কমরেড কাঞ্চনের অকালমৃত্যু, কুণাল ঘোষের কলম

কুণাল ঘোষ

মাওবাদী বন্দি সুদীপ চোংদারের ( কাঞ্চন) মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপন করছি। যেভাবে মৃত্যু, তার প্রতিবাদ জানাচ্ছি। বন্দি অবস্থায় সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগের প্রহসনমুক্ত তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।

মতাদর্শগতভাবে এক না হলেও আমি বন্দি থাকাকালীন স্রেফ মানুষ হিসেবে সুসসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল মাওবাদী এই বিশিষ্ট নেতার সঙ্গে। দমদম জেলে আমার সেল ছিল 3/2, উনি 3/5। অর্থাৎ একটা পরেই। আগে ওঁর কথা বহু শুনেছি। আলাপ কারাজীবনে। দিনভর আড্ডা। ওঁদের জীবন সম্পর্কে কত অজানা কথা। যেদিন সারদায় সিবিআই তদন্তের রায় হয়, ওঁর ঘরে বসে রেডিওতেই শুনছিলাম। সেটা কাগজেও বেরোয়। সন্ধেয় লক আপের পর সুদীপদা খবরের সময় রেডিও বাড়িয়ে রাখতেন, যাতে আমি শুনতে পাই। মন অস্থির থাকলে শান্ত করতেন। দারুণ আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। সুন্দর কথা বলেন। সংগঠন বোঝেন। রসিক। ক্যারাম খেলায় দক্ষ। আমার বন্দিজীবনের প্রথম জেল যে খানিকটা মানিয়ে নিতে শুরু করেছিলাম কয়েকজনের জন্য, তার মধ্যে সুদীপদা একজন। দীর্ঘ বন্দিজীবনে অনেক মাওবাদী মূলস্রোতে ফেরার পক্ষে চলে এলেও সুদীপদার চোখে আগুণটা থাকতই। সকাল, দুপুর, বিকেল আমরা গল্প করেছি। আর থাকত ধৃতিরঞ্জন। সুদীপদা খুব ভালোবাসতেন ওকে।
সুদীপদার রাজনীতির ঠিকভুল বিচার এখানে নয়। কিন্তু নানা ঘটনায় বুঝেছি কেন তাঁরা গ্রামবাসীদের মন জয় করতেন। ভালো লাগার মত চরিত্র। আমাকে দুনিয়ার জায়গায় ঘোরানো হত। এই থানা, ওই থানা থেকে ফেরার পর সুদীপদার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললে মনটা হাল্কা হত। কোর্টে আমার লড়াই, চক্রান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, উৎসাহ দিতেন আবার আবেগ নিয়ন্ত্রণের কথাও বলতেন। এটা জেলকর্তারাও জানতেন আমাকে পাওয়া যাবে সুদীপদার সেলে। কোন কাগজের কোন খবরটা আমার পড়া উচিত বা কাজে লাগবে, এনে পড়াতেন তিনি। শরীর খারাপ হলে মেটকে বলে ওষুধের ব্যবস্থাও করে দিতেন। সকালে হাঁটতেন উঠোনে, নিজে হাতে দালান সাফাই, তারপর দরকারে উঠোনের নর্দমা পরিষ্কারও। পরক্ষণেই টাইমস অফ ইন্ডিয়া পড়ছেন। কিংবা কোনো ঘটনার অসাধারণ বিশ্লেষণ। জঙ্গলমহলের বহু পর্ব ওঁর কাছ থেকে শুনে সমৃদ্ধ হয়েছি। সংগঠনে অতি গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন সুদীপদা।

ঘটনাচক্রে সম্ভবত 16 জুন 2014, যেদিন আমি দমদম জেল ছাড়ছি, তারপর থেকে মূলত প্রেসিডেন্সি ; সেদিনই সকালে সুদীপদা আর ধৃতির জেল ট্রান্সফার। মেদিনীপুর। টানা ছমাস কাছাকাছি কাটিয়ে সেদিন আলাদা। ততদিনে জেলকর্তা, পুলিশ, বন্দি সবাই জানেন আমাদের সুসম্পর্ক।

এর অনেক পর একদিন প্রেসিডেন্সি থেকে ব্যাঙ্কশাল কোর্ট এসেছি। আমাকে একটি ঘরে রাখা হয়েছে। শুনলাম মেদিনীপুর জেল থেকে সুদীপ চোংদারকে আনা হয়েছে। কোর্ট আছে। অন্য ঘরে রাখা। দেখা করা অসম্ভব। দুজনেরই আলাদা বিরাট পাহারা আর নজরদারি। তখন আমি নিয়মিত কোর্টে গোলমাল করে পুলিশের মাথাব্যথা। দুই কর্তা এলেন। নিয়মমাফিক অনুরোধ, আজ যেন বেরোনর সময় কিছু না পাকাই। আমি বললাম করবই। প্রতিবাদ জানাবো তদন্তের। পুলিশ কর্তারা আমাকে বিরত করতে লাগলেন। শেষে বললাম, ঠিক আছে, একটা শর্ত। সুদীপ চোংদারকে এনে আমার সঙ্গে গল্প করতে দিতে হবে। তাহলে আজ শান্ত থাকব। প্রথমে তাঁরা বললেন অসম্ভব। একে আমি। তার উপর উনি মাওবাদী। আমি বললাম, বেশ। তাহলে বিকেলে যা তা চেঁচাবো। শেষে পুলিশ রাজি হল। সুদীপদাকে নিয়ে এলো। যে ঘরটিতে আমাকে বসিয়েছিল, সেখানে বসে দুজনে বহুদিন পর কত গল্প করলাম। তারপর আবার ওঁর জেলবদলের কথা কানে এসেছে।

মানুষটাকে খুব ভালো লেগে গেছিল। নেতৃত্বের সহজাত গুণসম্বলিত মানুষ। মূলস্রোতের দলেও সম্পদ হতে পারতেন।

অভিযোগ শুনেছি সুদীপদার সঠিক চিকিৎসা হয় নি। দীর্ঘকাল বন্দি। বিচার চলছিল। শেষে বাইরের হাসপাতালে যখন পাঠালো কর্তৃপক্ষ, তখন অনেক দেরি। সুদীপদা মারা গেলেন। বয়স কত হবে? 53/54। হত্যার রাজনীতি থেকে সরিয়ে এঁদের সমাজগঠনে কাজে লাগালে কত উপকার হতে পারত। আমরা ভাবিই না।

আমার খুব খারাপ লাগছে। কষ্ট হচ্ছে। সুদীপদা, আপনাকে মিস করছি। আমি তো কমিউনিস্ট নই। তবু এরকম মানুষের জন্য বলতে ইচ্ছে করছে, কমরেড সুদীপ চোংদার অমর রহে। এই বন্দিমৃত্যুর যথাযথ তদন্ত চাই।

সুদীপ চোংদার যে স্তরের সংগঠক, মৃত্যুর পরের যোগ্য সম্মানটাও বড় করে পাওয়া উচিত। কিন্তু, সত্যিই সর্বহারা এক বিপ্লবী নেতা বন্দিদশায় মারা গেলে রাষ্ট্র তাঁকে উপেক্ষা ছাড়া আর কী দিতে পারে? সুদীপদার দরদী কিছু সহকর্মী নিশ্চয় কিছু ব্যবস্থা করবেন। জানতে পারলে একবারটি যাওয়ার ইচ্ছে থাকল।

সুদীপ চোংদার, আপনাকে ভুলব না।