রবিবারের বাবুইবাসা : 10.02.19

মগধরাজের গৃহদেবী

সুনন্দ সান্যাল

কাশীর রাজা ছিলেন মহারাজা চেত সিংহ। তাঁর প্রাসাদের সৌন্দর্য ও ধন-সম্পত্তির প্রাচুর্য্য ইংরেজদের ঈর্ষান্বিত করে তুলেছিল সে কথা বলাই বাহুল্য। উইলিয়াম কেন্টফিল্ট ও রবার্ট ব্রুটিনো দুই বৃটিশ দূত চেত সিংহের দূত দুর্জয়প্রসাদের সংস্পর্শে আসেন, এবং ধনসম্পত্তি সম্বন্ধে বিস্তারিত তথ্য নিয়ে বৃটিশ শাসনকর্তা ওয়ারেন হেস্টিংসকে দেন।

ওয়ারেন হেস্টিংস তার চরিত্র অনুযায়ী চেত সিংহের প্রাসাদ ও ধন সম্পত্তি লুঠ করেন। কিন্তু ধন সম্পত্তির থেকেও বৃটিশদের নজর কাড়ে এক কালী মূর্তি। মূর্তিটির উজ্জ্বলতা মুগ্ধ করে সবাইকে, মায়ের মুখে এক অদ্ভুত আকর্ষণীয়তা, দীপ্তি, মায়ের সম্পূর্ণ শরীরটি সাপের দ্বারা আবৃত, মায়ের দুই হাত, এক হাতে মা খড়্গহস্ত, অপর হাতে রক্তবাটি, গলায় নরমুন্ডমালা। পায়ে আলতামাখা, মূর্তিটিতে কোন শিবের স্হান নেই। এই মূর্তিটি বংশ পরম্পরায় পূজিত হয়েছিলো চেত সিংহের প্রাসাদে, পুরাণ অনুযায়ী এই মূর্তিটি মগধরাজ জরাসন্ধের আরাধিতা গৃহদেবী। ওয়ারেন হেস্টিংস মনস্হির করেন এই মূর্তিটি বিলেতের সংগ্রহশালায় রেখে দেবেন এবং তাঁর বন্ধু পিটার উইলিয়ামসের সৃষ্টি মূর্তি বলে চিহ্নিত করবেন।

চেত সিংহের ধনসম্পত্তি ও প্রাসাদ লুঠ হওয়ার খবর আসে বাংলার দেওয়ান মহারাজা নন্দকুমারের কানে, সাথে এই খবরও আসে গঙ্গাপথে কাশী থেকে কোলকাতা ফিরছেন ওয়ারেন হেস্টিংস ও দল। বন্ধু সুদর্শনের মুখে চেত সিংহের কালী মূর্তিটির কথা শুনেছিলো নন্দকুমার। কালীভক্ত নন্দকুমার মনস্হির করেন জলপথেই ছদ্মবেশে ওই মা কালীর মূর্তি উদ্ধার করে নিজের গৃহদেবতারূপে আরাধনা করবেন।

মহারাজা নন্দকুমারকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন বীরভূমের বিখ্যাত হারিণ ডাকাত ও তার দল। কোলকাতায় ঢোকার মুখে ছদ্মবেশে নন্দকুমার ও হারিণ ডাকাতের দল আক্রমণ করে ওয়ারেন হেস্টিংস ও তার দলকে। দীর্ঘ জলযাত্রায় ক্লান্ত ব্রিটিশরা আত্মসমর্পন করে, 2 জন ব্রিটিশের প্রাণ যায়। নন্দকুমার ও হারিণ ডাকাত শুধুমাত্র ওই কালী মূর্তি নিয়ে পালিয়ে যায়।

পুরো ঘটনায় ওয়ারেন হেস্টিংস আশ্চর্য হয়ে যান, এতো ধন সম্পত্তি লুঠ না করে শুধুমাত্র মূর্তিটি নিয়ে যাওয়ার কারণ খুঁজে না পেয়ে প্রচন্ড উগ্রমেজাজী হয়ে পড়েন। কোলকাতায় ফিরে গুপ্তচর নিয়োগ করেন, যে করেই হোক ওই কালী মূর্তি পেতেই হবে এবং বিলেতের সংগ্রহশালায় নিয়ে যেতে হবেই সেই মূর্তি।

নন্দকুমারের কূলপুরোহিত সেই মূর্তি দর্শন করে বলেন এই মূর্তি পুজো কোনও গৃহে রেখে সম্ভব নয়, পরিবারে থেকে এই কালী মায়ের পুজো সম্ভব নয়, এই মূর্তির স্হান শ্মশানে। এই মূর্তি পুজো তান্ত্রিক ছাড়া সম্ভব নয়। নন্দকুমার কূলপুরোহিতের কথা শুনে সিদ্ধান্ত নেন মন্দির নির্মাণের, হারিণ ডাকাতের সহযোগিতায় ব্রাক্ষ্মণী নদীর তীরে মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করেন। মন্দিরের নকশা নন্দকুমার নিজেই অঙ্কন করেন, অপূর্বশৈলীর অষ্টকোণাকৃতি মন্দির নির্মাণ করেন যা ভূ ভারতে বিরল। কিন্তু নির্মাণের কিছুদিনের মধ্যেই দুবার বাজ পড়ে মন্দিরটির ঈশানকোণ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবুও ওই ক্ষতিগ্রস্ত মন্দিরেই 11 মাঘ 1178 শকাব্দতে মহাসমারোহে মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করেন নন্দকুমার স্বয়ং। রামপুরহাট থেকে 25 কিলোমিটার ও নলহাটি থেকে 6 কিলোমিটার দূরে ভদ্রপুরে দেবী গুহ্যকালিকার মন্দির।

দক্ষতার সাথে কাজের জন্য মহারাজা নন্দকুমার ব্রিটিশ সরকারের খুব প্রিয় পাত্র হয়ে ওঠেন, এবং ওয়ারেন হেস্টিংসের আর্থিক দুর্নীতি, লুঠতরাজ, চরিত্রহীন আচরণ সব খবর ব্রিটিশ সরকারের কাছে পাঠাতে থাকেন। ব্রিটিশ সরকার ওয়ারেন হেস্টিংসের ক্ষমতা সীমিত করে দেন এবং বীরভূম, বর্ধমান, নদীয়া ও হুগলির একচ্ছত্র দায়িত্বভার নন্দকুমারের হাতে তুলে দেন। ওয়ারেন হেস্টিংস গুপ্তচর মারফত খবর পান, সেই মূর্তি এখন নন্দকুমারের অধীনে।

ওয়ারেন হেস্টিংস বিপুল অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে 4বার চিঠি লেখেন নন্দকুমারকে ও অনুরোধ করেন যেন দয়া করে মূর্তিটি তাকে ফেরত দেওয়া হয় তাহলে এই মূর্তিটি বিলেতের সংগ্রহশালায় স্হান পাবে।

নন্দকুমার ওইসব চিঠির কোনও উত্তর না জানিয়ে উল্টে ব্রিটিশ সরকারকে চিঠি দিয়ে জানান যে ওয়ারেন হেস্টিংসের কার্যকলাপ মোটেই সুবিধার নয়।

নন্দকুমারের এইরূপ আচরনে ওয়ারেন হেস্টিংস রেগে যান, এবং পরামর্শ নেওয়ার জন্য কোলকাতা সুপ্রীমকোর্টের ও ভারতের প্রথম বিচারপতি তথা বাল্যবন্ধু এলিজা ইম্পের দারস্হ হন। এলিজা ইম্পে বুদ্ধি দেন, কোনও জালিয়াতির মামলায় নন্দকুমারকে জড়িয়ে ফেলতে পারলে ফাঁসি অবধারিত কারণ ব্রিটিশ পার্লামেন্ট আইন 1728 অনুযায়ী জালিয়াতির শাস্তি ফাঁসি। সেই মতো ওয়ারেন হেস্টিংস বীরভূমের এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি বিশ্বনাথের সাহায্যে নন্দকুমারকে মিথ্যে জালিয়াতি মামলায় অভিযুক্ত করে এবং একটিও অভিযোগ প্রমাণ না করতে পারা সত্ত্বেও এলিজা ইম্পে ফাঁসির রায় দেন। আজও ব্রিটিশ আইনশাস্ত্রে এই ঘটনা “আইনি হত্যা” বা Judicial Murder এর বড়ো উদাহরণ হয়ে আছে। রায় অনুযায়ী, বর্তমান বিদ্যাসাগর সেতুর নিকট 5 আগস্ট 1775 এ ফাঁসি হয় নন্দকুমারের।

নন্দকুমারের মৃত্যুর পর মন্দিরটির রক্ষণাবেক্ষন ও দৈনন্দিন পুজো বন্ধ হয়ে যায়। ওয়ারেন হেস্টিংসের পাঠানো একটি দল মন্দিরে গিয়ে দেখে সেই মূর্তিটি নেই, সেখানে অবিকল ওইরূপ একটি মাটির মূর্তি অবস্হান করছে। নন্দকুমারের পূর্বনির্দেশ অনুযায়ী মূর্তিটি হারিণ ডাকাত নিয়ে যায় এবং একটি অবিকল প্রতিরূপ মাটির মূর্তি তৈরি করে রেখে যায় মন্দিরে। দিনে দিনে কালের নিয়মে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে মন্দিরটি।

20 জানুয়ারি 2004 এ ভদ্রপুরের মাননীয়া মধুমিতা মুখোপাধ্যায়ের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ও পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মন্ত্রী কিরণময় নন্দের সাহায্যে এবং মহারাজা নন্দকুমারের উত্তরাধিকারী গৌরীশঙ্কর রায়ের অনুমতি ও সম্মতিতে মন্দিরের অসমাপ্ত কাজ সম্পূর্ণ করা হয়।

#################################

কবিতা 1

দেবস্মিতা হালদার

নের মাধুরিমায় তোমারে রেখেছি যত্নে
মনের নীরবতা তোমার কাছে গিয়ে থমকে
দাড়ায়
মনের মাধুরিমায় মিশে আছো তুমি
আমি তোমারে ভালোবাসি
সেইস্বপ্নে তুমি আমার হৃদয়মাঝে ভেসে আসো
দু চোখ ভরে তোমায় য়ত দেখি
মোর অন্তর আত্মা সব টুকু দিযে
নীরবে মেখেছি
মোর সব কিছু দিয়ে তোমায় আমি চেয়েছি

############################

কবিতা 2

 অনুভব পাল

 কি করে বলব বল? কবে
ছেড়ে যাবি চলে
এ খাঁচা হতে লক্ষ যোজন দূরত্ব
হৃদয় মাঝে থাকবে না কেউ
দেবে না কেউ স্বত্বে
ভালোবাসা
– এ যেন মায়ার চোরাবালি
যে ক্ষুদার্ত আজ গ্রাস
কবে তার মানুসী কে
বেঁধে দেয় অটোট বাঁধন
তা কলজের অবোধ লজ্ঞে
মনে করি – এক্ষুদার্ত কেবলেই
গ্রাস করছে আমাকে, হৃদমাঝে
তুমি কি লিখেছ?
অন্ধ হয়ে জড়িয়ে ধরেছি
শুধু তোমাকে।।

###########################