ব্রাত্যর “মীরজাফর” সময়ের চিরকালীন দলিল, কুণাল ঘোষের কলম

        কুণাল ঘোষ

ব্রাত্য বসুর নাটকের একটা মজা আছে। সুদূর বা অদূর অতীতের ইতিহাস খোঁড়াখুঁড়ি করে যে কঙ্কালগুলো তুলে আনে, তাতে কোন এক জাদুতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করে এমন জীবন দেয়,যে মনে হয়, এই তো, এই মানুষগুলো আর তাঁদের সত্তার স্রোত এখনও বইছে সমাজে। এরা সমকালীন থেকে চিরকালীনে অনায়াসে উত্তীর্ণ। এরকম হত। এরকমই হয়।

কালিন্দী ব্রাত্যজনের দশম নিবেদন “মীরজাফর” ব্যতিক্রম নয়।  বিড়লা সভাঘরে তার প্রথম প্রদর্শনটি দেখার পর প্রথম উপসংহার, আবার দেখব। আপনারাও দেখুন।

কয়েক বছর আগে এক প্রকৃত  মধ্যরাতে একাডেমির মঞ্চে “রুদ্ধসঙ্গীত”-এর স্টেজ রিহার্সাল দেখার পরই লিখতে হয়েছিল, ঝড় তুলবে। ওটা শুধু দেবব্রত বিশ্বাসের জীবন নয়। ওটা শিল্পী, সমাজ, সময়, বিশ্বাস, দর্শন, শিল্পীস্বাধীনতা, শিল্পীসমাজের দ্বন্দ্ব, সংগঠন ও শিল্পীর সম্পর্কসহ গোটা বৃত্তটির উপর আতসকাঁচের মধ্যে দিয়ে আলোকপাত। তারপর একাধিকবার দেখেছি। ব্রাত্যর  পরের কাজগুলিতেও একই প্রবণতা।

এবার “মীরজাফর।” নাটকের চালচিত্রের সময়কাল পলাশির যুদ্ধের পর থেকে বক্সারের যুদ্ধ। কিন্তু  সেই সময়ের ইতিহাসের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে ব্রাত্য বুঝিয়ে দিয়েছেন, যুগে যুগে ক্ষমতা দখলের পিছনে থাকে কুৎসিত চক্রান্ত; যুগে যুগে থাকেন “মীরজাফর”রা; যুগে যুগে সমাজের শিরাধমনীতে একটা হিমশীতল ধারা শ্লোগান দিয়ে যায়,” মীরজাফর জিন্দাবাদ।”

নাটকের নাম ও মূল চরিত্র সিরাজদ্দৌলা না করে মীরজাফর করার মধ্যে দিয়েই নাট্যকার, পরিচালক ব্রাত্য প্রমাণ দিয়েছেন তাঁর ব্যতিক্রমী ভাবনার। যে লোকটা ইতিহাসে খলনায়ক, হে দর্শক, তাকে দেখুন, তার মধ্যে দিয়ে চারপাশটা নতুন করে চিনুন। ব্রাত্য সাহস দেখিয়ে সফল। তাঁর আর একটি বড় কৃতিত্ব মীরজাফরের ভূমিকায় গৌতম হালদারকে ব্যবহার করা। অভিনয়কে কোন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যায়, তার অগ্নিপরীক্ষায় গৌতম এতটাই সফল যে শুধু এই চরিত্রটিকে দেখার জন্যেও আবার যেতেই হবে।মীরজাফরের দাপট, ক্রূরতা, বিলাসবৈভব, বিকৃত যৌনতা, অসহায়তা, গ্লানিবোধ, বৃদ্ধাবস্থাতেও আবার মসনদ দখলের ক্ষমতালিপ্সা; নাটকের অল্পপরিসরে ব্রাত্য যেভাবে সাজিয়েছেন আর গৌতম তার রূপায়ণ করেছেন, তা না দেখলে নাট্যপ্রেমীদের জীবন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। দর্শক বারবার অপেক্ষায়, কতক্ষণে মঞ্চে আসবেন গৌতম। এই চৌম্বকীয় আকর্ষণটাই শিল্পীর বড় সাফল্য। গৌতমের ম্যানারিজম মীরজাফরকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে।

ব্রাত্য নিজে ক্লাইভ। যথাযথ। প্রাণবন্ত। মানানসই। যে মীরজাফরকে “আব্বাজান” বলে আগাগোড়া সম্বোধন করে ক্ষমতার পটপরিবর্তন ও অর্থলাভের অভিযান ক্লাইভের, একসময় তাঁকেই সরিয়ে মীরকাশেমকে নবাব করার পর ক্লাইভ বিধ্বস্ত মীরজাফরকে বলছেন,”কীরে মীরজাফর, কেমন আছিস?” কাজ ফুরোলেই পাজি, এই প্রবাদের অমরত্ব প্রমাণ করেছে দৃশ্যটি। লুৎফুন্নেসা পৌলোমী বসু দারুণ। নিহত তরুণ স্বামী সিরাজের প্রতি অটুট প্রেম প্রকাশে তিনি স্নিগ্ধ, করুণ ; আবার তাঁর দখল নিয়ে মীরজাফর-মিরণ, বাপবেটার কুৎসিত সংঘাতের মুহূর্তে সাবলীল। পৌলোমীর চোখ প্রতিহিংসার আগুনকেও সঠিকভাবে জ্বালিয়েছে।

এই নাটক নির্মাণ যথেষ্ট কঠিন কাজ ছিল। ব্রাত্য ও তাঁর সহকর্মীরা খুব ভালো কাজ করেছেন। মঞ্চসজ্জা, পোশাক, আলো, শব্দ যথাযথ। মঞ্চের দুপাশে পর্দায় সংলাপের ইংরেজি সাবটাইটেল প্রয়োজনীয় নতুনত্ব।

মীরজাফরের খলনায়ক সত্তাকে সামনে রাখার পাশাপাশি কোথাও যেন ঝলক দিয়েছে সোনালী বিদ্যুৎরেখা। তিনি যদি ইংরেজের আবাহন না করতেন, তাহলে পশ্চিমী সভ্যতার উন্নয়নের ছোঁয়া লাগতে পারত না। মীরজাফরের মুখ দিয়েই বলিয়েছেন ব্রাত্য। এখানে একটু বলতে চাই, মীরজাফর সম্পর্কে একটু অন্য ভাবনাও আছে। এক, তিনি সিরাজের বিরুদ্ধে গেছিলেন সিরাজের বেয়াদপি আর অপমানের জন্য। ফলে বিশ্বাসঘাতক শব্দটা যথাযথ নয়। প্রতিশোধ পর্যন্ত ঠিক আছে। দুই, তখন ইংরেজের এই চেহারা নয়। ফলে স্বাধীনতা, পরাধীনতার ধারণাটাই তৈরি হয় নি। ওই প্রেক্ষিতে মীরজাফর কাঠগড়ায় উঠতে পারেন না।

এই নাটকে সিরাজ আর মীরজাফরের সম্পর্কের সমীকরণটা স্পষ্ট থাকলে আরও ভালো হত। উল্লেখ্য, সিরাজ এই নাটকে আছেন শুধু স্মৃতিচারণের সংলাপে আর শেষদৃশ্যে ছবিতে। সিরাজের অস্তিত্বের এমন অশরীরী ব্যবহারও ব্রাত্যর মুন্সিয়ানা।

আর একজনের কথা বলব। কাঞ্চন মল্লিক। মিরণ। কাঞ্চন ভালো অভিনেতা। কিন্তু মিরণের চরিত্রের সিরিয়াসনেসকে ছাপিয়ে কোথাও যেন হাততালিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে কাঞ্চনের কমেডিয়ান পরিচিতি। সেটা ব্যবহারের মৃদু চেষ্টাও আছে। এটা বোধহয় একটু পরিমার্জনযোগ্য। মীরজাফরের কল্পদৃশ্যের বিনোদনে পরিচিত হিন্দিগানের কলির ব্যবহার নাটকের মূল সুরে ব্যাঘাত না ঘটালেও এড়ানো গেলে ভালো হত। এটা একেবারে আমার ব্যক্তিগত মতামত। দেখার সময় ভালোই লেগেছে।

শেষে আবার বলি, নাটক “মীরজাফর” অসাধারণ। ব্রাত্য সাজিয়েছেন চমৎকার। অতীতের উপাদানকে আধুনিকতার মঞ্চে এনে ভবিষ্যতের আকাশে চিরন্তন দৈববাণীর মতো “আপলোড” করে দিয়েছেন এক পৈশাচিক উল্লাসের দানবীয় সদর্প ঘোষণা :”মীরজাফর জিন্দাবাদ।” আর গৌতম হালদার সেই দৈববাণী রক্তমাংসের প্রতিরূপ হয়ে আহ্বান করছেন, অভিনয় যদি দেখতে হয়, আসুন, আমাকে দেখুন, আমাকে।

ব্রাত্য, গৌতম, শিগগিরই আবার যাব আপনাদের “মীরজাফর” দেখতে। পরিচিতদেরও বলব, দেখে আসুন।