আদি-রা বাতিল, অন্য দল ভাঙ্গানোই কৌশল বিজেপি’র, কণাদ দাশগুপ্তর কলম

কণাদ দাশগুপ্ত

কণাদ দাশগুপ্ত

রাজ্য বা জেলা, বিজেপি ক্রমশই ‘দখল’ করে নিচ্ছে বিভিন্ন দল থেকে আসা লোকজন। দলের পুরনো নেতা-কর্মীরা কোনঠাসা। অন্য দল থেকে আসা লোকজনের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য বঙ্গ-বিজেপি তো কেন্দ্রীয় নেতাদের সবুজ সংকেতে “দল ভাঙ্গানোর সাব-কমিটি” পর্যন্ত গঠন করেছে। দলের নীতি-আদর্শ চুলোয় যাক, অন্যান্য দল ভাঙিয়ে বিজেপির কলেবর বৃদ্ধি করতে না পারলে তাঁদের হাতে যে স্রেফ পেন্সিলটাই থেকে যাবে, এমন ডিপ্রেশনে ভুগছে বঙ্গ-বিজেপির নেতারা।

প্রশ্ন উঠছে, বিজেপি যদি সত্যিই নীতি- আদর্শ ভিত্তিক দল (প্রচার তো এমনই), হয়ে থাকে, তাহলে আদি পদ্মবাহকরা কেন অন্য দলের দিকে তাকিয়ে ছোঁক-ছোঁক করছেন এবং অন্যদল ভাঙিয়ে নিজেদের আয়তন বৃদ্ধি করাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে ? আসলে এতদিন চেপেচুপে রাখা গেলেও, লোকসভা ভোটের মুখে বঙ্গ-বিজেপির শতছিন্ন জামাকাপড় প্রকাশ্যে চলে আসছে। রাজ্য নেতারা সদর্পে বলেছেন লোকসভায় এ রাজ্য থেকে 20/22 আসন প্রায় নিশ্চিত। বঙ্গ-নেতাদের এই তালকানা বক্তব্যকে দিল্লি যে এতখানি নম্বর দিয়ে ফেলবে, তা বলার সময় একবারও ভাবেননি রাজ্য বিজেপি’র শীর্ষনেতারা। দিল্লি তথা অমিত শাহ-সিদ্ধার্থনাথ সিংরা রাজ্য নেতাদের বচনে ভরসা করে সংখ্যা আরও বাড়িয়ে সাংসদ সংখ্যা 25-27-এ নিয়ে গিয়েছেন। এর ফলে চাপে পড়েছেন রাজ্য নেতৃত্ব। বঙ্গে 25-27 আসন পাওয়ার ঘোষনাকে অতি বড় বিজেপিও আমল দিচ্ছেন না। উল্টে কর্মী-সমর্থকরা হাসাহাসি করছেন আর ভাবছেন, “এ কারা আমাদের নেতা হয়েছেন, যাদের বাস্তব বোধেরই এততো অভাব”। একইসঙ্গে বলছেন, “ভাড়াটে সৈন্য দিয়ে আজ পর্যন্ত কেউ কোনও যুদ্ধে জেতেনি। বঙ্গ-বিজেপিও 2019-এর ভোটযুদ্ধে জিতবেনা”। মোদ্দা কথা, এ রাজ্যে দলের আদি লোকজনের ওপর আর ভরসাই নেই বিজেপি’র।

পরিবর্তনের লড়াইয়ে জিতে ক্ষমতায় আসার পরে প্রায় সব দল ভাঙিয়ে কুখ্যাতদের তৃণমূলে সামিল করার কাজ যিনি শুরু করেছিলেন, তিনি এখন তৃণমূলে আর নেই। কিন্তু নতুন দল, বিজেপিতে গিয়েও দীর্ঘদিনের অভ্যাসটা বহাল রেখেছেন। এখন তিনিই রাজ্য বিজেপি’র অন্যতম মুখ। এখানেও বহাল সেই অন্য দল ভাঙ্গানোর ফর্মূলা, ওই ফর্মূলা প্রয়োগ করে রাজ্য বিজেপিকে শক্তপোক্ত করতে ঝাঁপিয়েছেন তিনি এবং কয়েকজন। তবে ফলাফল আপাতত শূন্য। লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে এবার জেলায় জেলায় দল ভাঙানোর কমিটি গড়ছে বিজেপি। কিন্তু সেই কমিটিও এখন তেমন কোনও হেভিওয়েটের হাতে পদ্ম- পতাকা তুলে দিতে পারেননি। গেরুয়া বাতাস ভরে স্রেফ কিছু বেড়ালকে বাঘ বলে চালানো হচ্ছে।

আসলে রাজ্য বিজেপির বেশির ভাগ নেতাই ভিন্নদল ভেঙে আসা। তাঁদের হাতেই রাশ। মুকুল রায় গিয়েছেন তৃণমূল থেকে। রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের বাম- ঘনিষ্ঠতার কথা কারও অজানা নয়। লকেট চট্টোপাধ্যায় তৃণমূলের সঙ্গেই ছিলেন। জয়প্রকাশ মজুমদারের কংগ্রেস করতেন। একাধিক জেলার সভাপতি বা অন্য নেতাদের সিংহভাগই বাম, তৃণমূল বা অন্য রাজনীতির সঙ্গে ছিলেন। এখন সবাই জয় শ্রীরাম। তাহলে বিজেপি’র নিজেদের লোক কারা?

দিলীপ ঘোষ যতই অপ্রাসঙ্গিক ভাষণ দিন না কেন, তিনি তবু একবার হলেও ভোটে জিতেছেন। তবে সেই জেতার পিছনে কার বা কাদের সহায়তা ছিলো, সেটা এখন গৌণ বিষয়। তবু তিনি তো জিতেছেন। একবার জিতেছিলেন শমীক ভট্টাচার্য। কিন্তু রাহুল সিংহ-সহ একাধিক ‘নামডাকওয়ালা’ ও খুচরো নেতার এখনও একবারও ভোটে জেতা হয়নি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে পঞ্চায়েত সদস্য হওয়ার যোগ্যতাও অর্জন করা হয়নি। অথচ চেষ্টা বিস্তর হয়েছে। বিজেপির অন্দরমহলে একটা কথা অনেকদিন ধরেই ভেসে বেড়ায়, দলের অনেকের মূল লক্ষ্য, ভোটে জেতা নয়, নিজেদের ভবিষ্যত দিনযাপনের কড়ি বাড়ানো, যা দিল্লি থেকে নানা মোড়কে আসে। পরাজয়ের রেকর্ড করা একাধিক চরিত্র কোন জাদুতে ভোটে জেতার বা জেতানোর ‘ম্যানড্রেক’ হবেন, তার উত্তর খুঁজতেই দিশাহারা কর্মী-সমর্থকরা। আর সেই ভাবনা বোধহয় ছুঁয়েছে দিল্লিকেও। তাই দিল্লি বেশি জোর দিয়েছে অন্য দল ভাঙ্গানোর দিকে।
বঙ্গ-বিজেপি এখন শাঁখের করাতের ওপর আছে। আসন্ন লোকসভা ভোটে 25-27 আসন পেতেই হবে, একদিকে এমনই কেন্দ্ৰীয় বিজেপির চাপ,অন্যদিকে বঙ্গ বিজেপির নেতাদের ‘চাকরি’ যাওয়ার আতঙ্ক। দলের একাধিক শীর্ষ নেতার ঘনিষ্ঠ অনুগামীরা তো বলছেনই, “দাদারা বেশ চিন্তায় আছেন। ঘুম নেই। খিটখিটে হয়ে যাচ্ছেন দুশ্চিন্তায়”।

মোটের ওপর বঙ্গ-বিজেপির ভবিষ্যত এখনও বেশ অন্ধকার। রাজ্য নেতাদের নিশ্চিত ধারনা, দিল্লি নানা এজেন্সিকে সক্রিয় করে, টাকা দিয়ে, নেতা দিয়ে, সভা করে, রথ বার করে, ভিন রাজ্য থেকে ভোটার এনেই একমাত্র পারবে তাঁদের ‘বিপুল ভোটে’ জিতিয়ে আনতে।

সংকটে ‘অচ্ছে দিন’।