পরীরানী

ড.দেবানী লাহা(মল্লিক)

ড.দেবানী লাহা(মল্লিক)

আদর করে নীলিমা বসু নাতনীর নাম দিয়েছিলেন পাখী। সত্যিকারের পাখীর সঙ্গে এই মেয়েটার স্বভাবগত এত মিল হবে তা তার ঠাম্মি কেন বাড়ীর লোকজন এমনকি ভগবানও মনে হয় জানতেন না।সারাদিন পাখী ছোট্ট মুনিয়া পাখীর মতই কিচির-মিচির করে।পাখীর মতই তার একটুখানি খাওয়া আর ছোট-খাটো গড়ন।বেশ ছোটবেলায় পাখী খুব কাঁদলে বা বায়না করলে পাখীর মা তাকে একটা ছড়া বলে ভোলাত-

”শালিক পাখী শালিক পাখী
তুই আকাশের মালিক নাকি?
মেলে দিয়ে রঙীন ডানা
চষে বেড়াস আকাশখানা
শালিক পাখী।”

অবাক কান্ড!পাখী কি বুঝত কে জানে সাথে-সাথে তার কান্না থেমে যেত।আসলে ডানাওয়ালা কোনোকিছু দেখলে পাখীর মনে যেন কি এক অবাক বিস্ময় জেগে উঠত।খুব ছোটতে অস্পষ্ট উচ্চারণে পাখীকে সে বলত ‘বুকি’।ফড়িং হোক,প্রজাপতি হোক,আরশোলা হোক অথবা ডানাওয়ালা পিঁপড়ে;যেকোনো উড়ন্ত বস্তুই তার কাছে ছিল ‘বুকি’।

নীল আকাশে উড়ন্ত পাখী দেখলে ছোট্ট পাখী আর নিজের মধ্যে থাকত না।অন্য কোন এক জগতে যেন সে পাড়ি দিত।তার মনে হতো আকাশের পাখীটার সঙ্গে সে যেন মিলে-মিশে একাকার হয়ে গেছে।সে নিজেই আকাশের পাখীটার মত উড়ছে।পাখী যখন একটু বড় হল মানে তার যখন ঐ ছ-সাত বছর বয়েস তখন তার আর একটা নতুন রোগ দেখা দিল।খাঁচার ভেতর বন্দী পাখী দেখলে টুক্ করে খাঁচার দরজাটা খুলে তাকে উড়িয়ে দিত পাখী।সে বাড়ী হোক অথবা আত্মীয়ের বাড়ী।একবার তো মেলায় গিয়ে খাঁচার দরজা খুলে দু-দুটো বুলবুলি উড়িয়ে দিয়েছিল পাখী।সে কি ঝামেলা।পাখী বায়না ধরেছিল সব কটা পাখীই নাকি সে উড়িয়ে দেবে।শেষ পর্যন্ত দুটো বুলবুলির দাম গুনে-গুনে দিতে হয়েছিল পাখীওয়ালাকে।পাখীর মা যখন পরে তাকে বকাবকি করে বলেছিল-

”বল কেন এমন কাজ করলি?”
তখন পাখী স্পষ্ট উত্তর দিয়েছিল-

”ওদের তো খাঁচায় থাকতে খুব কষ্ট হয় মা।ওরা আকাশে ওড়ে। ঐটুকু খাঁচায় কি উড়তে পারে?ওদের ডানা আটকে যায় যে!”

পাখীর মা মনোরমা এর আর কোনো উত্তর দিতে পারেনি। ভেবেছিল-

”এইটুকু বয়েসে এত কিকরে বোঝে মেয়েটা কে জানে!”

একবার হল এক ভীষণ বিপত্তি।সেই গল্পটাই বলব এখন।পাখী ছোট ইস্কুল থেকে বড় ইস্কুলে ভর্তি হল ক্লাস ওয়ানে।এত্তো ছবিওয়ালা বই পেয়ে তো সে মহাখুশি।বাংলা বইতে ডানাওয়ালা পরীর ছবি দেখে তার মা আর ঠাম্মিকে সে প্রশ্নে-প্রশ্নে জর্জ্জরিত করে ফেলল।

”মা ওটা কি পাখী?মা ও কি মানুষ?তাহলে সব মানুষের ডানা নেই কেন?
ও কি উড়তে পারে?তাহলে আমাদের ডানা নেই কেন?”

মনোরমা অতিষ্ট হয়ে হাল ছেড়ে দিলে ঠাম্মিকে প্রশ্ন করা শুরু করে পাখী।

”ঠাম্মি পরীরা কোথায় থাকে?কোথায় গেলে পরীদের দেখতে পাওয়া যায়?”

ঠাম্মি পাখীকে পরীদের গল্প বলে-

”পরীরা থাকে নীল আকাশে মেঘের বাড়ীতে।পূর্ণিমার রাতে এক-একদিন পরীরা জ্যোৎস্নামাখা মায়াময় পৃথিবীতে নেমে আসে।নদীতে নেমে খেলা করে, ঝরনার জল খেয়ে আবার মেঘের রাজ্যে ফিরে যায়।পরীরাণীর হাতে থাকে যাদুকাঠি।সেই যাদুকাঠির স্পর্শে সে যা ইচ্ছে তাই করতে পারে।পরীরাণীর সাথে আরও অনেক-অনেক পরীরা থাকে।”

পাখী শুনতে-শুনতে বিহ্বল হয়ে যায়।আবার প্রশ্ন করে-

”আচ্ছা ঠাম্মি পরীরাণী আমার পিঠে ডানা করে দিতে পারবে?আমি আকাশে উড়তে পারব?”

ঠাম্মি বলে-

”পরীরা ইচ্ছে করলে পারেনা এমন কোনো কাজ নেই।নাও এবার ঘুমোও তো।সোনামেয়ে।কাল ইস্কুলে যেতে হবে তো।তুমি না সোনাপাখী!”

পাখী মনে-মনে পরীর রাজ্যে সাঁতার দিতে-দিতে ঘুমিয়ে পড়ে।

সেবার পূজোর ছুটিতে পাখীরা সকলে হরিদ্বার বেড়াতে গেল।পাখী, তার বাবা-মা,তার মামারবাড়ীর দিদান,মামু মিমি,সোনামাসী,ঠাম্মি আর পিসিমণি-পিসান।গঙ্গার ধারে যে বাড়ীটাতে গিয়ে তারা উঠল, সে বাড়ীটা ভারী সুন্দর।ঠিক যেন একটা রাজপ্রাসাদ।সবচেয়ে সুন্দর বাড়ীর বিরাট বড় ছাদটা।এর আগে পাখী কোনোদিন এত বড় ছাদ দেখেইনি।মনোরমা আর অন্যান্যরাও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সেই অপূর্ব সৌন্দর্যের দিকে।একদিকে স্বচ্ছতোয়া গঙ্গা কুলকুল ধ্বনিতে বয়ে যাচ্ছে।অন্যদিকে মনসা পাহাড়।মনসা পাহাড়ের গায়ে অজস্র জোনাকির মত আলো।নিস্তব্ধ নীরব মহাবিশ্বের মাঝে সে রূপ বর্ণনা করে বোঝানো যাবে না।ছাদ নয়তো যেন স্বপ্নের রাজ্য।ওপরে বিরাট বড় খোলা আকাশ।আকাশ ভরা অসংখ্য তারা ঝিকমিক করছে।দূরে-দূরে গাছের সারি দেখা যাচ্ছে।সব মিলিয়ে যেকোনো মানুষকে বিমুগ্ধ করার জন্য এই ছাদটি যথেষ্ঠ।সকলেরই মনে হবে এইখান ছেড়ে আর কোথাও যাব না।এইটাই হয়তো স্বর্গ!

সেদিন ছিল পূর্ণিমার রাত।সারাদিন আশেপাশের স্থান আর সন্ধ্যেবেলায় হর কি প্যায়ারের গঙ্গা আরতি দেখে সকলে ক্লান্ত হয়ে ছাদে বসেছিল গল্প-গুজব করতে।পরের দিন লছমনঝোলা যাওয়া হবে তাই আর বেশী ঘোরাঘুরি করেনি কেউ।আজ তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া করে সবাই শুয়ে পড়বে।আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে।রূপোর গোল থালার মত।জ্যোৎস্নার আলো ভাসিয়ে দিচ্ছে পৃথিবীকে।দূরে গঙ্গার ওপর চাঁদের আলো এমন ভাবে প্রতিফলিত হয়েছে যে মনে হচ্ছে কেউ বুঝি গলানো রূপো ঢেলে দিয়েছে গঙ্গার জলে।মনোরমা গান গাইছে-

”চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙ্গেছে,
উছলে পড়ে আলো
ও রজনীগন্ধা
তোমার গন্ধসুধা ঢালো।”

ঝিকিমিকি তারা, চাঁদের আলো, বিশাল আকাশ দেখতে-দেখতে আর মায়ের গানের সুরে পাখীও কেমন আনমনা হয়ে গেছে।হঠাৎ তার মনে হল-

”আজ তো পূর্ণিমা আজ যদি পরীদের রাণী নেমে আসে এইখানে?তাহলে খুব মজা হবে।আমি পরীদের রাণীর সাথে ঠিক ভাব করে নেব আর দুটো ডানা চেয়ে নেব।”

আরও ভাবল পাখী-

”পিঠের ওপর ডানা হলে জামা পরতেই যা একটু অসুবিধে হবে।ইস্কুলে যাওয়ার সময় ডানা নিয়ে কি করে যাব?কিন্তু ডানা মেলে যেখানে খুশি চলে যেতে তো পারব।মা খেতে জোর করলে,পড়ার জন্য বকলে ডানা মেলে ঐ দূর আকাশে পালিয়ে যাব।কেউ ধরতে পারবে না।”

এইসব ভাবতে-ভাবতে হঠাৎ পাখী দেখল ঐ ঐ দূরে ছাদের একেবারে ধার ঘেঁষে উঁচু পাঁচিলের ওপর বিরাট সাদা ডানা মেলে পাখীর মত কি একটা উড়ে এসে বসল।পাখীও তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে ঐ পাঁচিলের ধারে খাঁজটাতে বসে পড়ল।

”ওমা এতো পাখী নয়।এযে সাদা ডানাওয়ালা,নীল চোখ,নীল চুল মিষ্টি মত একটা মেয়ে।ঠিক তার বাংলা বইয়ের পরীর ছবির মত;সোনামাসীর মত।”

পাখী মিষ্টি মেয়েটার কাছে গিয়ে আস্তে-আস্তে জিজ্ঞেস করল-

”তুমি কে গো?তুমি কি পরীরাণী?”

নদীর কলতানের মত সুরেলা গলায় মিষ্টি মেয়েটা বলল-

”হ্যাঁ গো আমি পরীরাণী।তুমি এত করে ডাকলে তাই চলে এলাম তোমার সাথে দেখা করতে।এই যে দেখো আমার যাদুকাঠি।আজ থেকে আমরা বন্ধু কেমন?তোমাকে আজ আমি ডানা উপহার দিতে এসেছি।কাল তো তোমার জন্মদিন তাই।এরপর থেকে যেকোনো পূর্ণিমায় আমাকে ডাকলেই আমি তোমার কাছে চলে আসব।”

পাখী তো দারুণ খুশি।আর অবাকও বটে।তার কাল জন্মদিন পরীরাণী সেটাও জানে?আনন্দে মত্ত হয়ে সে বলল-

”তোমরা কি অনেকজন?কাল তো আমার জন্মদিন তুমি তো সবই জানো!তাহলে তোমাদের সকলকে আমি টফি দেব।আমি কলকাতা থেকে এত্তো এত্তো টফি এনেছি।”

পরীরাণী পাখীকে বলল-

”ঐ দেখো গঙ্গার ধারে,ঐ যে পাহাড়ের গায়ে তোমার কত বন্ধু!”

পাখী তাকিয়ে দেখে সত্যি-সত্যি পাহাড়ের গায়ে খাঁজে-খাঁজে,গাছের ডালে-ডালে, নদীর পাড়ে সারি-সারি পরীরা ওড়াওড়ি করছে।কেউ বসে আছে, কেউ বা গঙ্গার জল ছিটিয়ে খেলা করছে।তারা সকলে পাখীর কাছ থেকে টফি নিল,তাকে কত আদর করল,কত খেলা করল।এরপর পাখীকে পরীরাণী বলল-

”তুমি পাখী ভালবাসো তো?চলো আজ তোমাকে পাখীদের রাজ্যে ঘুরিয়ে আনি।”

বলেই পরীরাণী পাখীকে কোলে তুলে নিল তারপর সাদা-সাদা ডানা মেলে মেঘের রাজ্যের ভেতর দিয়ে উড়ে চলল।তার পিছন-পিছন অন্য পরী বন্ধুরাও যেতে লাগল।উড়তে-উড়তে পাখীর দেশে এসে পৌঁছল পরীর দল আর পাখী।সেখানে হরেক পাখীর মেলা বসেছে।গাছে-গাছে ফুল-ফল, প্রজাপতি কি আনন্দ!পাখীরা উড়ে এসে বসছে ওর হাতে, কাঁধে,মাথায়।সুরেলা গলায় মিষ্টি গান গাইছে! পরীরাণী পাখীকে বলল-

”তুমি খেলা কর আমি একটু পরেই তোমার পিঠের ডানা বানিয়ে দেব।”

পাখী তখন কি করবে আর ভেবে পাচ্ছে না।সকলকে এই ডানা দেখিয়ে খুব চমকে দেবে।হঠাৎ পরীরাণী কোথায় চলে গেল।চারদিকে শুধু মেঘ আর মেঘ!

”পাখী, পাখী, এই পাখী তুই এইখানে হিমের ভেতর ঠান্ডায় ঘুমিয়ে পড়েছিস কখন?এখানে কেউ ঘুমোয়?ওঠ!ওঠ! তাড়াতাড়ি।প্রায় সারারাত ধরে তোকে সকলে মিলে খুঁজছি।ভেবেছি তুই কোথায় হারিয়ে গেছিস।বলেই মনোরমা পাখীকে জড়িয়ে ধরে হাউ- হাউ করে কেঁদে ফেলল।”

যখন বড়রা আড্ডা দিচ্ছিল তখন ক্লান্ত পাখী কখন ছাদের পাঁচিলের গায়ে একটা খিলেনে আকাশ দেখতে-দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছে।তার হাতের মুঠোয় একগোছা সাদা পালক।কোনো পাখী ধরতে গেছিল হয়তো! যা পাখীর ঝোঁক।মনোরমার কোলে উঠে তখনও ঘুমোচ্ছে পাখী।ঘুমের ঘোরে বলছে-

”আমি কিন্তু সাদা ডানা নেব পরীরাণী—পরীরাণী তুমি কোথায়—কত মেঘ—-যাদুকাঠি—পাখীর দেশ—–।”