সমঝোতা নিয়ে অতি চালাকি করে ব্যাকফুটে সিপিএম, কণাদ দাশগুপ্তর কলম

কণাদ দাশগুপ্ত

একটি বিষয় স্পষ্ট, মুখে আসন সমঝোতার কথা বললেও, সিপিএম তথা বামেদের পদক্ষেপ সমঝোতার পক্ষে সহায়ক ছিলো না। সে সব দেখে এ ধারনা হতে বাধ্য, বামেরা আসন সমঝোতা চায়নি। তুলনায় প্রদেশ কংগ্রেসের ভূমিকা ছিলো অনেক নমনীয়। একটু খতিয়ে দেখা যাক আসন সমঝোতা পর্বে সিপিএম ঠিক কি কি করেছে। আর সিপিএমের সেই সব ‘পদক্ষেপে’ কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়াই বা কী ছিলো।

● আলোচনার শুরুতেই সিপিএম আপত্তি জানিয়েছে ‘জোট’ শব্দে। সিপিএম প্রথমেই জানিয়েছে, একে জোট বলা যাবে না, বলতে হবে ‘আসন-সমঝোতা’। আলিমুদ্দিন ভেবেছিলো এতেই কংগ্রেস কেটে যাবে। কিন্তু কংগ্রেস আপত্তি করেনি।

● সিপিএমের দ্বিতীয় শর্ত ছিলো, আসন সমঝোতা হলেও কংগ্রেসের সঙ্গে এবার যৌথ ভোট প্রচার করবে না সিপিএম। তাতে নাকি আলিমুদ্দিন ‘আদর্শচ্যুত’ হবে। যে সিপিএমের আপত্তি ছিলো না কংগ্রেসের ভোট নিতে, সেই সিপিএমের আদর্শের দোহাই দিয়ে যৌথ প্রচারে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত হাস্যকর।‘জলে নামলেও চুল না ভেজানোর’ এই নীতি ছিলো নেহাতই ভণ্ডামি। বামেরা ভেবেছিলো এই ইস্যুতে সরে যাবে কংগ্রেস। কিন্তু কংগ্রেস এতেও আপত্তি করেনি।

● রায়গঞ্জ এবং মুর্শিদাবাদ আসন না ছাড়লে এই সমঝোতা হবে না বলে হুমকি দেয় সিপিএম। দু’দিন সময় লাগলেও কংগ্রেস ছেড়ে দেয় ওই দুই আসনের দাবি। প্রদেশ কংগ্রেসের অভ্যন্তরে কোন্দল সৃষ্টির আশঙ্কা সত্ত্বেও সিপিএমের দাবি মেনে ওই দুই আসন থেকে দাবি তুলে নেয় কংগ্রেস।

● 2014 সালে রায়গঞ্জ থেকে 1200 ভোটে জেতা সাংসদ মহম্মদ সেলিম সংবাদ মাধ্যমে মন্তব্য করেন, “বিজেপি আর তৃণমূলের হাতে তামাক খেয়েছে কংগ্রেস।প্রদেশ কংগ্রেস নেতারা ওই দুই দলের হাত শক্ত করছেন। দেখা যাবে, জেতার পর হয়তো কংগ্রেসেও থাকবে না। অনেকের কাছে গতবার আমার জেতাটাই অপরাধ হয়ে গিয়েছে। সব শিয়াল এক হয়ে বলছে, সেলিমকে এবার সংসদে যেতে দেওয়া যাবে না। রায়গঞ্জে ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে”। এই মন্তব্য সেলিম করেন রায়গঞ্জ এবং মুর্শিদাবাদ আসন থেকে কংগ্রেস দাবি তুলে নেওয়ার আগে, যখন কংগ্রেস জট খুলে সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছে। সেই সময় সিপিএমের উচিত ছিলো এভাবে মন্তব্য না করতে সেলিমকে বলা। কিন্তু সিপিএম এই মন্তব্যের প্রতিবাদ করেনি। বরং সেলিম রায়গঞ্জের আসরে নেমে পড়লেন সাংসদ হতে।সমঝোতাকে প্রাধান্য দিয়ে কংগ্রেস আপত্তি জানায়নি।

● রায়গঞ্জ, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেস ছাড়ছে না দেখে সিপিএম ওই দুই আসনের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছিল। কোনও সমঝোতা পর্ব চলাকালীন এভাবে ঘোষণা করা অনৈতিক। সেই অনৈতিক কাজ সিপিএম করেছে। তবুও কংগ্রেস সরে আসেনি সমঝোতা থেকে।

● কেরলে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী ভাষণে বলেছিলেন, “সিপিএম হিংসাই করতে পারে। দুর্বলদের হাতিয়ার হিংসা। অহিংসার পথেই লড়াই করেছে কংগ্রেস। কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে না সিপিএম। ওদের মতাদর্শ বাতিলের খাতায়”। এই বক্তব্যের মধ্যে ভুল কোথাও নেই। এ রাজ্যের কংগ্রেস মনোভাবাপন্ন মানুষ সিপিএমের হিংসা দেখেছেন, হিংসার কথা শুনেছেন।দলের কর্মী-সমর্থকদের মনের কথাই বলেছেন রাহুল গান্ধী। ওদিকে সিপিএম দল হিসাবে নীরব থাকলেও কংগ্রেস সভাপতির এই বক্তব্যে ফের মন্তব্য করলেন সেলিম। সরাসরি কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীরই সমালোচনা করলেন তিনি। সেলিম বলেন, “কংগ্রেসের সভাপতির কাছ থেকে এটা আশা করি না। ঠিকই কংগ্রেস গান্ধীবাদ, অহিংসার কথা বলেছে। কিন্তু আমরা গান্ধীবাদী নই। শান্তির জন্য লড়াই করতে হয়। সেই লড়াইটা জান-মান দিয়ে লড়ছে বামপন্থীরা। এমন বললে সঙ্ঘ পরিবারের লোকেরাই বেশি উত্সাহিত হবে”। তখনও আলিমুদ্দিন চুপ ছিলো। অথচ বিমান বসু বা সূর্য মিশ্র পারতেন সেলিমকে সতর্ক করতে। করা উচিত ছিলো, কারন সমঝোতার আলোচনা তখনও চলছে। কিন্তু আলিমুদ্দিন সেই সৌজন্য দেখায়নি। আসন সমঝোতার সুযোগ নিয়ে কংগ্রেসের ভোটও নেবে, আবার কংগ্রেস সভাপতির রাজনৈতিক বক্তব্যের সমালোচনাও করবে, এ দুটো একসঙ্গে হতে পারেনা। তবুও প্রদেশ নেতারা সমঝোতার অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখে।

● AICC-র রফাসূত্র অনুযায়ী রাজ্যে 17 আসন পাওয়ার কথা কংগ্রেসের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, গত বারের জেতা চারটি ধরে 11টি আসনের বেশি আসন কংগ্রেস দিতে রাজি হয়না বামেরা। তখনও কংগ্রেস সরেনি।

● এরপর আলিমুদ্দিন সমঝোতা ভাঙ্গার জন্য অন্য পথ নেয়। যে সব আসন কংগ্রেসকে ছাড়া হয়েছে, সেই আসনে কংগ্রেসের প্রার্থী কে হবেন, তাতেও নাক গলায় আলিমুদ্দিন। সিপিএমের ভাগের আসনে কে প্রার্থী হবেন, তা বলতে যায়নি কংগ্রেস। কিন্তু সিপিএম বলেছে, উত্তর কলকাতায় কংগ্রেস সাদাব খানকে প্রার্থী করতে পারবেনা। সাদাব খানের হয়ে প্রচারে নামলে উত্তর কলকাতার কমরেডদের নাকি ইজ্জত থাকবেনা। সিপিএম বলেছে, দার্জ্জিলিং-এ কংগ্রেস শঙ্কর মালাকারকে প্রার্থী করতে পারবেনা। এসব কাজ তো সমঝোতা ভাঙ্গার জন্যই করেছিলো সিপিএম।

● কংগ্রেসের এক পদাধিকারীর নাম আলিমুদ্দিন নিজের তালিকায় আনে এবং ঘোষণাও করে দেয়। এ কেমন শিষ্টাচার? ওই প্রার্থী তো দু’তরফের সহমতের ভিত্তিতে যৌথপ্রার্থীও হতে পারতেন, সে রাস্তা বন্ধ করে করে ওই প্রার্থীকে কংগ্রেসের কাছে ‘ভিলেন’ বানিয়ে দিয়েছে আলিমুদ্দিন। সমঝোতা প্রক্রিয়ার সহায়ক ছিলো না বামেদের এসব সিদ্ধান্ত।

● সিপিএম বলেছে, পুরুলিয়া আসন ফরওয়ার্ড ব্লকের। তবে ওখানে কংগ্রেস যদি নেপাল মাহাতোকে প্রার্থী করে, সেক্ষেত্রে আপত্তি নেই। আসন সমঝোতা নিয়ে
কোনও দায়িত্বশীল দল অন্য দলকে এ কথা বলতে পারে ? এ সবই কি আসন সমঝোতা থেকে সরে আসার কৌশল নয় ?

এত কিছুর পর বাধ্য হয়ে কংগ্রেস জানিয়েছে, সমঝোতার প্রশ্ন অতীত। কংগ্রেস একক শক্তিতেই লড়বে। এবার ঘুম ছুটে গিয়েছে আলিমুদ্দিনের। এখন বলছে, সমঝোতা হোক বা না হোক, কংগ্রেসের জেতা 4 আসনে প্রার্থী দেবো না। তা দেয়নিও বটে। আসলে সিপিএম এখন বুঝতে পেরেছে, অতি চালাকি করতে গিয়ে গাড্ডায় পড়ে গিয়েছে। এখন বোঝাতে চাইছে, সমঝোতা ভাঙ্গার দায় আমাদের নয়। আমরা তো কংগ্রেসের জেতা 4 আসনে প্রার্থী দিইনি। সিপিএম চাইছে, কংগ্রেসও একই পথে হেঁটে যাতে রায়গঞ্জ আর মুর্শিদাবাদ থেকে প্রার্থী তুলে নেয়। কিন্তু সে সব এখন ইতিহাস। AICC-ও আর এই সিদ্ধান্ত চাপাতে পারবে কিনা সন্দেহ। ওদিকে তো সিপিএমের কর্মীরা বলতে শুরু করে দিয়েছেন, কিছু নেতার জেদের ফলেই কংগ্রেসের সঙ্গে জোট ভেস্তে গেল। বামফ্রন্টের নিচুতলায় তীব্র ক্ষোভ আলিমুদ্দিন কোন ওষুধে সারাবে ?

এই পরিস্থিতিতে আলিমুদ্দিনকে একটাই প্রশ্ন, সমঝোতা না করেও কংগ্রেস দাবি করতে পারে একা লড়ে অন্তত, বহরমপুর আর জঙ্গিপুর আসনে জিততে পারি।
গোটা রাজ্যের 42 আসনের একটিতেও সিপিএম একথা বলতে পারবে ? একটি আসনেও জয়ের কাছাকাছি আছে বামেরা ? রায়গঞ্জের বামপ্রার্থী তৃতীয় স্থানে নেমে গেলেও আশ্চর্যের কিছু নেই।

আসন-সমঝোতা নিয়ে অতি চালাকি করে তাহলে লাভ হলো কোন দলের ?