নতুন বছর, নতুন আশা

নিবেদিতা রায়, শিক্ষিকা, টাকি বয়েজ স্কুল

বছর আসে, বছর যায়৷ ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ, ইনস্টাগ্রামে ছবি আর শুভেচ্ছা বার্তার ছড়াছড়ি৷ পিকনিক আর নিউ ইয়ার পার্টির কমতি নেই৷ আন্তরজালের দৌলতে বিশ্বের সর্বত্র আমাদের অবাধ বিচরণ৷ তবু কোথাও যেন ফেলে আসা দিনগুলির জন্য মনের কোণায় হাঁকপাক৷ কথায় বলে স্মৃতি সতত সুখের৷ তাই কি? হয়তো বা৷ তাই বছরের শুরুতে বাড়ির কাছেপিঠে থাকা কয়েকজন ছেলেপুলেকে নিয়ে বছরের শুরুর দিনটিতে বেড়িয়ে পড়ি প্রতি বছর৷ উদ্দেশ্য—নিজের ছোটবেলার দিনগুলির স্বাদ ফিরে পাওয়া৷

এবছর একটু অন্যরকম অভিজ্ঞতা হল৷

আরও পড়ুন –মাধ্যমিক পরীক্ষা- কেন্দ্রের তালিকায় নেই ময়নাগুড়ি সুভাষনগর হাইস্কুল

ঘটনা এক৷ সকাল সাড়ে সাতটা৷ শান্তিপুর লোকাল৷ পয়লা জানুয়ারি৷ চার পাঁচজন ছেলে মেয়েকে নিয়ে ভিড়ের উল্টোদিকে চললাম৷ ট্রেনের বিক্রিওয়ালাদের থেকে বাদাম ভাজা, চিঁড়ে ভাজা এসব কিনে খেতে খেতে গল্প গান বাজনা চলছিল৷ আমাদের উল্টোদিকে কয়েকটি কলেজ পড়ুয়া মেয়ে বসে৷ আমাদের পরের সিটে দুজন মাঝ বয়েসী ভদ্রলোক৷ হঠাৎ লক্ষ্য করলাম আমাদের দুটি ছেলে একদৃষ্টে আমাদের পাশের সিটের ভদ্রলোকের সেলফোনের স্ক্রিনে একদৃষ্টে তাকিয়ে৷ একটু বিরক্ত হলাম৷ হোক না পাবলিক প্লেস, তাই বলে একজনের ব্যক্তিগত ফোনে অারএকজন এভাবে তাকিয়ে থাকবে? এসব ভাবতে ভাবতে ছেলে দুটিকে ডাকতে যাব তখনই ঘটল বিপত্তি৷ চোখের নিমেষে ওদের মধ্যে যে ছেলেটি বড়সড় চেহারার সে ভদ্রলোকের সেল ফোনটি ছিনিয়ে নিল৷ আমি হতবাক৷ ওর কাছে কিছু জানতে চাইবার আগেই অপর ছেলেটি বলে উঠল, “ম্যাডাম, বহুক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছিলাম এই ভদ্রলোক সামনে বসা দিদিদের ছবি তুলছেন মোবাইল ক্যামেরা দিয়ে৷ দিদিরা কিছু বুঝতে পারেন নি৷ এবার আপনি বলুন ম্যাডাম কী করা উচিৎ?” ততক্ষণে মেয়েগুলি ত্রস্ত হয়ে উঠেছে৷ আর অবাক কান্ড, ভদ্রলোক তো লজ্জিত হলেনই না৷ উল্টে চিৎকার করে বললেন, “তোমরা আমার মোবাইল ছিনতাই করেছ৷ আমি তোমাদের পুলিশে দেব৷” ততক্ষণে কিছু লোক জড়ো হয়েছে৷ একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বললেন, “পুলিশে তো তোমাকে আমরা দেব৷ তুমি পারমিশন না নিয়ে ওনাদের ছবি তুলেছ৷” অবশ্য মেয়েরা থানা পুলিশ করতে রাজি হলনা৷ তখন ছেলেদুটি ভদ্রলোকের সেলফোনে ওই মেয়েগুলির ছবি ডিলিট করে ওনাকে পরের স্টেশনে নামিয়ে দিল৷

আরও পড়ুন –‘জাতীয় যুব দিবস’-এ স্মরণে বরণে বিবেকানন্দ

ঘটনা দুই৷ এবার পটভূমি শান্তিপুর৷ বছর শুরুর দিনটিতে একটু ঘুরেফিরে ওখানকার হোটেলে খেয়ে আবার বাড়ি ফেরা এই উদ্দেশ্যেই সেদিন আমাদের ট্রেনযাত্রা৷ আমাদের সঙ্গে একটি ছেলে আছে যার ওজন এই বয়সেই নব্বই ছাড়িয়ে গেছে৷ বাবার বেশ বড়সড় ব্যবসা৷ পিৎজা বার্গার ছাড়া ভাত ডাল চচ্চড়ি ছেলের মুখে রোচে না৷ পিঠে এক বিশাল ব্যাগ৷ তাতে নাকি ওর সারাদিনের খাবার মজুত৷ কী করে যে ও আমাদের দলের সঙ্গে মিশে গেল সেটাই রহস্য৷ যাইহোক, আমরা সবাই স্টেশন থেকে নেমে ইতিউতি ঘুরপাক খাচ্ছি৷ নিউ ইয়ারের ছোঁওয়া ওখানেও কিছু কম নয়৷ দোকানগুলো খ্রিস্টমাস ট্রি, সান্তাক্লজ, চকোলেট আর রকমারি কেকের গন্ধে সেজে উঠেছে৷ ছেলে মেয়েরাও তাদের মনের মতো সঙ্গীর সঙ্গে ছোটখাট আউটিং-এ ব্যস্ত৷ স্টেশনের অনতিদূরে রিক্সা স্ট্যান্ড৷ কোনও জায়গা সম্পর্কে জানতে হলে রিক্সাওয়ালারা বড় ভরসা৷ স্টেশনের কাছাকাছি কী কী দেখার জিনিস আছে খোঁজ নিচ্ছি৷ এমন সময় ওই নাদুসনুদুস ছেলেটি রিক্সাওয়ালাদের জিজ্ঞেস করল, “আঙ্কল তোমরা নিউ ইয়ার সেলিব্রেট করছ না?” ওরা কী বুঝল কে জানে! একজন বললেন, “কাজে না বেরোলে বাড়িতে হাড়ি চড়বে না যে!” আরেকজন বললেন, “ কবে থেকে ছোট মেয়েটা একটা চকোলেটের বায়না করছে৷ গায়ে জ্বর নিয়েও বেরিয়েছি৷ যদি দুটো বেশি ভাড়া হয়! বছরকার দিনে মেয়েটার মুখে একটু হাসি দেখব৷” কেমন একটা মন খারাপ নিয়ে আমরা হাঁটতে থাকলাম৷ একটি ছেলে বলে উঠল, “ যারা এরকম দিন আনে দিন খায় তাদের কাছে বছরের সব কটা দিন একই রকম, তাই না?” সবাই চুপ৷ কী উত্তর দেব? হঠাৎ দেখি নাদুসনুদুস ছেলেটি রিক্সা স্ট্যান্ডের দিকে হাঁটতে আরম্ভ করেছে৷ আমরাও জানিনা কেন ওর পেছনে চলতে লাগলাম৷ কিছুটা কৌতূহল৷ তখনও ওই চার পাঁচজন রিক্সাওয়ালা স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে৷ দেখি ছেলেটি পিঠের ব্যাগ থেকে যত খাবার ছিল সব বের করে ওনাদের দিয়ে বলল, “আজ আমার হ্যাপি বার্থডে৷ ভেবেছিলাম এইগুলো বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে খাব৷ কিন্তু আমার যেসব ভাইবোনগুলো তোমাদের বাড়িতে আছে এগুলো যদি তারা খায় আমরা খুব খুশি হব৷” অদ্ভুত নীরবতা৷ ওর গলার স্বরে এমন আন্তরিকতা ছিল যে কেউ না করতে পারল না৷

আরও পড়ুন –প্রয়াত AAP নেত্রী মীরা সান্যাল, শোক জানালেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী

কে বলে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের অনুভূতি নেই?