টিপু ‘দ্য টাইগার

ভারতের বীরযোদ্ধা, অসম সাহসী টিপু সুলতানের জন্মদিন পেরলাম 24 ঘন্টা আগে। তাঁর 268তম জন্মদিনে সংবাদ বিশ্ববাংলার শ্রদ্ধার্ঘ্য:

জন্ম : 20 নভেম্বর 1750
মৃত্যু : 4 মে, 1799

ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের মহীশূর রাজ্যের শাসনকর্তা। এক বীর যোদ্ধা। ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দুরন্ত সাহস দেখিয়ে তিনি ইতিহাসের হিরো। আর এই শৌর্য-বীর্যের কারণে শের-ই-মহীশূর (মহীশূরের বাঘ) নামে খ্যাত ছিলেন। ভারতের মুক্তি যোদ্ধাদের বীরপুত্র।
দক্ষিণ ভারতের মহীশূর রাজ্যের শাসক ছিলেন টিপু সুলতান ৷ পিতা হায়দার আলি ছিলেন মহীশূর রাজ্যের সেনাপতি ৷
শ্রীরঙ্গপত্তনম গ্রামে কাবেরী নদীর একটি ব-দ্বীপে নির্মিত একটি দূর্গ থেকে রাজ্য শাসন করতেন৷ বর্তমানে শ্রীরঙ্গপত্তনম গ্রাম দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের মান্ডিয়া জেলার অন্তর্গত৷ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে যুদ্ধে 1799 সালে নিহত হন। টিপুর সেনাপতি মীর সাদিক বিশ্বাসঘাতকতা করে ব্রিটিশদের সঙ্গে হাত মেলান৷ পরে তার পরিবারের লোকজনকে ভেলোরের দূর্গে বন্দি করে রাখে ব্রিটিশ শাসকরা৷

শের-ই-মহীশূর-এর ইতিহাস

টিপু সুলতানকে ডাকা হতো শের-ই-মহীশূর। উপাধি ইংরেজদেরই দেয়া। তাঁর এই বাঘ (শের) হয়ে ওঠার পিছনে অনেকগুলি বিষয় সম্পর্কিত ছিল। মূল কারণ ছিল তাঁর অসাধারণ ক্ষিপ্রতা, দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা আর কৌশলপূর্ণ রাজ্য পরিচালনা। বাবার সুযোগ্য উত্তরসূরি ছিলেন টিপু। বাবা হায়দার, 1749 খ্রিস্টাব্দে টিপু নামে এক ফকিরের দোয়ায় টিপুকে লাভ করেন এবং ফকিরের নামেই ছেলের নাম রাখেন “টিপু”। মহীশূরের স্থানীয় ভাষায় (কানাড়ী ভাষা) ‘টিপু’ শব্দের অর্থ হলো বাঘ । হয়তো তাঁকে ‘শের-ই-মহীশূর’ ডাকার পিছনে এটাও একটা কারণ ছিল।

ছোটবেলা থেকেই টিপু, বাঘের গল্প শুনতে ভালোবাসতেন। বাবাই তাঁকে বাঘের গল্প শোনাতেন। কিশোর বয়সে টিপু সুলতান বাঘ পুষতে শুরু করেন। বাঘ নিয়ে তাঁর আগ্রহের শেষ ছিল না। বাবার মৃত্যুর পর তিনি যখন সিংহাসনে আরোহণ করলেন, তখন বাবার পুরোন সিংহাসনটি তিনি ঠিক পছন্দ করলেন না। তাই তিনি তৎকালীন শ্রেষ্ঠ কারিগর দিয়ে কাঠের ফ্রেমের উপর সোনার পাত বসিয়ে তার উপর মণিমুক্তা ও রত্নখচিত একটি সিংহাসন বানিয়ে নিলেন, যাকে বরং “ব্যাঘ্রাসন”ই (Tiger throne) বলা যায়। কারণ আট কোণা ওই আসনটির ঠিক মাঝখানে ছিলো একটি বাঘের মূর্তি। 8 ফুট চওড়া আসনটির রেলিংয়ের মাথায় বসানো ছিলো সম্পূর্ণ সোনায় তৈরি দশটি বাঘের মাথা, আর উপরে ওঠার জন্য ছিল দুধারে, রুপোর সিঁড়ি। পুরো ব্যাঘ্রাসনটাই ছিল বাঘের শরীরের মতো ডোরাকাটা।

টিপু সুলতানের উপদেষ্টা ছিলেন পন্ডিত পুরণাইয়া। টিপু সুলতান সামরিক তালিম নেন সর্দার গাজি খানের কাছে। ছিলেন বহুভাষায় পারদর্শী। টিপুর রাজ্যের প্রতীক ছিল বাঘ। বাঘই তাঁর অনুপ্রেরণার মতো। তাঁর রাজ্যের পতাকায় কানাড়ী ভাষায় লেখা ছিল ‘বাঘই ঈশ্বর’। সমস্ত পোশাক ছিল হলুদ-কালো রঙে ছাপানো আর বাঘের শরীরের মতো ডোরাকাটা। তিনি যে তরোয়াল ব্যবহার করতেন, তার গায়েও ছিল ডোরা দাগ এবং হাতলে ছিল খোদাই করা বাঘের মূর্তি। তাঁর ব্যবহৃত রুমালও ছিল বাঘের মতো ডোরাকাটা। তাঁর রাজ্যের সমস্ত সৈনিকের পোশাকে থাকত বাঘের ছবি। সৈন্যদের ব্যবহার্য তরোয়াল, বল্লম, বন্দুকগুলির নল, কুঁদো, হ্যামারেও আঁকা থাকত বিভিন্ন আকারের বাঘের প্রতিরূপ কিংবা মূর্তি। এমনকি তিনি তাঁর রাজ্যের প্রধান সড়কগুলির পাশে, বাড়ির মালিকদেরকে বাড়ির দেয়ালে বাঘের ছবি আঁকার নির্দেশ জারি করেছিলেন। তখনও তাঁর বাঘ পোষার বাতিক যায়নি। রাজবাড়িতে বেশ কয়েকটি পোষা বাঘ ছিল। তার কয়েকটি আবার তাঁর ঘরের দরজার সামনে বাঁধা থাকতো।

টিপু সুলতানের আত্মসমর্পণ

1781 সালে ইংরেজ সেনাপতি হেক্টর মুনরোর ও তাঁর বাহিনীর কাছে দ্বিতীয় মহীশূর যুদ্ধে টিপু ও তাঁর বাবা মারাত্মক নাজেহাল হন এবং টিপুর রাজ্যের যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হয়, মৃত্যু হয় বহু সেনার। এমনিতেই টিপু ছিলেন ইংরেজবিরোধী, সেইসঙ্গে এই পরাজয়ে তিনি আরও বেশি ক্ষোভে ফুটতে থাকেন। 1793 সালে হেক্টর মুনরোর একমাত্র পুত্র সুন্দরবনের সাগর দ্বীপে বাঘ শিকার করতে গিয়ে বাঘ আক্রমণে নিহত হন। এই সংবাদ পেয়ে টিপুর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে যায়। তিনি এই ধারণা কাজে লাগিয়ে একটি বিচিত্র খেলনা বানিয়েছিলেন, যা সারা দুনিয়ায় “টিপু’স টাইগার” (Tipu’s Tiger) নামে বিখ্যাত হয়ে আছে। ফরাসি যন্ত্রকুশলীদের হাতে তৈরি প্রমাণ সাইজ বাঘের আকারের এই খেলনাটিতে ক্লকওয়ার্ক সিস্টেম ব্যবহৃত হয়েছিল। খেলনায় দম দিয়ে ছেড়ে দিলে এর সাথে লাগনো একটি অর্গান পাইপ থেকে রক্ত হিম করা বাঘের প্রচণ্ড গর্জন, আর এক ইংরেজের প্রচণ্ড গোঙানির আওয়াজ বের হতো। পুরো খেলনাটি ছিল এরকম — একজন ইংরেজ একটি বাঘের থাবার মধ্যে অসহায়ভাবে পড়ে গোঙাচ্ছে, আর একটা বাঘ প্রচন্ড আওয়াজ করে সেই ইংরেজের বুকের উপর চেপে গলা কামড়ে ধরতো। তখন ইংরেজটি তার হাত উঠিয়ে চেষ্টা করতো বাঘের মাথাটি এদিক-ওদিক সরিয়ে দিতে।ভিতরকার অর্গান থেকে বেরিয়ে আসত মহীশূর সুলতানের প্রিয় গজলের সুরও। “টিপু’স টাইগার” বানানোর পিছনে একদিকে যেমন ছিল তাঁর ইংরেজদের প্রতি উষ্মা, তেমনি অন্যদিকে ছিল প্রচন্ড ব্যঘ্রপ্রীতি। সময় পেলেই তিনি বাঘটিতে দম দিতেন। কখনও কখনও রাতের পর রাত একই জিনিস দেখে গায়ের জ্বালা মেটাতেন।

টিপুর আত্মসমর্পণ

টিপুর পরিবার

টিপু সুলতানের 4 স্ত্রী, 15 পুত্র এবং কমপক্ষে 8 কন্যা সন্তান ছিল। কন্যাদের পরিচিতি অজানাই রয়ে যায়।