তিনি কি এ বঙ্গে যোগী আদিত্যনাথের কাউন্টার-পার্ট হতে পারেন?

চাণক্য চৌধুরি

2007 সালের সমঝোতা এক্সপ্রেস-বিস্ফোরণের ঘটনার 12 বছর পর সব অভিযুক্তকেই বুধবার NIA আদালত নির্দোষ ঘোষণা করেছে। এই মামলায় অভিযুক্ত স্বামী অসীমানন্দ-সহ চার অভিযুক্তই মুক্তি পেয়েছেন।

অন্যতম অভিযুক্ত স্বামী অসীমানন্দ এর আগে মালেগাঁও বিস্ফোরণ মামলা, মক্কা মসজিদ বিস্ফোরণ মামলা, আজমেঢ় দরগা বিস্ফোরণ মামলাতেও অভিযুক্ত ছিলেন এবং সব মামলা থেকেই নি:শর্তে মুক্তি পেয়েছেন। কোনও অভিযোগই তাঁর বিরুদ্ধে প্রমান করতে পারেনি জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা।

আরও পড়ুন- সমঝোতা থেকে কার্যত সরলো বামফ্রন্ট, বামপ্রার্থী মালদহ উত্তর ও জঙ্গিপুরে

কিন্তু কে এই স্বামী অসীমানন্দ, যার নাম 2006-07 সালের সব ভয়াবহ বিস্ফোরণ মামলায় যুক্ত হয়ে গিয়েছিলো এবং সব ক্ষেত্রেই প্রমানের অভাবে মুক্তি পেয়েছেন!

স্বামী অসীমানন্দ নামে সারা দেশ তাঁকে চিনলেও তিনি একজন নিখাদ বঙ্গসন্তান।
আসল নাম নবকুমার সরকার। আরামবাগ মহকুমার কামারপুকুরে তাঁর পৈতৃক ভিটে। খুব ছোট বয়সেই তিনি আরএসএসের মতাদর্শে দীক্ষিত হন। পুড়শুড়া থানা এলাকার ভুঁয়েড়া গ্রামের কালীপুর স্বামীজি হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে কামারপুকুর কলেজ থেকে ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে স্নাতক হন। বর্ধমান ইউনিভার্সিটি থেকে ফিজিক্সে Msc করেন অসম্ভব মেধাবী নবকুমার।

মা প্রমীলা দেবীর সঙ্গে নবকুমার সরকার বা স্বামী অসীমানন্দ

আরও পড়ুন- পাটনা সাহিব থেকে এই দলের টিকিটেই লড়বেন বিহারিবাবু শত্রুঘ্ন সিনহা !

Msc পাশ করার পরই তিনি ঘর ছাড়েন। পায়ে হেঁটে ভারতবর্ষের একাধিক তীর্থস্থান ভ্রমণ শুরু করেন।তারপরই একদিন এই নবকুমার সরকার গ্রহণ করলেন সন্ন্যাসব্রত। সেদিন থেকে তাঁর নাম হলো স্বামী অসীমানন্দ বা অসীম মহারাজ। শোনা যায়, হিমালয়ে গিয়েও বেশ কয়েকবছর কঠোর সাধনাও করেছেন তিনি। হিমালয় থেকে ফিরে ঝাঁপিয়ে পড়েন আদিবাসীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের কর্মযজ্ঞে। আদিবাসীদের জন্য দেশের বিভিন্ন জায়গায় কাজ শুরু করেন। গুজরাতে শবর ধাম তৈরি করেন। বনবাসী কল্যাণ সমিতি গড়ে তিনি গুজরাত, ছত্রিশগড়, আন্দামান -সহ দেশের বিভিন্ন আদিবাসী এলাকায় সঙ্ঘের আদর্শ প্রচারে নামেন। কিন্তু তারপরই তাঁর নাম জড়িয়ে পড়ে সমঝোতা এক্সপ্রেসসহ একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনায়। গ্রেপ্তার হন NIA–র হাতে। দীর্ঘদিন তিনি হরিয়ানার আম্বালা জেলে বন্দি ছিলেন। 2014 সালে সমঝোতা এক্সপ্রেস মামলায় তিনি জামিন পেলেও মক্কা মসজিদ ও আজমেঢ় বিস্ফোরণের অভিযুক্তদের তালিকায় তাঁর নাম থাকায় তিনি মুক্তি পাননি। আদিবাসীদের মধ্যে যাঁরা খ্রিস্টান ধর্ম নিয়েছিল তাঁদের 90 শতাংশকেই ফের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনেন। গুজরাত ছাড়াও মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক ইত্যাদি রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে তিনি ঈশ্বরতুল্য।

অসীম মহারাজের বাবা বিভূতিভূষণ সরকার ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। ইংরেজদের অত্যাচারে প্রায় পঙ্গু হয়ে যান তিনি। 1986-তে প্রয়াত হন বিভূতিভূষণ। পিতৃবিয়োগের খবর পেয়ে তখন কামারপুকুরে এসেছিলেন তিনি। তারপর দীর্ঘদিন তাঁর আর কোনও খোঁজই পায়নি পরিবারের লোকজন। মা প্রমীলা সরকার। সাত ভাইয়ের মধ্যে অসীমানন্দ মেজ। বড় দাদা স্কুলশিক্ষক ছিলেন। সেজভাই ডাক্তার। প্রত্যেকেই সুপ্রতিষ্ঠিত।

আরও পড়ুন- সাত সকালে রং-তুলি হাতে কী করলেন লক্ষ্মী?

মেজছেলের সন্ন্যাসী হওয়াটা মন থেকে কখনই মেনে নিতে পারেননি প্রমীলা দেবী।
বছর চারেক আগে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে 28 বছর পর কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীকে সঙ্গী করে অসুস্থ বৃদ্ধা মায়ের সঙ্গে দেখা করতে কামারপুকুরে এসেছিলেন সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে তখন অভিযুক্ত থাকা স্বামী অসীমানন্দ ওরফে কামারপুকুরের নবকুমার সরকার। বহুযুগ পর ছেলেকে দেখতে পেয়ে সেদিন কান্নায় ভেঙে পড়া মাকে কথা দিয়েছিলেন, জামিনে মুক্ত হয়ে আবার তিনি আসবেন। সে কথাও তিনি রেখেছিলেন। বছর দুয়েক আগে একদিন কামারপুকুর এসে সারাটা দিন তিনি মায়ের সঙ্গে কামারপুকুরের বাড়িতে কাটিয়ে যান। কোনও রকম নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল না। সেদিনের ওই সফর ছিল চূড়ান্ত গোপনীয়। স্বামী অসীমানন্দের বাড়ি কামারপুকুর শ্রীরামকৃষ্ণ মঠের পাশেই। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া জেলার আদিবাসীদের জন্য প্রচুর কাজ করেছেন তিনি। বনবাসী কল্যাণ আশ্রম করেছেন। অসীমানন্দ মহারাজের ভাই সুশান্ত সরকার বিজেপির হুগলি জেলার অন্যতম নেতা।

উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করে বড় চমক দিয়েছিল বিজেপি। বাংলার রাজনীতিতেও এমন চমক দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিলো। বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ এই অসীমানন্দ মহারাজকে বঙ্গ-বিজেপির সঙ্গে যুক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। বছর দুয়েক আগে দিলীপবাবু ঘোষণাও করেছিলেন, মক্কা মসজিদ বিস্ফোরণ মামলায় সদ্য মুক্তি প্রাপ্ত অসীমানন্দ মহারাজ বাংলায় বিজেপির হয়ে কাজ করবেন। এই ঘোষণার পরেই যোগী আদিত্যনাথের সঙ্গে অসীমানন্দ মহারাজের তুলনার বিষয়টি বঙ্গ- রাজনীতিতে সে সময় চর্চার বিষয় হয়ে গিয়েছিলো। সোশ্যাল মিডিয়াতেও চলছিলো তুমুল চর্চা।

তিনি যে নির্দোষ, আজ দেশের আইন সেকথা মেনেছে। বঙ্গসন্তান স্বামী অসীমানন্দ, এই বঙ্গ-রাজনীতিতে যোগী আদিত্যনাথের কাউন্টার-পার্ট হতে আদৌ আগ্রহ প্রকাশ করেন কিনা, সেটাই এখন দেখার।

আরও পড়ুন- নীরব মোদির 9 দিনের পুলিশ হেফাজত