রবিবারের বাবুইবাসা : 06.01.19

।। 2018য় বাংলার সেরা দশ ছবি ।।

সুনন্দ সান্যাল

সাম্প্রতিককালে ছবির জগতের উল্লেখযোগ্য গতিবিধি হলো বুনোট চিত্রনাট্য, মৌলিক, স্বতন্ত্র, শক্তিশালী চিন্তাভাবনার বড়ো পর্দায় উপস্হাপনা। পরিচালক ও প্রযোজকের কাছে যতই বিখ্যাত সুপারস্টার/অভিনেতারা থাকুন না কেন, গল্প ও চিত্রনাট্য শক্তিশালী না হলে দর্শকরা মুখ দেখতে প্রেক্ষাগৃহমুখী হবেন না এটা নিশ্চিত।

সিনেমাপ্রেমীদের ধারণা বাংলায় সেই উচ্চমানের কাজ হচ্ছে না বা ভিন্ন ধরনের চিন্তাভাবনা নিয়ে কোন চেষ্টা চলছে না, এমন ভাবনা কিন্তু সঠিক নয়। বাংলায় যথেষ্ট ভালো ভালো কাজ হচ্ছে, কিছু পরিচালকরা চেষ্টা করছেন উন্নতমানের ছবি উপহার দেওয়ার। যে ছবিগুলো সত্যিই বাংলার চলচ্চিত্র জগতে পরিবর্তন আনছে বা বিভিন্ন মহলে চর্চিত হচ্ছে, প্রশংসা পাচ্ছে, দুর্ভাগ্যবশত সেই ছবিগুলো সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয় না, তেমনভাবে স্হানও হয় না।

2018 তে #PressFreedomRanking এ ভারতের স্হান 138 নম্বরে। 2016 তে ছিলো 133, 2017 তে ছিলো 136। অর্থাৎ, সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের স্বতন্ত্রতা, নিরপেক্ষতা সম্পূর্ণরূপে হারিয়েছে তা সে রাজনীতি হোক বা বিনোদন। ক্ষমতাশালীদের পদলেহন করাই সংবাদমাধ্যমের কাজ। তবে সেটা স্পষ্ট হয় বাংলার এক বিনোদন সাংবাদিকের প্রকাশ্যে বলা একটি উক্তিতে “ক্ষমতাশালীদের গুণগান করাই সাংবাদিকদের কাজ। সংবাদমাধ্যম যা বলবে সেটাই সত্যি, জনগণের সত্যি মিথ্যা বিচার করার কোনও যোগ্যতা নেই, যা লিখব তাই মেনে নেবে।”

জনগণই শ্রেষ্ঠ বিচারক, কোনও সংবাদমাধ্যম নয়। এই বছরের সেরা দশটি বাংলা ছবির নাম আপনাদের জানিয়ে রাখি যারা দর্শকমহলে ও অন্যান্য মহলে প্রশংসা, সম্মান ও খ্যাতি পেয়েও বাংলায় ব্রাত্য।

নি:সন্দেহে, প্রশ্নাতীতভাবে এই বছরের সেরার সেরা ছবি ইন্দ্রাশীষ আচার্য্য পরিচালিত #পিউপা। এই যুগের বাস্তব ও অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়ভাবনা নিয়ে গঠিত এই চিত্রনাট্যে কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, সুদীপ্তা চক্রবর্তী, রাহুল ও অন্যান্যদের অভিনয়ে ছবিটি শ্রেষ্ঠত্বের পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলা ছবির জগতে নতুন প্রাণের উন্মেষ ঘটেছে। ছবিটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তর মিলিয়ে এখনও পর্যন্ত মোট ৯টি পুরস্কার সম্মানে সম্মানিত হওয়া সত্ত্বেও বাংলার সংবাদমাধ্যমে তেমনভাবে স্হান হয় না।

এই বছরের একটি সেরা ছবির নাম হলো #রেনবো_জেলি। সৌকর্য্য ঘোষাল পরিচালিত এই ছবিতে অভিজ্ঞ অভিনেতা কৌশিক সেন ও শান্তিলাল মুখার্জীর পাশে ক্ষুদে শিল্পী নবাগত মহাব্রত ও অনুমেঘার দুরন্ত অভিনয় হৃদয় ছুঁয়ে নিয়েছে।ছবির চিত্রনাট্য বিশেষ প্রশংসার দাবী রাখে, বাংলায় শিশুদের নিয়ে ও শিশুদের জন্য এই ধরণের ছবি খুব বিরল। আর পরী পিসির ভূমিকায় শ্রীলেখা মিত্রকে জন্ম জন্মান্তরেও ভুলবো না।

নবাগত পরিচালক অভিষেক সাহা পরিচালিত ছবি #উড়নচন্ডী এই বছরের বাংলা ছবিগুলোর মধ্যে নি:সন্দেহে শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ। বর্ষীয়াণ অভিনেত্রী চিত্রা সেন, সুদীপ্তা চক্রবর্তী, অমর্ত্য রায়, রাজনন্দিনী পাল ও অন্যান্যদের অভিনয় এবং সুরকার দেবজ্যোতি মিশ্রের সংগীত পরিচালনা এই রোড মুভিটিকে এক অনন্য পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে। ছবিটি ও ছবির কলাকুশলীরা সম্প্রতি বহু প্রশংসা ও সম্মানে সম্মানিত হয়েছে।

রঞ্জন ঘোষের পরিচালনায় এই বছরের 1টি মনকাড়া ছবির নাম হল #রঙবেরঙেরকড়ি। 4টে ভিন্ন বিষয় নিয়ে 4টে গল্পে কড়ির 4টে রঙ লাল (ভালোবাসা), নীল (অপ্রাপ্যতা), সোনালী (কেনাবেচা) ও সাদা (বিয়োগান্তক) দূর্ধর্ষভাবে প্রকাশিত হয়েছে। অভিনয়ে সোহম চক্রবর্তী ও ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত বিশেষ প্রশংসার দাবী রাখে, সাথে খরাজ মুখার্জী, দীপক চক্রবর্তী, ঋতব্রত মুখার্জী, ঋত্বিক চক্রবর্তী, অরুনিমা ঘোষ অনবদ্য কাজ করেছেন। এই ছবিটি দর্শকমহলের সাথে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে বহু সম্মানে সম্মানিত হয়েছে।

অনিকেত চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় #কবীর বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসের পাতায় বিশেষ উল্লেখযোগ্য স্হান দখল করে থাকবে। বাংলায় এই ধরণের গভীর গবেষণামূলক জঙ্গীবাদভিত্তিক ছবি প্রায় নেই বললেই চলে আর চিত্রগ্রাহক হরেন্দ্র সিংহের অনবদ্য গবেষণামূলক কাজ ছবিটিকে অন্য পর্যায়ে নিয়ে গেছে। পরিচালক ও প্রযোজকের এরূপ যৌথ সাহসী পদক্ষেপ যথেষ্ট প্রশংসার দাবী রাখে। সম্প্রতি তেলেঙ্গানা চলচ্চিত্র উৎসবে কবীর ছবিটি বিশেষভাবে চর্চিত হয়েছে, অভিনেত্রী রুক্মিণী মৈত্র অর্জন করেছেন সেরা নায়িকার পুরস্কার।

বছরের ১টি শ্রেষ্ঠ ছবির নাম #আহারে_মন। প্রতিম গুপ্তর লেখা চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় মমতাশঙ্কর, অঞ্জন দত্ত, পার্ণো মিত্র, পাওলি দাম, আদিল হুসেন, ঋত্বিক চক্রবর্তী, চিত্রাঙ্গদা ও অন্যান্যদের দূর্ধর্ষ অভিনয় ছবিটিকে উচ্চমার্গে নিয়ে গেছে। সমগ্র ছবিটায় বিরাজ করছে এক অপূর্ব স্নিগ্ধতা। ভালোবাসার বিভিন্ন স্তরের দুরন্ত উন্মেষ ঘটেছে এই ছবিতে। অথিতি শিল্পীরূপে সুপারস্টার দেব এক বিশেষ চমক। ছবির সংগীতে নীল দত্ত তার শ্রেষ্ঠ কাজ উপহার দিয়েছেন।

এই বছর বাংলায় এতো ব্যোমকেশের ছড়াছড়ি তারই মধ্যে অনিন্দ্য বিকাশ দত্তের পরিচালনায় #নীলাচলে_কিরীটি সর্বাঙ্গিক সফল ছবি। কিরীটি পর্বের এই ছবিটি এখনও পর্যন্ত সর্বশ্রেষ্ঠ তা বলাই বাহুল্য। ছবির চিত্রনাট্য বুনোট ও আকর্ষণীয়ভাবে গঠন করা হয়েছে। অভিনয়ে ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত, অরুনিমা ঘোষ, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ও সমদর্শী দত্ত দর্শকমহলে প্রশংসা কুড়িয়ে নিয়েছেন। ছবির আবহ সংগীতও যথেষ্ট শিহরিত করে।

বাংলা ধারাবাহিক খ্যাত লীনা গঙ্গোপাধ্যায় ও শৈবাল ব্যানার্জী পরিচালিত ছবি #মাটি এই বছরের এক দূর্ধর্ষ চমক। স্বাধীনতা, দেশ ভাগ, তৎকালীন ও সাম্প্রতিককালের রাজনৈতিক পটভূমি, দুই বাংলার মন ও সংস্কৃতির মিলন, ও হিন্দু মুসলিমের আত্মার যোগ বিষয়গুলো অসাধারণভাবে ব্যক্ত হয়েছে। এই ছবিটি কালজয়ী ছবি। কিংবদন্তী অভিনেত্রী সাবিত্রী চ্যাটার্জী তার অসামান্য অভিনয় দিয়ে ছবিটিকে শ্রেষ্ঠত্বের জায়গায় নিয়ে গেছেন, যোগ্য সঙ্গত দিয়েছেন আদিল হুসেন, পাওলি দাম, অপরাজিতা আঢ্য, মনামী ঘোষ ও প্রমুখরা। সুরকার দেবজ্যোতি মিশ্র সৃষ্টি করেছেন মন ছোঁয়া সংগীত।

বিখ্যাত পরিচালকদ্বয় জুটি নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ব্রত, তিয়াশা, অভিরাজ, খরাজ মুখার্জী, অপরাজিতা আঢ্য, কনীণিকা, গার্গী রায়চৌধুরী, চূর্ণী গাঙ্গুলী ও সুমন মুখোপাধ্যায় অভিনীত #হামি এইবছরের অনবদ্য সৃষ্টি। এই সময়ে দাঁড়িয়ে সামগ্রিক শিক্ষাসমাজের পরিস্হিতি বড়পর্দায় উপস্হাপনা করা ও সহজ সরল দৃশ্য দিয়ে সমাজকে শিক্ষিত করার বা সচেতন করার কৌশলকে কুর্ণিশ জানাতেই হয়। ছবিটি দর্শকমহলে যথেষ্ট প্রশংসিত ও চর্চিত হয়েছে।

মৈনাক ভৌমিকের পরিচালনায় যীশু সেনগুপ্ত, কোয়েল মল্লিক, জয় সেনগুপ্ত, বিশ্বনাথ বসু ও অপরাজিতা আঢ্য অভিনীত #ঘরে অ্যান্ড বাইরে এই বছরের এক চমকপ্রদ ছবি। ছবির চিত্রনাট্য বিশেষ প্রশংসার দাবী রাখে, আধুনিক বাঙালীর দক্ষ ব্যবসায়িক বুদ্ধির সাথে ভালোবাসার সংমিশ্রণ চমকপ্রদভাবে উপস্হাপন হয়েছে, সুরকার অনুপম রায় ও স্যাভির সংগীতও অসাধারণ।কোয়েল মল্লিক ও যীশু সেনগুপ্তের এই জুটি ও দু জনের অভিনয় দর্শকমহলে যথেষ্ট প্রশংসিত হয়েছে।

এই বছরের সেরা দশটি ছবির স্মৃতিকে উস্কে দিয়ে আগামী বছরে পা দেওয়ার আগের মূহুর্তগুলোতে নিজেকে যথেষ্ট আশাবাদী বলে মনে হচ্ছে যে, 2019 এ আরোও ভালো, ভিন্ন, মৌলিক ও শক্তিশালী কিছু ছবি পরিচালক ও প্রযোজকদের কাছ থেকে উপহার পাবো।

*******************************************

।। জীবন ।।

দীপমালা দাস

তিময় জীবন
বড়ই ছন্দময়;
শুরু হতে হয় শেষ
আমাদের জীবন,
এ জীবন বড়ই মধুময়।

আশালতায় আঁকড়ে ধরে
কেটে যায় জীবন।
বেজে ওঠে বারে বারে
মনের ক্রন্দন;

কখনও বা বেজে ওঠে
প্রাণেরও বন্ধন।
চিরকালই জেগে থাকে
পৃথক পৃথক নেশা।
মনের মধ্যে পেয়ে ওঠে
হৃদয়ের হ্রেষা;

শিশুমনের কৌতুহলে
যৌবনের অনুভূতিতে
যদিও বা যায় বোঝা
স্বপ্ন বাধে বাসা,
পরিণতের কর্মে
বাসনারত ধর্মে,
আরো কিছু পরে……..

অবশেষে,
বার্ধক্যের স্মৃতিতে
ধরা পড়ে আকাঙ্খা
অতীত দিনের কথা;

একসময় তা থেমে যায়,
মনের বাসনা ফেলে রেখে যায় ………. হায়!

সে জীবনে আর ফেরে না
কিন্তু বেঁচে থাকে তার আত্মা,
যারই নাম
মিলনাত্মার গ্রন্থসত্ত্বা।।

*******************************************