পাঁচ রাজ্যের ফল বলছে, NOTA নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে

সঞ্জয় সোম

পাঁচটি রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচন হয়ে গেল। তার মধ্যে মিজোরামে কংগ্রেস গোহারান হেরেছে, ছত্তিশগড়ে বিজেপি গোহারান হেরেছে, তেলেঙ্গানায় যা ছিল তাই আছে আর রাজস্থান এবং মধ্যপ্রদেশে কেউই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি, সুতরাং এই দুই রাজ্যে কংগ্রেস সরকার গঠন করলেও, তাদের কোনও প্রতিদ্বন্দ্বীর সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হবে। এক হিসাবে দেখতে গেলে এটা একটা খিচুড়ি রেজাল্ট। অর্থাৎ স্থানীয়স্তরে প্রতিষ্ঠান বিরোধী জনাদেশ হওয়া সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে এই পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনী ফলাফল আঞ্চলিক পরিসরেই সীমাবদ্ধ। এই নির্বাচনের কোনো জাতীয় অভিমুখ নেই।

লক্ষ্য করার বিষয় এই যে, গোটা রাজ্য মিলিয়ে মাত্র পৌনে দু’লাখ ভোটের ব্যবধানের জন্য রাজস্থানে রাজ্য সরকার পরিবর্তন হচ্ছে, আর মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেসের থেকে মোট প্রায় 50 হাজার ভোট বেশি পেয়েও বিজেপি সরকার গড়তে পারছেনা। এ এক আজব নির্বাচনী ধাঁধা।

ফলাফল যা হল, তাতে যদিও কেউই জেতেনি, আখেরে মতদাতারাই বোধহয় হেরেছেন। কারণ গণতন্ত্রে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত প্রাধান্য না পায় তাহলে সেটা কেমন গণতন্ত্র? এক্ষেত্রে দুটো-তিনটে আসন জেতা দলগুলো বা নির্দলেরা একটি জাতীয় দলের ওপর লাঠি ঘোরাবে, তা ছাড়া সরকার গঠন সম্ভব হবে না। এটা কি কাঙ্খিত? উদাহরণস্বরূপ, ধরুন 230 জন বিধায়কের মধ্যপ্রদেশ বিধানসভায় কংগ্রেস পেয়েছেন 114, অর্থাৎ সরকার গড়তে ন্যূনতম আরো দুজন বিধায়কের সমর্থন চাই। মায়াবতী যদি সেই 2 জন বিধায়কের যোগান দেন, তাহলে উত্তরপ্রদেশে বসে তিনি মধ্যপ্রদেশের নীতি নির্ধারণ ও সরকার পরিচালনা করবেন। ভাবা যায়? এরকমটাই কি তাহলে মধ্যপ্রদেশবাসী চেয়েছিলেন? মনে হয়না।

এটাও প্রশংসনীয় যে বিজেপি জোড়তোড়ের রাজনীতি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে। সেই কর্ণাটক থেকে লক্ষ্য করছি, সংখ্যা সামান্য কম হলেও দল সোজা বিরোধী আসনে গিয়ে বসছে। নীতিগত নির্ণয় বলেই মনে হচ্ছে এটা। এমনটা হলে, সেটা সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির দিকে অত্যন্ত সদর্থক পদক্ষেপ।

আসলে পশ্চিমবঙ্গে ভোট বলতে আমরা যা বুঝি তার থেকে এই নির্বাচনের আবহ একদম আলাদা। পাঁচটা রাজ্যেই ফলাফল যাই হোক না কেন, কোথাও একটাও বোমা ফাটলো না, গুলি চললো না, কারও প্রাণ গেল না, কোনও মারামারি হল না। অথচ, যেখানে সরকার পরিবর্তন হওয়ার কথা, চুপচাপ তা হয়ে গেল। আর যেখানে হওয়ার নয় সেখানে টিঁকে গেল। আসলে সব বিদগ্ধ এবং বোদ্ধা বাঙালিদের জিজ্ঞেস করার সময় এসেছে, কার শেষের শুরু সেসব তাত্বিক আলোচনা ছেড়ে শুধু একবার বলুন দেখি, আমাদের এই মহাবৌদ্ধিক রাজ্যে একটা কলেজের নির্বাচনও মারামারি ছাড়া সংগঠিত হয়না কেন? বাংলার বীরপুঙ্গবদের দৃষ্টিতে বাকি দেশের সমস্ত দলীয় কর্মী-সমর্থক বা তাঁদের নেতারা নিশ্চয় ভয়ঙ্কর কাপুরুষ, তাইনা?

আরও পড়ুন : চাপে পড়ে গেলেন মোদি-শাহ

শেষে আসি NOTA-র কথায়। রাজস্থানে কংগ্রেস আর বিজেপির মোট ভোটের ব্যবধান 1.77 লাখ আর নোটা হল 4.48 লাখ। মধ্যপ্রদেশে সংখ্যাটা আরও চমকপ্রদ। ওখানে বিজেপি আর কংগ্রেসের মোট ভোটের ব্যবধান 47 হাজার আর নোটা হলো 4.37 লাখ। বহুদলীয় গণতন্ত্রে কেউ সরকারপক্ষকে ভোট দেবেন, কেউ বিপক্ষের বিভিন্ন দলগুলোকে। কেউ কেউ ভোটই দেবেন না। এটাই স্বাভাবিক। এর ভিত্তিতেই নির্ণয় হবে জনগণ কি চাইছেন। একদলীয় শাসন চাইছেন না বহুদলীয় শাসন চাইছেন ইত্যাদি। কিন্তু যাঁরা সব দলের ওপরেই বীতশ্রদ্ধ, এমন মানুষের ভোটে সরকার পতনের বা গঠনের নির্ণয় হচ্ছে, এটা কেবল অদ্ভুত নয়, গণতন্ত্রের পক্ষে অশনিসংকেতও বটে। অর্থাৎ যাঁরা সদর্থক ভোট দিলেন তাঁদের ভোটের চেয়ে যাঁরা সংসদীয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভাগীদার প্রত্যেকের প্রতিই বিতৃষ্ণা দেখালেন, তাঁদের ভোট বেশি নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করলো, এ কেমনধারা রাজনীতি? NOTA নিয়ে কিন্তু নতুন করে ভাববার সময় এসেছে। মানুষ ভুল নির্ণয় করলে আগামী নির্বাচনে তাঁরা নাহয় সে ভুল শুধরে নেবেন। কিন্তু সিস্টেমই যদি জনমতকে বিপথে চালিত করে, সেটি দলমত নির্বিশেষে গোটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক।