তাঁকে ‘আণ্ডার-এস্টিমেট’ করার বদলা নিলেন অর্জুন সিং

চাণক্য চৌধুরি

তাহলে এরই নাম রাজনীতি ?

বিজেপিতে যোগ দিয়ে অর্জুন সিং বলেছেন, “মুকুলদা কৃষ্ণ আর আমি অর্জুন”।

অথচ এই সেদিনও দু’জনের সম্পর্ক ছিলো সাপে-নেউলের থেকেও ভয়ঙ্কর। আজ সেই মুকুল রায়ের হাত ধরেই বিজেপিতে পা রাখলেন তৃণমূলের হেভিওয়েট অর্জুন সিং। মুকুল রায় বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর এই অর্জুন সিং-ই বারাকপুর শিল্পাঞ্চলে দলের কাণ্ডারী হয়ে ওঠেন। নোয়াপাড়ার উপনির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী হিসাবে মঞ্জু বসুকে চূড়ান্ত করার পর মুকুল রায়কে ঘোল খাইয়ে ছাড়েন অর্জুন সিং। সেই মুকুল রায়ই আজ ‘মর্যাদা’ দিলেন অর্জুন সিংকে।

দলত্যাগ করা, অন্য দলে যোগ দেওয়া রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। তৃণমূল ছেড়েও অনেকে অন্য দলে গিয়েছেন। কিন্তু ভোটের মুখে অর্জুন সিংয়ের দলত্যাগ, তৃণমূলের পক্ষে একটু ভারি-ই বোধহয় হতে চলেছে।

আরও পড়ুন –বাবার হাত ধরে এবার কি বিজেপিতে শুভ্রাংশু? যা বললেন মুকুল পুত্র

কেন অর্জুন সিং তৃণমূল ছাড়লেন ?
যে মুহূর্তে তৃণমূলের অন্দরে লোকসভা ভোটের হাওয়া উঠেছে, সেদিন থেকেই অর্জুন সিং স্পষ্ট করেছিলেন তিনি ঠিক কী চাইছেন। তাঁর ‘ওয়ান-পয়েন্ট অ্যাজেণ্ডা বারাকপুর লোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূল সাংসদ দীনেশ ত্রিবেদীকে সরাতে হবে। আর টিকিট দেওয়া যাবেনা। কেন সরাতে হবে দীনেশ ত্রিবেদীকে ? অর্জুন সিং-এর যুক্তি,
এই সাংসদকে এলাকায় দেখাই যায় না। তিনি শুধু আসেন ভোটের আগে। অথচ এলাকার মানুষ দরকারে সাংসদকে খোঁজেন, পাননা। সেই ফাঁক পূরণ করতে হয় অর্জুন সিং-কে। মানুষের প্রয়োজনে সব সময় হাজির অর্জুন সিং।

আরও পড়ুন –উত্তর 24 পরগনার পাঁচ কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী চূড়ান্ত, বারাকপুরে অর্জুন,বসিরহাটে কাশেম

কিন্তু এসব তো আর চিরস্থায়ী ফরমুলা হতে পারেনা। তাই এবার বারাকপুরের মানুষের দাবি ছিলো, অর্জুন সিংকেই যেন টিকিট দেওয়া হয়। প্রথমদিকে খবর ছিল বারাকপুরে অর্জুন সিং-ই টিকিট পাচ্ছেন। বিকল্প হিসাবে দীনেশ ত্রিবেদীকে যাদবপুরে টিকিট দেওয়া হতে পারে। সেটা না হলে আগামী বছর তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠানো যেতে পারে। তৃণমূলের অভ্যন্তরে প্রথমে এমনটাই সিদ্ধান্ত ছিলো। কিন্তু দল পরবর্তী সময়ে আশঙ্কা করে দিল্লিতে সব দলের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা দীনেশ ত্রিবেদীকে এভাবে সরানো হলে, তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে অন্য দলে, এমনকী বিজেপিতেও চলে যেতে পারেন। বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে দীনেশবাবুর সম্পর্ক অসম্ভব ভালো, তাই তিনি তৃণমূলের টিকিট না পেলেই নাকি, বিজেপি তাঁকে দলে নিয়ে নেবে। তাই এই ঝুঁকি নেওয়ার থেকে অনেক সহজ অর্জুন সিং-কে ‘ম্যানেজ’ করা। ফলে দীনেশ ত্রিবেদীকে ফের টিকিট দেওয়াই চূড়ান্ত হয়। সপ্তাহ তিনেক আগেই নাকি দলে সিদ্ধান্ত হয় অর্জুন সিং নয়, এবারও বারাকপুরে টিকিট পাবেন দীনেশ ত্রিবেদীই। এই খবর অর্জুন সিংয়ের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় জেলা তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমে। দলের এই সিদ্ধান্ত তিন সপ্তাহ আগেই মেনে নিতে পারেননি অর্জুন সিং। আর তখন থেকেই তাঁর বিজেপি যোগের জল্পনা পল্লবিত হতে থাকে। সেই খবরও পৌঁছে যায়, দলের শীর্ষতম স্তরে। প্রথমে অন্যান্য নেতার মাধ্যমে অর্জুনকে প্রথমে বোঝানোর চেষ্টা হয়, পরের দিকে তাঁকে সতর্কও করা হয়। তবুও নিয়ন্ত্রণে আনা যায়না ‘বাগী’ বিধায়ককে।

আরও পড়ুন –রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী আসছে শুক্রবার, রুটমার্চও শুরু কাল থেকেই

ওদিকে ‘ওত’ পেতে ছিলো বিজেপি। সব ভুলে ওই মুকুল রায়ই যোগাযোগ শুরু করেন অর্জুনের সঙ্গে। কথাবার্তা এগোতে থাকে। এই খবর পেয়ে স্বয়ং দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নবান্নে ডেকে পাঠান অর্জুন সিংকে, একই সঙ্গে ডাক পরে দীনেশ ত্রিবেদীরও। স্বল্প সময় কথা হয়। সূত্রের খবর, তৃণমূল নেত্রী নাকি সেই সময় অর্জুন সিংকে জানান, যে লোকসভার প্রার্থী হিসাবে দীনেশ ত্রিবেদীকে মেনে নিক অর্জুন সিং, পরিবর্তে ভোট মিটে গেলে অর্জুন সিং পাবেন রাজ্যের মন্ত্রিত্ব। এই কথাটাও ছড়িয়ে যায়। সত্যিই এমন প্রস্তাব মুখ্যমন্ত্রী দিয়েছিলেন কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু অর্জুন সিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলা বিজেপি অর্জুনকে বোঝায়, নির্বাচন মিটে গেলে কী হবে তা অনিশ্চিত। এই ‘সমস্যা’ তো অনেকদিনের, দল এতদিন সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেয়নি কেন? তখনই অর্জুন সিং মনস্থির করে ফেলেন দল ছেড়ে গেরুয়া শিবিরে যাবেন। কিন্তু, তাঁর কার্যবিধি কার্যত ‘নজরবন্দি’ হয়ে যায়। সেই সরকারি ‘ব্যস্ততা’-কে বোকা বানাতে যেটুকু সময় লেগেছে, সেটা
কাটতে যে ক’দিন সময় লাগল, তারপরেই শেষপর্যন্ত গেরুয়া শিবিরে অর্জুন সিং।

আরও পড়ুন –কোন্দল তুঙ্গে, বালুরঘাটে প্রার্থী বদলের দাবি জেলা তৃণমূল সভাপতিরই

অর্জুন সিংয়ের প্রয়োজনীয়তা যে তৃণমূলে ছিলো, তা বোঝা গিয়েছিলো তখনই, যখন তাঁকে দলে রাখার চেষ্টা করেছিলেন স্বয়ং তৃণমূল নেত্রী। নাহলে তাঁকে আটকানোর মরিয়া চেষ্টা করেছিলেন কেন? অথচ, নেত্রীও তাঁকে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। আসলে দল বোধহয় কিছুটা ‘আণ্ডার-এস্টিমেট’ করেছিলো অর্জুনকে। সেটাই ফিরিয়ে দিলেন অর্জুন।
অর্জুন সিং-এর বিজেপিতে যাওয়ার প্রতিক্রিয়া যে শুধুই বারাকপুর লোকসভা কেন্দ্রের ভোটে পড়বে, এমন নয়। ভাটপাড়া সংলগ্ন বিধানসভা বা পুরসভাগুলিতেও দারুনভাবে পড়তে বাধ্য। কারন রাজনীতিতে সফল এবং গুরুত্বপূর্ণ হতে গেলে যা যা থাকা দরকার, সেই অর্থ, সংগঠন, জনপ্রিয়তা, শক্তি, ক্ষমতা সবই আছে এই বিধায়কের। বারাকপুর কেন্দ্রে সত্যিই অর্জুন সিং বিজেপির প্রার্থী হলে, তৃণমূল প্রার্থীর সমূহ বিপদ। অর্জুন সিং নিশ্চয় চাইবেন জিতে সাংসদ হতে। যদি না হতে পারেন, তাহলেও অর্জুন এতটাই ভোট পাবে যা দীনেশ ত্রিবেদীকে হারিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট হতে পারে। যে দীনেশ ত্রিবেদীকে লোকসভাতে পাঠাতে এতটা মরিয়া দল, সেই প্রার্থীর পরাজয় হলে, অর্জুন সিং হেরে গেলেও সফল হবেন, এবং ধাক্কাটা লাগবে তৃণমূলের শীর্ষতম স্তরেই। অর্জুনের বিজেপিতে যোগদানের পর এমনই বলছেন অর্জুন-অনুগামীরা।

আরও পড়ুন –‘ডিফেনসিভ’ প্রার্থীতালিকা নিয়েই আক্রমণে যেতে চায় তৃণমূল, কণাদ দাশগুপ্তের কলম