডো লিখছেন তাঁর দৃশ্য ও সংলাপের অনেক অংশই তাঁকে তৈরি করে নিতে হয়েছিলো বারনারদোর মর্জিতেই, কারণ বারতোলুচি ‘‘ভালো ইংরেজি বলতে পারতেন না, মার্কিন ‘স্ল্যাং’ প্রায় কিচ্ছু জানতেন না। বস্তুত আমার প্রায় সব দৃশ্য ও সংলাপ আমাকেই লিখে নিতে হয়েছিলো, আমরা পরস্পরের সঙ্গে ফরাসি ও সাংকেতিক ভাষায় কথাবার্তা বলতাম’’। অতঃপর ছবিটির সংলাপ তুলে মার্লোন দেখাচ্ছেন কীভাবে সিনেমাটির মূল চরিত্র অর্থাৎ পলের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা মিলেমিশে যাচ্ছে। ব্র্যান্ডোর মতে বারনারদো তাঁর ব্যক্তিজীবনের মুকুর ব্র্যান্ডোর চরিত্রের মধ্যে দিয়ে প্রতিফলিত করতে চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন দুই মুখ একাকার হয়ে যাক্। যদিও ব্র্যান্ডোর মতে বারতোলুচি কেন এই ছবি করছেন, কী আসলে বলতে চান তা নিয়ে কখনই স্পষ্টীকৃত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাননি, পরে প্রেসের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সময় এই জাতীয় সত্তার দ্বি-খন্ডন, একীকরণ, ইত্যাদি তত্ত্ব আমদানি করেছিলেন! আমাদের মনে পড়বে, ‘দ্য নিউ ইয়র্কার’ কাগজের বিখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক পলিন ক্যলের দু-পাতা ব্যাপী ‘লাস্ট ট্যাঙ্গো ইন প্যারিস’-এর সমালোচনার কথা, যেখানে পলিন (ব্র্যান্ডোর মতে পলিনই তাঁর দেখা শ্রেষ্ঠ সমালোচক) লিখছেন, ‘‘বারতোলুচি এবং ব্র্যান্ডো একটি শিল্পমাধ্যমে পরস্পরের মুখ বদলে নিয়েছেন। এর জন্য আমরা কি প্রস্তুত ছিলাম?’’। আরও কঠোর নৈতিক শুদ্ধবাদী অবস্থান নিলেন ‘সানডে টেলিগ্রাফ’-এর মার্গারেট হিংকসম্যান। তিনি লিখলেন, সম্মানিত স্টার মার্লোন ব্র্যান্ডোর পক্ষে এই জাতীয় চরিত্রে অভিনয় সাজে না কারণ ‘‘ এই ধরণের সিনেমা ভালো সিনেমার মুখোশে বস্তুত একটি নিপাট পর্নোগ্রাফি’’।

মার্লোন অবশ্য এর পরে জ্যাক নিকলসনের সঙ্গে সহ-তারকা হয়ে ‘দ্য মিসৌরি ব্রেক’ শীর্ষক ওয়েস্টার্ণ করতে চলে যান, মার্লোনের লক্ষাধিক অনুরাগীরাও স্বস্তি পান, মাত্র পাঁচ হপ্তার কাজের জন্য মার্লোন দশ লক্ষ ডলার পারিশ্রমিক পান, কিন্তু সে গল্প অন্য। কথা হচ্ছে ব্র্যান্ডো কথিত অভিনেতার ওই প্রস্তুতিকামী ‘মন’-টিকে নিয়ে। আমাদের গাঁ-দেশে এই জাতীয় অভিনেতা বিরল, বা অভিনতোর সে মন থাকলেও, পরিবেশ ও পরিপ্রেক্ষিত তাকে সবসময়ই প্রতিবন্ধকতার খাঁচা পরাতে থাকবে, তাও সবার জানা। অন্তত চলচ্চিত্রে তো বটেই। কিন্তু থিয়েটার মনের সেই অবরুদ্ধ ঈপ্সার মুক্তি ঘটিয়ে দিতে পারে। কারণ যৌনতা ও হিংস্রতা সেখানে প্রধানত আসে শব্দে, দৃশ্যে ততোটা নয়। তখন অভিনেতার সেই মন নিজেকে প্রস্তুত করে, সমস্ত ধ্বংসের মধ্যে নিজেকে গড়ে তোলার, সেই মানসিক পর্যায়ে নিজের শরীর ও হৃদয়কে নিয়ে যাওয়ার, তাকে রক্তাক্ত করার, ক্ষতবিক্ষত করার ও পরিণামে একটি নিটোল সৌন্দর্যমূর্তি দর্শকের সামনে পরিবেশন করার।

সম্প্রতি আমার আবার এ জাতীয় অভিজ্ঞতা হল আমাদের নতুন প্রযোজনা ‘মীরজাফর’ নির্মাণের সময়। আমার দুই বিখ্যাত অভিনেতা বন্ধু গৌতম হালদার ও কাঞ্চন মল্লিক এতে অভিনয় করেছেন। কাঞ্চনকে নিয়ে সামাজিক-সংযোগ-মাধ্যমে আগে লিখেছিলাম, পরেও হয়তো লিখবো, কিন্তু অগ্রজপ্রতিম গৌতম হালদার তাঁর ‘মীরজাফর’ চরিত্র নির্মাণে যে টেকনিক নিলেন তা আমার কাছে মার্লোন-এর সেই গল্পের স্মৃতি আবার ফিরিয়ে  আনলো। বস্তুত মীরজাফর বলতেই বঙ্গসমাজে যে কুচক্রী, বিশ্বাসঘাতক অনুষঙ্গ চলে আসে, নাটকটির চরিত্রায়ণ মোটেও সেরকম একপেশে নয়। তার নানান স্তর, বাঁক ও যাকে বলে পরিস্থিতিপ্রসূত ‘মুডবদল’ আছে। নির্মাণের গোড়ার দিকে ওই বদলগুলি ধরিয়ে দেওয়া বা বলে দেওয়া হয়তো বা সহজ, কিন্তু তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে সাঙ্গীকৃত করার কাজটি শুধু জটিল নয়, দুরূহ। গৌতম দেখলাম সেই  মনটিতে নিজেকে ধীরে ধীরে নিয়ে যাচ্ছেন, যেখানে মনকে একই সঙ্গে বেঁধে ফেলতে হয় আবার পরক্ষণেই ছেড়ে দিতে হয়। ক্ল্যাসিকাল গরিমায় উদবেজিত হতে হয় আবার নাশকতার বিনির্মাণে মেতে উঠতে হয়। অভিনেতা সেই অনন্ত সম্ভাবনার খনি, যিনি পাত্রে পড়া মাত্রই জল থেকে ধীরে ধীরে উষ্ণতার স্থানাঙ্ক অনুযায়ী বরফ ও তারপর ধোঁয়া হয়ে ওঠেন। এই ধরনের অভিজ্ঞতা সৃজনজীবনে কম আসে, তাই তাকে শব্দবন্ধ করাই শ্রেয়তর। বাকিটা রসিকজনের অবলোকনের ও আস্বাদনের ওপর ছেড়ে রাখাটাই বিধেয় হবে।

আর কাঞ্চনকে নিয়ে আমার বলার কথা এই যে লরেন্স গ্রোবেলের সঙ্গে ইতিহাসপম একটি সাক্ষাৎকারে একটি উক্তি অস্বীকার করেছিলেন প্রবাদপ্রতিম অভিনেতা আল পাচিনো। গ্রোবেল আল পাচিনোকে ‘গডফাদার’ প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করেছিলেন পাচিনো কি কখনও এই ধরনের উক্তি বন্ধুমহলে করেছেন যে, ‘‘লোকে হয়তো ‘গডফাদার’ দেখতে আসে ব্র্যান্ডোকে দেখবে বলে, কিন্তু হল থেকে বেরোয় আমাকে মনে রেখে’’। আল পাচিনো গ্রোবেলের কাছে স্পষ্ট অস্বীকার করেন এবং বলেন যে, না তিনি কখনই এ জাতীয় উক্তি করেননি। এখন কাঞ্চন মল্লিক একথা অস্বীকার করবেন কি না সেটাই দেখার!