আলিমুদ্দিনের শর্তেই সমঝোতা মানছে কংগ্রেস, কণাদ দাশগুপ্তর কলম

 

কণাদ দাশগুপ্ত

‘জোট’ বলা যাবেনা। বলতে হবে ‘আসন সমঝোতা’। হাত আর হাতুড়ি এবার একসঙ্গে পদ্মফুল আর জোড়াফুলকে রুখে দেওয়াল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর
এমনই ‘সমঝোতা’ হতে চলেছে যে প্রার্থী তালিকা কবে প্রকাশ করা সম্ভব হবে, তা এখনও জানাতেই পারছেনা বিধানভবন বা আলিমুদ্দিন।

নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবর, 34 আসনে মোটামুটি সমঝোতা হলেও এই মুহূর্তে 8টি আসন নিয়ে বামেদের সঙ্গে ‘টাগ অফ ওয়ার’ চলছে প্রদেশ কংগ্রেসের। ওদিকে, 20 আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করেও কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতায় যাতে ভুল বার্তা না যায় সেজন্য বুধবার প্রার্থীদের নাম ঘোষণা স্থগিত রেখেছে আলিমুদ্দিন। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কংগ্রেসের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির জট কাটানোর জন্য আরও অপেক্ষা করা হবে। তারপর সমাধান হোক বা না হোক ঘোষণা করা হবে বাম প্রার্থীদের নাম। গত রবিবার ফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু জানিয়েছিলেন, 13 মার্চ সিপিএম ও শরিক- প্রার্থীদের প্রথম তালিকা ঘোষণা করা হবে। প্রার্থী তালিকা ঘোষণার জন্য বুধবার দুপুরে ফ্রন্টের বৈঠকও ডাকা হয়েছিল। কিন্তু এদিন প্রার্থীদের নাম জানাতে পারেননি বিমানবাবুরা। যদিও ইতিমধ্যেই সিপিএম ঝুঁকি এড়াতে রায়গঞ্জে মহম্মদ সেলিম এবং মুর্শিদাবাদে বদরুদ্দোজা খানের নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে দিয়েছে। ওই পর্যন্তই এগোতে পেরেছে আলিমুদ্দিন।

এদিনের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠকে জানানো হয় 8টি আসনে কোন দল প্র্রার্থী দেবে তা এখনও ঠিক হয়নি। এই আসনগুলি হল কলকাতা উত্তর, দার্জিলিং, পুরুলিয়া, বারাকপুর, তমলুক, হাওড়া, আলিপুরদুয়ার, আসানসোল। এই 8 আসনের মধ্যে ফব’র ভাগের পুরুলিয়া এবং আরএসপি’র আলিপুরদুয়ার আছে। এই দুই কেন্দ্র কংগ্রেস দাবি করলেও ফ্রন্টের বড়দা সিপিএম এখনও কংগ্রেসকে কোনও কথাই দিতে পারেনি। বিমান বসুকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এই দুই আসন নিয়ে ফব ও আরএসপি’র সঙ্গে কথা বলার।

কলকাতা উত্তর, দার্জ্জিলিং আসন কংগ্রেসকে ছেড়ে দিতে সিপিএমের আপত্তি নেই। তবে, ঘুরিয়ে
শর্তও দিয়েছে সিপিএম। জানা গিয়েছে, কলকাতা উত্তর কেন্দ্রের দলীয় নেতা-কর্মীদের অস্বস্তি এড়াতে আলিমুদ্দিনের তরফে কংগ্রেসকে অনুরোধ করা হয়েছে, কলকাতা উত্তর লোকসভা কেন্দ্রে অরাজনৈতিক কাউকে প্রার্থী করুক কংগ্রেস। সেক্ষেত্রে বামেরা সক্রিয়ভাবে পাশে থাকবে। কংগ্রেস এদিকে জানিয়ে দিয়েছে যুব কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি সাদাব খান এই কেন্দ্রে দলীয় প্রার্থী। ইতিমধ্যেই প্রার্থীর নামে দেওয়াল লেখার কাজও ঢাক পিটিয়ে চলছে। রাজ্য কমিটির কাছে এই প্রার্থী নিয়ে প্রবল আপত্তি জানিয়েছে উত্তর কলকাতা লোকসভা কেন্দ্রের অধীনস্থ সিপিএমের নেতা-কর্মীদের সিংহভাগ। তাঁদের বক্তব্য, উত্তর কলকাতা কেন্দ্রজুড়ে এই প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা শূন্য। খাস কলকাতায় এমন প্রার্থীর হয়ে প্রচারে নামা অসুবিধাজনক। ওদিকে প্রদেশ কংগ্রেস সূত্রে জানা গিয়েছে, দলের একটি অংশ ‘বিশেষ উদ্দেশ্য’ নিয়েই এই কেন্দ্রটি দাবি করেছে। এবং সেই উদ্দেশ্য সফল করার লক্ষ্যেই একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত প্রার্থীও বেছে ফেলেছে। উদ্দেশ্য সফল হলে এই কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থীর পালে হাওয়া লাগার সম্ভাবনা প্রবল।

হাত আর হাতুড়ির এক হয়ে ভোটে নামার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিয়েছে দার্জ্জিলিং লোকসভা আসন নিয়েও। এখানেও উত্তর কলকাতার মতোই সমস্যা। সিপিএম বলেছে, দার্জিলিং কেন্দ্রেও সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত নন, পাহাড়ের এমন কাউকে কংগ্রেস প্রার্থী করুক। অথচ কংগ্রেস এই আসনটি দাবি করছে শঙ্কর মালাকারকে প্রার্থী করার জন্য। শিলিগুড়ির কমরেডরা আসন সমঝোতার প্রবল সমর্থক হলেও, প্রার্থী নিয়ে আপত্তি তুলেছে। ফলে জট এখানেও। ওদিকে, কংগ্রেসের এক সক্রিয় বিধায়ক এদিন বলেছেন, “মজার জোটের পথে আমাদের নেতারা হাঁটছেন। প্রদেশ নেতারা ধরেই নিয়েছেন, সমঝোতা করতে পারলেই বেশ কিছু সাংসদ পাওয়া যাবে। তাই ন্যূনতম মান-মর্যাদা বিসর্জন দিতেও পিছপা হচ্ছেন না নেতারা”। তিনি বলেছেন, ” কিছু নেতা দলকে এতটাই গুরুত্বহীন করে দিয়েছে যে আজ সিপিএম সাহস পাচ্ছে কংগ্রেসের ঠিক করা প্রার্থীর বিষয়ে আপত্তি তোলারও”।

তবে সমঝোতার পথে চিনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে পুরুলিয়া লোকসভা কেন্দ্রটি। এই আসনের দাবি থেকে এক ইঞ্চিও সরতে রাজি নয় ফরওয়ার্ড ব্লক। অন্যদিকে কংগ্রেসও এই আসন ছাড়বে না বলে জানিয়েছে। এই আসনের কংগ্রেস প্রার্থী নেপাল মাহাতো। ফব জানিয়েছে, তেমন হলে, ‘ফ্রেণ্ডলি-ফাইট’ নয়, সিরিয়াস চতুর্মুখী লড়াই হবে পুরুলিয়া কেন্দ্রে।
আসানসোল এবং তমলুক আসন কংগ্রেস দাবি করলেও আলিমুদ্দিন জানিয়েছে, এর একটি আসন ছেড়ে দেওয়াও সম্ভব নয়। সিপিএম একটি আসনও ছাড়বে না, আর কংগ্রেসও তমলুক আসন নিয়ে জেদ ধরে আছে। কিছুতেই তমলুক আসন ছাড়া যাবেনা বলে জানিয়ে দিয়েছে।
বারাকপুর, হাওড়া, আলিপুরদুয়ার এবং আসানসোল আসন নিয়েও দুই ‘বন্ধু’-র তথাকথিত ‘সমঝোতা’র চিহ্নমাত্রও দেখা যাচ্ছেনা।
এই 8 আসনে এখনও রফাসূত্র এখনও মেলেনি বলেই কং-বাম জোটের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করা যাচ্ছেনা। আলিমুদ্দিনের একাংশ চাইছে, এই 8 আসন বাদ দিয়ে, বাকি 34 কেন্দ্রের প্রার্থীর নাম প্রকাশ করা হোক। কারন, প্রথম দফার ভোট 11 এপ্রিল, আর একমাসও বাকি নেই।

তৃণমূল এবং বিজেপিকে হারাতে কং-বামের এই ‘সমঝোতা’ এখনও এক পা’ও একসঙ্গে হাঁটেনি। তার আগেই প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে, সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়ে। এত শর্তের বোঝা নিয়ে কংগ্রেস বামেদের সঙ্গে হাঁটতে রাজি হবে কিনা সে প্রশ্নও দেখা দিচ্ছে।