বিরোধী-কপালে ভাঁজ বাড়ানোর বাজেট, কণাদ দাশগুপ্তর কলম

কণাদ দাশগুপ্ত

সরাসরি টাকা ছড়িয়েই ভোট কিনছেন তিনি, অথচ আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে। তাই এই অন্তর্বর্তী বাজেট দেখে
আঙ্গুল তোলাই যাচ্ছে না প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দিকে।

কি করলেন প্রধানমন্ত্রী ?

দরিদ্র কৃষকদের আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে ঘোষণা হয়েছে ‘প্রধানমন্ত্রী কিষান’ প্রকল্প । এই প্রকল্পে ছোট এবং মাঝারি কৃষকরা বছরে 6 হাজার টাকা করে পাবেন। সেটা পাবেন তিন দফায় 2 হাজার টাকা করে। সেই টাকা সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়বে।

এই পর্যন্ত পড়লে মনে হবে খুবই সাদামাটা এবং চালু এক ঘোষণা এটি।

আরও পড়ুন- রেলে বরাদ্দ বাড়াল মোদি সরকার

সূক্ষ্ম চালটা এর পরেই আছে। এখানেই বাজি মারতে পারেন মোদি। ‘প্রধানমন্ত্রী কিষান’ প্রকল্প’র ওই টাকা যাতে ভোটের আগেই কৃষকের অ্যাকাউন্টে ঢোকে তার জন্যও ব্যবস্থা করা হয়েছে। 2018 সালের 1 ডিসেম্বর থেকেই কার্যকর হচ্ছে ওই প্রকল্প। ফলে ভোটের ঠিক মুখে মুখে দেশের 12 কোটি কৃষকের অ্যাকাউন্টে ঢুকবে 2 হাজার টাকা। হাতে গরম 2 হাজার। এর পরে যদি 12 কোটি কৃষক এবং তাদের পরিবারের ভোট মোদির বাক্সে যায়, তাহলে সেটা ভোট কেনা-ই হয়। অথচ সবটাই বাজেটে ঘোষিত। নীতি এবং সংবিধান মেনেই যাচ্ছে এই টাকা। এটাই মোদির কুশলী চাল।

আরও আছে।

আরও পড়ুন-  এই বাজেট লোকসভা ভোটে প্রভাব ফেলবে, মনমোহন

মোদির পরের টার্গেট ছিল শ্রমিকরা। “প্রধানমন্ত্রী শ্রমিক বন্ধন প্রকল্প” এই প্রথম ঘোষণা করা হয়েছে।
মাসে 15 হাজার টাকা আয় করেন, এমন অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীরা অবসরের পরে মাসে 3 হাজার টাকা করে নিশ্চিত পেনশন পাবেন। এর জন্য মাসে মাসে দিতে হবে মাত্র 55 টাকা। এই সুযোগ পাবেন দেশের প্রায় 20 কোটি পরিবার। এই বিশালসংখ্যক ভোটও কার্যত কিনেই নিলেন মোদি। বাজেটকে ব্যবহার করে ভোটে লড়তে নামার চালু পদ্ধতিকে প্রায় শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেলেন নরেন্দ্র মোদি।

অন্তর্বর্তী বাজেট বলতে যা বোঝাতো এতদিন, সেই ছক ভেঙ্গে দিলেন নরেন্দ্র মোদি। অর্থমন্ত্রী পীযূষ গয়াল সংসদে যখন বাজেট পড়ছেন, তা দেখে বা শুনে বোঝার উপায় ছিলোনা এটি অন্তর্বর্তী বাজেট, বারবারই মনে হচ্ছিলো এ বুঝি পূর্ণাঙ্গ বাজেটই।

আরও পড়ুন- এটা মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া বাজেট, মন্তব্য মুখ্যমন্ত্রীর

বিরোধী রাজনৈতিক মহল আগেই ‘আশঙ্কা’-য় ছিলেন, ভোটের মুখের এই বাজেট থেকে কিছুটা সুবিধা আদায় করে নেবেন মোদি। বাজেট পেশের পর বোঝা গেলো, একটু নয় তথাকথিত অন্তর্বর্তী বাজেটকে একশো শতাংশ ভোটের বাজেট বা নির্বাচনী ইস্তাহার বানিয়ে ছেড়েছেন মোদি। সত্যি কথা বলতে কি, এই বাজেট একবারও বুঝতে দেয়নি, এটি ছিল মোদির মেয়াদকালের শেষ বাজেট বা শেষ অন্তর্বর্তী বাজেট। সাধারনত ভোটের পর নতুন সরকার গঠন হওয়া পর্যন্ত সরকার চালানোর খরচ চালানোর জন্যই সংসদে পেশ করা হয় “ভোট অন অ্যাকাউন্ট”। সেই ধারনাটাই ভেঙ্গে দিয়েছেন দেশের অন্যতম সেরা CA পীযূষ গয়াল। দেখা গিয়েছে, গয়াল বাজেটের এক এক পাতা পড়ছেন আর তোফা আনন্দে তখন টেবিল চাপড়াচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী।

আরও পড়ুন- বিশ্বরেকর্ড গড়লেন মিতালি রাজ

ভোটের মুখের বাজেটে কৃষকদের খুশি করেছেন মোদী। কৃষি ঋণ মকুব করার কংগ্রেসের পথে না হেঁটে অন্য রাস্তায় হাঁটলেন তিনি। দরিদ্র কৃষকদের আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে ঘোষণা হলো ‘প্রধানমন্ত্রী কিষান প্রকল্প’। 2 হেক্টর পর্যন্ত জমিতে চাষ করেন এমন ছোট এবং মাঝারি কৃষকরা বছর সরাসরি 6 হাজার টাকা করে পাবেন। সেটাও আবার তিন দফায় 2 হাজার টাকা করে সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়বে। আবার সেই টাকা যাতে ভোটের আগেই কৃষকের অ্যাকাউন্টে ঢোকে তার জন্যও ব্যবস্থা করা হয়েছে। 2018 সালের 1 ডিসেম্বর থেকেই কার্যকর হচ্ছে ওই প্রকল্প। ফলে ভোটের ঠিক মুখে মুখে দেশের 12 কোটি কৃষকের অ্যাকাউন্টে ঢুকবে 2 হাজার টাকা।

মোদির পরের টার্গেট ছিল শ্রমিকরা। তাদেরও খুশি করা হয়েছে। “প্রধানমন্ত্রী শ্রমিক বন্ধন প্রকল্পে” মাসিক 15 হাজার টাকা আয় করেন, এমন অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীদের অবসরের পরে মাসে 3 হাজার টাকা করে নিশ্চিত পেনশন পাবেন। এর জন্য মাসে মাসে দিতে হবে মাত্র 55 টাকা করে। শ্রমিকদের মৃত্যু হলে দ্বিগুণ পিএফ পাওয়া যাবে। গ্র্যাচুইটির সীমা 10 লক্ষ থেকে বাড়িয়ে করা হলো 30 লক্ষ টাকা।

আরও পড়ুন- কৃষকদের জন্য মাত্র 17 টাকা দৈনিক বরাদ্দ অপমানজনক, রাহুল

মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়কেও পকেটে ভরার ছক আছে এই অন্তর্বর্তী বাজেটের পিছনে। আয়কর ছাড়ে আনা হয়েছে বড় পরিবর্তন। উর্দ্ধসীমা সাড়ে 3 লাখ থেকে অনেকটা বাড়িয়ে করা হয়েছে 5 লাখ টাকা। একই সঙ্গে আছে আরও একাধিক সুবিধা যোগ করে সাড়ে 6 লাখ টাকা পর্যন্ত বার্ষিক রোজগারে এক পয়সাও আয়কর দিতে হবে না। কোটি কোটি ভোটার এই সুবিধা পেতে চলেছেন। ফলে মধ্যবিত্ত সমাজেও প্রভাব পড়বে বাজেটের। প্রবীণ নাগরিকরা এই প্রথম আয়করের আওতার বাইরে থাকছেন।

বাজেটের আগেই আর্থিকভাবে দুর্বল উচ্চবর্ণের জন্য 10% সংরক্ষণ করে মধ্যবিত্তের বড় অংশের মন জেতার চেষ্টা সেরে রেখেছেন মোদি। এবার ফাইনাল কোপটা দিলেন তিনি। মধ্যবিত্তকে আরও ‘লোভ’ তিনি দেখালেন। বাড়ি, ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে যাতে GST কমানোর জন্য সরকার GST কাউন্সিলকে অনুরোধ করেছে। মধ্যবিত্তের কথা তিনি কততো ভাবেন, নজিরবিহীনভাবে তাও বোঝালেন মোদি।

আরও পড়ুন- ক্যাব চালকের দাদাগিরি, 100 নম্বর ডায়াল করেও সাহায্য পেলেন না পর্বতারোহী

ভোটের মুখে উত্তরপ্রদেশে মায়াবতী-অখিলেশের জোট এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর রাজনীতিতে পা রাখার ঘটনাকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ করতে মোদি এবার টার্গেট করেছেন গোবলয়কে। তিন রাজ্যে সদ্য ভোটে হারতে হয়েছে বিজেপিকে। তাই ‘গোমাতা’-কে খুশি করাও চেষ্টাও আছে বিজেপির এই বাজেটে। মোদি এই অন্তর্বর্তী
বাজেটে ঘোষণা করা হয়েছে ‘‌রাষ্ট্রীয় গোকুল মিশন’‌। এই প্রকল্পে আগামী এক বছরের জন্য 750 কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে, মোদির এই ‘ম্যানিফেস্টো-বাজেট’ বিরোধীদের কপালে ভাঁজ বাড়াবেই।

আরও পড়ুন- অন্তর্বর্তী বাজেটের দিন সেনসেক্স বাড়ল 500 পয়েন্ট, নিফটিও চাঙ্গা

বুদ্ধিদীপ্ত এই বাজেটের সমালোচনা করা খুব কঠিন। তবে বলতেই পারে, ভোটমুখী এই বাজেটে আছে স্রেফ আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতি। কিন্তু ভালো করে যারা খুঁটিয়ে দেখবেন এই তথাকথিত অন্তর্বর্তী বাজেট, তাঁদের প্রভাবিত করা একটু কঠিনই হবে বিরোধীদের পক্ষে।