এই দুই কেন্দ্র থেকেই লোকসভা ভোটের সূচনা হচ্ছে রাজ্যে

কণাদ দাশগুপ্ত

পশ্চিমবঙ্গে ভোট শুরু আজ থেকে ঠিক এক মাস পর, 11 এপ্রিল থেকে। ওইদিন এ রাজ্যে সাত দফা ভোটের প্রথম দফায় ভোটগ্রহণ করা হবে উত্তরবঙ্গের দুই কেন্দ্র, কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ার-এ। এই দু’টি আসনই বর্তমানে তৃণমূলের দখলে। আবার বিজেপি এবার এ রাজ্যে জয়ী হওয়ার দাবি যে ক’টি আসনে করছে, তার ওপরের দিকেই আছে কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ার। সুতরাং ধরেই নেওয়া যায়, তৃণমূল বা বিজেপি, কারো পক্ষেই খুব সহজ হবে না এই দুই আসন দখল নেওয়া। একবার দেখা যাক, এই মুহূর্তে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে আছে এই দুই কেন্দ্র, যে কেন্দ্র দু’টি থেকেই এ রাজ্যে লোকসভা ভোটের সূচনা হচ্ছে।

আরও পড়ুন –মঙ্গলের বৈঠকেই সিলমোহর লাগবে তৃণমূল প্রার্থীতালিকায়

তৃণমূল, বিজেপি বা কোনও দলই এখনও এই দুই কেন্দ্রে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। এবারের ভোটে রাজ্যে নিশ্চিতভাবেই প্রধান দুই পক্ষ, তৃণমূল এবং বিজেপি। তৃণমূলের হাতে দুই বিদায়ী সাংসদ থাকলেও বিজেপিকে বাছতে হবে সম্ভাবনাপূর্ণ প্রার্থী। রাজনৈতিক মহলের ধারনা, এই দুই কেন্দ্রেই সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বিজেপি।

কোচবিহার

এই কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনেই এ রাজ্যে প্রথমবার বিজেপি বুঝিয়েছিলো যে তারাই তৃণমূলের প্রধান প্রতিপক্ষ হতে চলেছে। 2016 সালের উপনির্বাচনে গেরুয়া- শিবির যে বার্তা দিয়েছে, 2019-এর লোকসভা ভোটেও তা বহাল আছে।

মাথাভাঙা (SC), কোচবিহার উত্তর, কোচবিহার দক্ষিণ, শীতলকুচি (SC), সিতাই (SC),দিনহাটা এবং নাটাবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্র নিয়ে গঠিত কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্র।

আরও পড়ুন –জেলায় প্রতিদিন দুটি করে জনসভা করবে তৃণমূল

2014 সালের লোকসভা নির্বাচনে কোচবিহার আসন থেকে বিজয়ী হয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের রেণুকা সিনহা। সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হওয়ায় সেই আসনে উপ-নির্বাচন হয়েছিল। 2014 সালে রেণুকাদেবী 87 হাজার ভোটে বাম প্রার্থী দীপক রায়কে পরাজিত করেছিলেন।
2016-সালের উপ নির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থী হন পার্থ প্রতিম রায়। উপ-নির্বাচনে রেকর্ড গড়ে জয়ী হন তৃণমূল প্রার্থী পার্থপ্রতিম রায়। থিনি তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির হেমচন্দ্র বর্মনকে পরাজিত করেন 4 লক্ষ 13 হাজার 241 ভোটে। বিপুল ভোটে হারলেও এই কেন্দ্রে ওই উপনির্বাচনেই উত্থান হয় বিজেপির। ফরওয়ার্ড ব্লক প্রার্থী নৃপেন্দ্রনাথ রায় নেমে যান তৃতীয় স্থানে। কংগ্রেসের দশা আরও করুন হয় কোচবিহারে। তৃণমূলের বিজয়রথ আটকে দিতে পারে বিজেপি, এমন একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল ওই উপনির্বাচনে। সেই থেকেই জেলায় নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান মজবুত করার চেষ্টা চালাচ্ছে বিজেপি। উপনির্বাচনের ফলাফলেও তা প্রকাশ পায়। ভোটপ্রাপ্তিতে তৃণমূল ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায় ঠিকই, কিন্তু এই কেন্দ্রে বিজেপি দ্বিতীয় হয় সে বার, এবং এবার তো প্রথম হওয়ার প্রবল দাবিদার বিজেপি।

আরও পড়ুন –ভোট অবাধ করতে নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত

2016 সালে কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী পার্থপ্রতিম রায় ভোট পেয়েছিলেন 7 লক্ষ 93 হাজার 374 ভোট। বিজেপি প্রার্থী হেমচন্দ্র বর্মন ভোট পান 3 লক্ষ 81 হাজার 113 ভোট। 2014 সালে বামফ্রন্ট প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট 4 লক্ষ 89 হাজার 392 থেকে কমে 2016-র উপনির্বাচনে দাঁড়ায় 87 হাজার 363-তে। 2014 সালের লোকসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে তৃণমূলের রেণুকা সিংহ পেয়েছিলেন 5 লক্ষ 26 হাজার 499 ভোট। আর বিজেপি হেমচন্দ্র বর্মন পেয়েছিলেন 2 লক্ষ 17 হাজার 653 ভোট। তৃণমূলের 2 লক্ষ 70 হাজার ভোট বাড়ে উপনির্বাচনে, তেমনই বিজেপিও পাল্লা দিয়ে ভোট বাড়ায় 1 লক্ষ 64 হাজার। বিজেপি-র এই ভোট বৃদ্ধি সেদিন থেকেই তৃণমূলের মাথাবাথ্যার কারণ হয়েছে।

আরও পড়ুন –সাত দফা ভোটে “চাপ” কীসের?

এখনও কোনও দলই প্রার্থী ঘোষনা করেনি। কোচবিহারের তৃণমূল সাংসদ পার্থপ্রতিম রায়ের নামে জল্পনা ছিলো, গোষ্ঠীকোন্দলের জেরে তিনি দল ছাড়ছেন। বিজেপি’র সঙ্গেও তাঁর নাকি ‘কথা’ হয়েছে। এ সব নেহাতই জল্পনা।বঙ্গ- বিজেপির এক নেতার শিবির থেকে এসব কথা ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সূত্রের খবর, এবারও তৃণমূলের প্রার্থী পার্থপ্রতিম রায়-ই। কোচবিহার জেলার মতো তৃণমূলের গোষ্ঠীকোন্দল সম্ভবত অন্য কোনও জেলায় নেই। ‘মাদার’ তৃণমূল বনাম যুব তৃণমূলের লড়াইয়ের কথা সর্বজনবিদিত। এই গোষ্ঠীকোন্দলের জেরেই কোচবিহারের এক সময়ের দাপুটে যুব তৃনমূল নেতা নিশীথ প্রামানিক বা বিট্টু-কে দল থেকে বহিষ্কার করেছেন জেলা যুব তৃণমূল সভাপতি সাংসদ পার্থপ্রতিম রায়। ঘটনাচক্রে ওই নিশীথ প্রামানিক সম্প্রতি বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। জেলায় নিশীথের প্রভাবের কথা শত্রুপক্ষও স্বীকার করে। এখন বিজেপি যদি জনপ্রিয় নিশীথ প্রামানিককেই কোচবিহার কেন্দ্রে দলীয় প্রার্থী করে, তাহলে লড়াই তীব্র হবেই। তৃণমূলের গোষ্ঠীকোন্দলের ফায়দাও তুলবেন নিশীথ। কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রে এবারও যে তৃণমূলের প্রবল প্রতিপক্ষ হতে চলেছে বিজেপিই, তাতে কোনও সন্দেহই নেই। বিজেপি এবার এ রাজ্যে যে যে আসন পাওয়ার আশা করছে, সেই তালিকায় ওপরের দিকেই রেখেছে কোচবিহারকে।

আলিপুরদুয়ার

তুফানগঞ্জ, কুমারগ্রাম (ST),কালচিনি (ST), আলিপুরদুয়ার, ফালাকাটা (SC), মাদারিহাট (ST) নাগরাকাটা (ST) বিধানসভা কেন্দ্র নিয়ে গঠিত আলিপুরদুয়ার লোকসভা কেন্দ্রটি। বিজেপি ইদানিং এই কেন্দ্রে যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করেছে। এই লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত মাদারিহাট কেন্দ্রের বিধায়ক বিজেপির মনোজ টিগ্গা। 2016 সালে টিগ্গা নিকটতম তৃণমূল প্রার্থীকে প্রায় 22 হাজার ভোটে হারিয়েছেন। 2014-র লোকসভা নির্বাচনে আলিপুরদুয়ার আসন থেকে বিজয়ী হয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী দশরথ তিরকে। তিনি ভোটের কিছুদিন আগে ফরওয়ার্ড ব্লক ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েই প্রার্থী হয়েছিলেন। দশরথ তিরকে হারিয়েছিলেন ফরওয়ার্ড ব্লক প্রার্থী মনোহর তিরকেকে।
দশরথ তিরকে পেয়েছিলেন 3,62,453 ভোট।আরএসপি’র মনোহর তিরকে পেয়েছিলেন 3,41,056 ভোট। এই কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী বীরেন্দ্র বরা ওঁরাও পেয়েছিলেন 3, 35, 857টি ভোট। 2014 সালেই এই কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী পেয়েছিলেন তিন লক্ষের বেশি ভোট। তৃতীয় হলেও বিজয়ী প্রার্থীর সঙ্গে তাঁর প্রাপ্ত ভোটের ফারাক ছিলো 27 হাজার ভোটের। 2014-র পর এই কেন্দ্রে বিজেপির শক্তি অনেকটাই বেড়েছে। সুতরাং আলিপুরদুয়ার আসন ধরে রাখতে যথেষ্টই পরিশ্রম করতে হবে তৃণমূলকে। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে এই কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী বাছাইয়ের ওপর।জেলা বিজেপির একাংশ এখানে প্রার্থী হিসাবে চাইছেন, মাদারিহাটের বিধায়ক মনোজ টিগ্গাকেই। বিজেপি এবার আলিপুরদুয়ার লোকসভা কেন্দ্রটিকে জেতার তালিকার ওপরের দিকেই রেখেছে।

আরও পড়ুন –বাংলায় 7 দফায় ভোট, চাঞ্চল্য রাজ্যজুড়ে