সাংবাদিক কুণালের ‘সাহিত্যিক’ সিলমোহর স্রেফ সময়ের অপেক্ষা, কণাদ দাশগুপ্তের কলম

কণাদ দাশগুপ্ত

আসলে গল্প-উপন্যাস পাঠের যেমন কোনও নির্দিষ্ট সূত্র নেই, তেমনই কোনও নির্দিষ্ট গল্প-উপন্যাস নিয়ে মতাপ্রকাশও কোনও সূত্রাধীন হতে পারেনা। আমি তেমন কিছুই করছিওনা, কারণ এই প্রতিবেদন ‘রানিসাহেবা’-র রিভিউ নয়।

এ বছরের শারদ-সাহিত্যের অনেক ক’টিই পড়ে ফেলেছি। কিন্তু ধাক্কা একটা লাগলো ‘পত্রিকা’ পুজো সংখ্যায় ‘রানিসাহেবা’-তে এসে। ‘ধাক্কা’ শব্দটি এখানে নেতিবাচক নয়। ধাক্কা বলতে বোঝাতে চেয়েছি, পিছনে ফেলে আসা চেনা-জানা-ভাগ নেওয়া কিছু বাস্তব ঘটনার খণ্ডিত পুনরুত্থান।  ‘রানিসাহেবা’ পড়তে বসে চমকে উঠেছি প্রথমেই। বহুদিন বাদে পর পর অনেক কিছুই ভেসে উঠলো মনে। পরে আসবো এ বিষয়ে।

‘রানিসাহেবা’-র লেখক কুণাল ঘোষ। ‘রানিসাহেবা’ আত্মপ্রকাশ করল সেই পত্রিকা গোষ্ঠীর এক শারদ সংখ্যায়, ফ্রি-ল্যান্সার হিসাবে যেখানে লিখে কুণাল জীবনের প্রথমবার লেখার জন্য চেক পেয়েছিলেন। অদ্ভুত সমাপতন।

বাংলা সাংবাদিকতার জগতে অনেকটা জায়গা জুড়েই আছেন কুণাল। প্রকৃত সাংবাদিকতা এবং সাহিত্য নির্মাণকে একাসনে বসানো সহজ কাজ নয়। সাহিত্যের অলিন্দে  কুণালের পদচারণা এই প্রথম নয়। তবে এ বঙ্গের বৃহত্তম পত্রিকাগোষ্ঠীর শারদ-সংখ্যার লেখক তালিকায় ঠাঁই পাওয়া, অবশ্যই প্রথম। সেই হিসাবে বলা-ই যায়, সাংবাদিক কুণালের ‘সাহিত্যিক’ পরিচয়ে এই বছর একটা সিলমোহর অবশ্যই লেগেছে।

‘রানিসাহেবা’ উপন্যাস নিয়ে কিছু বলার আগে, ‘রানিসাহেবা’-র নির্মাণ এবং ‘রানিসাহেবা’-র নির্মাতাকে নিয়ে শুরুতেই দু’টো কথা বলা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

বিষয়টি এখন সম্ভবত কারোরই অজানা নয় যে, নির্দিষ্ট অভিযোগে কুণাল ঘোষকে প্রায় তিন বছর বন্দি থাকতে হয়েছিল। রাষ্ট্রশক্তির কারণে এবং অকারণে সে সময়ে কুণালকে ঘুরিয়েছিল প্রায় গোটা রাজ্যে। রাজ্যের একাধিক সংশোধনাগারের বাসিন্দা হতে হয়েছিল কুণালকে। সেভাবেই এক সময় ঠিকানা হল কলকাতার প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগার। বিভিন্ন আদালতে মামলার তারিখে যাওয়া ছাড়া বাকি সময় অখণ্ড অবসর। সৃজনশীল মানুষ সাধারণত তাঁদের মস্তিষ্ককে শয়তানের কারখানা হতে দেন না। অলসতাও পছন্দের তালিকায় থাকে না। কুণালও রাখেননি। বিধি মেনে সংশোধনাগারের অফিস থেকে সংগ্রহ করল সরকারি ছাপ মারা সাদা খাতা, কলম। সেটা 2015 সাল। প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের ভিতরের মাঠের এক গাছের তলায় বসে শুরু হল ‘রানিসাহেবা’-র নির্মাণ যজ্ঞ। জেলের ওই পরিবেশ, মানসিক চাপ আকাশছোঁওয়া- কোনও কিছুই প্রতিবন্ধক হয়নি। ধীরে ধীরে আকার পেল ‘রানিসাহেবা’। কুণালের কাছে সেদিন বন্দি জীবনটাই ছিল বাস্তব, আচমকা এক ঝড় কুণালের জীবনের মোড় সাময়িকভাবে সেদিন ঘুরিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু বিস্ময়ের, এই ‘রানিসাহেবা’-তে সে সবের এক ফোঁটাও প্রতিফলন নেই। সেদিন বোধহয় একটা কুণালের মধ্যে  দু’টো কুণালের মস্তিষ্ক সক্রিয় ছিল। অথবা  পরম যত্নে একটাই মস্তিষ্ককে আড়াআড়িভাবে ভাগ করে নিয়েছিল দু’টি প্রকোষ্ঠে।

একজন যখন মাথা উঁচু করে ওইসব অভিযোগ থেকে মুক্ত হওয়ার লড়াই করছে, অন্যজন সে সময় কর্ণগড়ের পথে প্রান্তরে খুঁজে বেড়াচ্ছে রানি শিরোমনিকে, রানিসাহেবাকে। সৃজনশীল ভুবনের গর্বিত বাসিন্দারাই বোধহয় এভাবে নিজেকে গড়েপিটে নিতে পারে। পাঁচ হাজার বছর আগে কংসের কারাগারে একদিন জন্ম নিয়েছিল শ্রীকৃষ্ণ, যে শ্রীকৃষ্ণ কালান্তরে জগত রক্ষা করার কাজে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। আর আজ থেকে মাত্র তিন বছর আগে, তেমনই এক নিঝুম কারাগারের সেলে জন্ম নিলেন আমাদের এই ‘রানিসাহেবা’।

‘রানিসাহেবা’-র ভিত্তি, মেদিনীপুরের কর্ণগড়ের রানি শিরোমনি, রানির গড় এবং মন্দির। কর্ণগড়ের ইতিহাস অতি প্রাচীন। চুয়াড় বিদ্রোহের স্মৃতি বিজড়িত রানি শিরোমণির গড় এখন প্রায় বিলীন। গড় বা দুর্গের আর অস্তিত্ব নেই। 1755 খ্রিস্টাব্দে মৃত্যু হয় শেষ অপুত্রক রাজা অজিত সিংহের। তাঁর দুই রানি ছিলেন ভবানী ও শিরোমণি। রানি শিরোমণি ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্থানীয় লোকজনদের এককাট্টা করে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। এই জন্য ইংরেজদের কোপে পড়েন রানি। তাঁকে বন্দিও করা হয়। শোনা যায়, নাড়াজোলের রাজা আনন্দলাল খানের মধ্যস্থতায় সর্বোচ্চ শাস্তি না হলেও রানিকে আবাসগড়ে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। অবশ্য রানির মৃত্যু নিয়ে অন্য কাহিনিও আছে।

‘রানিসাহেবা’-তে এই ইতিহাসটাও বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে। ইতিহাসাশ্রিত উপন্যাসে ইতিহাসের গুরুত্ব অবিকৃত থাকবে বলে আশা করা হয় এবং কল্পনাপ্রসূত আখ্যানেও কার্যকারণ সম্পর্কের ব্যাখ্যার প্রত্যাশা থাকে। উপন্যাসের লেখক যখন একজন সাংবাদিক, তখন স্বাভাবিকভাবেই ইতিহাসের মাটি এবং সাংবাদিক-জীবন থেকে সংগ্রহ করা কিছু অভিজ্ঞতাকে একটু একটু করে সাজিয়েই তিনি ‘রানিসাহেবা’ নির্মাণ করেছেন। নাম-ধাম না মিললেও ‘রানিসাহেবা’-র অধিকাংশ চরিত্রই বাস্তব থেকে নেওয়া। এমনকী, একদম শেষে প্রফেসরসাহেবকে লেখা রানিসাহেবার চিঠির কনটেন্টও বর্তমান সামাজিক পটভূমিতে যেন বড্ড বেশি বাস্তব । বাকি ঘটনা-পরম্পরাও বাস্তবেরই অংশ। গল্প আবর্তিত হয়েছে কিছু চরিত্রকে ঘিরে। সৌম্য, রূপালি, মৌসুমি বা নিখিলানন্দ-শোভনার দেখা মেলে আমাদের চারধারেই। তবে মজা লেগেছে যে কোনও সংবাদমাধ্যমে ‘রিপোর্টিং’ বনাম ‘ডেস্ক’-এর আবহমান স্নায়ুযুদ্ধের বিষয়টি এখানে বিশদে ব্যাখ্যা করে দেওয়ার চেষ্টা দেখে। উপন্যাসকে তরতর করে এগিয়ে নিয়ে যেতে  কিছু ঘটনা সংযুক্ত করতে হয়। এখানেও হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে সংযোজিত কিছু ঘটনা  কখনও না কখনও সংবাদ শিরোনামে থাকার সুবাদে একদমই অবাস্তব লাগেনি।

লেখক ভোলেননি একথা বলতেও যে কর্ণগড়ের নিসর্গ বড় মনোরম। গাছগাছালি, নদী দিয়ে চারদিক ঘেরা। মেদিনীপুর শহর থেকে জায়গাটি খুব বেশি দূরেও নয়। তাই এক সময় এই এলাকাটিকে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল, রাস্তা তৈরি হবে, হবে পার্ক। হয়নি কিছুই। তবুও নানা ঘটনার ঘনঘটায় ঢাকা পড়েনি কর্ণগড় আর রানি শিরোমনির জীবন-সৌন্দর্য আর জীবন-সত্যের সন্ধান। ইতিহাসের সত্য আর লেখকের সৃজনশক্তি, দুইয়ে মিলে ‘রানিসাহেবা’ হয়ে উঠেছে এক হৃদয়গ্রাহী উপাখ্যান।

‘রানিসাহেবা’ নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ  মতামত এখানে দেওয়াই যেত। কিন্তু রহস্য-গল্প বা ক্রাইম-থ্রিলারের সমীক্ষা শেষ করার যেমন একটা অলিখিত বিধান আছে, এই ‘রানিসাহেবা’ রহস্য উপন্যাস না হলেও, আমি সে অলিখিত বিধিটাই অনুসরণ করলাম। পাঠকের পড়ার আগ্রহ বিনষ্ট করার অধিকার আমার নেই।

আজ বা কাল, ‘রানিসাহেবা’ গ্রন্থাকারে প্রকাশ পাবেই। জনপ্রিয়তাও নিশ্চিত। সেই গ্রন্থে অবশ্যই থাকবে লেখকের লেখা ভূমিকা-লিপি। আমি নিশ্চিত সেই ভূমিকাতে কুণাল ঘোষ নিজেই লিখবেন, এই ‘রানিসাহেবা’র জন্মের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের জন্মের কেন প্রভূত সাদৃশ্য রয়েছ। লিখবেন নির্মাণের ইতিহাস। লেখক অবশ্যই সেখানে বলবেন, ইতিহাস এই উপন্যাসের উপজীব্য হলেও এটি কখনই ইতিহাস নয়, নিখাদ এক উপন্যাস। ঐতিহাসিক ঘটনা সমূহের সত্যতা রক্ষার চেষ্টা তিনি কেন করেছেন । বলবেন, ব্যক্তিগত ও পেশাগত অভিজ্ঞতা বর্ণনার ক্ষেত্রে কেন এতখানি সংযত ছিলেন।

শেষে ছোট্ট করে বলি, লেখকও একমত হবেন, এই ‘রানিসাহেবা’র আসল নির্মাণ কিন্তু শুরু হয়েছিল 1998 সালে। কুণাল ঘোষ নামে এক সাংবাদিক যেদিন কর্ণগড় এবং চিরবঞ্চিত রানি শিরোমনিকে ‘আবিষ্কার’ করে বাংলা সংবাদপত্র জগতে আলোড়ন তুলেছিলেন, সেদিনও আজকের মতই আমি তাঁর সহকর্মীই ছিলাম। তাই এই ‘রানিসাহেবা’ নিয়ে লেখকের দৃষ্টিকোণ অনেকটাই বুঝেছি, ধরতেও পারছি।

আর, লেখক কুণালকে আন্তরিক অনুরোধ, ‘রানিসাহেবা’-নির্মাণ পর্বও তো একটি স্বতন্ত্র উপাখ্যান। সেটা জানতেও আমরা সমান উৎসুক। আমরা জানতে চাই।