বাম-কংগ্রেসের অনৈক্য, সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারবে বিজেপি?

কলি পারভিন

সিপিএম ও কংগ্রেসের জোটপ্রক্রিয়া ভেস্তে যাওয়ায় এরাজ্যের লোকসভা ভোটে চতুর্মুখী লড়াইয়ের দরজাটা শেষ পর্যন্ত খুলেই গেল। আপাতদৃষ্টিতে এই অবস্থায় শাসক দল তৃণমূলের সুবিধা হওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কংগ্রেস-বাম অনৈক্য বিজেপির জন্যও প্রকারান্তরে সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে। নামেই লোকসভা ভোট, কিন্তু রাজ্য-রাজনীতির বিচিত্র সমীকরণে এই ভোট যতটা না মোদি সরকারের পক্ষে-বিপক্ষে, তার চেয়ে কিছুটা বেশিই তৃণমূল বনাম তৃণমূল বিরোধিতার দ্বন্দ্বে।এমন অবস্থায় কী কী হতে পারে বাংলার চতুর্মুখী ভোটের প্রেক্ষাপটে?

আরও পড়ুন –ভোটবাজারে সবচেয়ে বড় চমক দিচ্ছে কংগ্রেস?

1) ভোটযুদ্ধে এরাজ্যে একদিকে তৃণমূল কংগ্রেস অন্যদিকে তৃণমূল বিরোধী বাকি তিন দল বিজেপি, কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট। আবার লোকসভা ভোটের অঙ্কে কেন্দ্রে সরকার গঠনের ডাক দিয়ে একদিকে বিজেপি এবং অন্যদিকে তৃণমূল, কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট। এই তিনদলের মধ্যেও আবার বিজেপি বিরোধী সরকার গড়ার প্রশ্নে মতভেদ। কংগ্রেস চায় কেন্দ্রে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার, তৃণমূল চায় ফেডারেল ফ্রন্ট নামক আঞ্চলিক জোটের সরকার যার নির্ণায়ক রাহুল নন হবেন মমতা, আর বামেরা ঘুরিয়ে বিজেপি বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির সরকারের কথা বললেও কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট সরকার হলে তাদের আপত্তি নেই। অর্থাৎ মোদি হঠানোর ডাক দিয়েও কেন্দ্রে কারা সরকার গড়বে সেই নির্দিষ্ট বিকল্প তুলে ধরার প্রশ্নে বিজেপি বিরোধী তিন দলেরই তিন রকম মত।

আরও পড়ুন –মিমি-নুসরতের পর এবার ফেসবুকে কুরুচিকর পোস্টের শিকার লকেট

2) লোকসভা ভোটে কেন্দ্রে সরকারের মুখ কে হবেন তা সাধারণ মানুষের সামনে অবশ্যই একটা বিচার্য বিষয়। আর এক্ষেত্রে বিজেপি বিরোধী দলগুলির মধ্যে এতটাই তীব্র মতভেদ যে মুখরক্ষায় বলতে হচ্ছে নেতা নয় নীতি বড়। নীতি অবশ্যই বড় কিন্তু সেই নীতি কার্যকর করবেন যিনি তিনি কতটা যোগ্য বা অযোগ্য তা বিবেচনায় রাখাটাও ভোটারের কর্তব্য। ভারতীয় রাজনীতিতে অনেক সময়ই দেখা গেছে বড় মাপের নেতাদের ব্যক্তিগত ইমেজ, নেতৃত্বের গুণ ও ক্যারিশমা অনেক সময়ই সরকারের বহু ত্রুটি-বিচ্যুতিকে ঢেকে দিয়েছে। নীতি নয়, নেতাই হয়ে উঠেছেন জয়-পরাজয়ের নির্ধারক। এই প্রক্রিয়া ঠিক কীনা তা নিয়ে তর্ক থাকতে পারে, কিন্তু ভারতের মত এত বড় দেশে এত বৈচিত্র, বিভিন্নতা ও সমস্যার মধ্যে দেশকে নেতৃত্ব দেবেন কে, তিনি তার যোগ্য কীনা এটা নিয়ে মতামত ব্যক্ত করার অধিকার অবশ্যই দেশের মানুষের আছে। ভোটে নেতা বাছার মানদণ্ডকে বিবেচনায় রাখলে অন্তত এখনও পর্যন্ত বিরোধী দলের অন্য যেকোনও নেতার তুলনায় এগিয়ে আছেন নরেন্দ্র মোদি। আর যেসব দল মুখে বলছে নেতা নয়, নীতিই আসল অথবা নেতা পরে বসে ঠিক করা হবে, তারাও কিন্তু ব্যক্তি মোদিকে আক্রমণ করাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অর্থাৎ ভোটারদের সামনে মোদি বনাম অবিজেপি অন্য যে কেউ বিকল্পের কথা বলে কার্যত মোদির ইমেজকেই শক্তিশালী করা হচ্ছে। এটা অবশ্যই বিজেপির পক্ষে আসবে।

আরও পড়ুন –অপমান ভোলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, এই যুক্তিতে দলের বৈঠকে গরহাজির শোভন

3) লোকসভা ভোটে এরাজ্যের চতুর্দলীয় লড়াইটা আবার তৃণমূল বনাম তৃণমূল বিরোধিতার প্রশ্নে সংগঠিত হতে চলেছে। বিরোধী ভোট তিনভাগ হওয়ায় সাধারণ অঙ্কের বিচারে এতে তৃণমূলের লাভ হওয়ার কথা। কিন্তু ভোটারের সামনে বিকল্প যুক্তিও থাকবে। বাম-কংগ্রেস জোট ভেঙে যাওয়ায় এই দুই দলের প্রার্থীদেরই আলাদা লড়ে ভোটে জেতা কার্যত অসম্ভব। প্রার্থী ও কেন্দ্র বিশেষে ব্যতিক্রম হতে পারে, তবে তা হিসেবের বাইরে রাখা ভাল। এখন যদি কট্টর তৃণমূল বিরোধী বাম বা কংগ্রেস সমর্থকরা দেখেন তাঁরা ভোট দিলেও জোট না হওয়ায় তাঁদের দলের প্রার্থীরা জিতবেন না, জিতবে তৃণমূলই, তাহলে তাঁরা দলীয় প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে তৃণমূলকে হারানোর কৌশল হিসেবে বিজেপিকে ভোট দেবেন। জেনেশুনে হেরো প্রার্থীকে ভোট দেওয়া মানে তো ভোটটাই নষ্ট। নতুন পরিস্থিতিতে তৃণমূলকে হারাতে নিজের নিজের কেন্দ্রে বিকল্প হিসেবে বিজেপি প্রার্থীদের ভোট দিতেই পারেন বাম, কংগ্রেসের কট্টর তৃণমূলবিরোধী অংশ।

আরও পড়ুন –অভিষেকই এখন আবার টার্গেট কেন?

4) এই একই যুক্তিতে আবার উল্টে বাম ও কংগ্রেসের হাতে থাকা ছটি আসনে সুবিধা হবে তৃণমূলের। কারণ এই ছটি কেন্দ্র মূলত সংখ্যালঘু অধ্যুষিত। এই সব সংখ্যালঘু ভোটারদের যদি মনে হয় তাঁদের ভোটে বাম, কংগ্রেস কোনও দলই আলাদাভাবে জিততে পারবে না বরং বিজেপির সুবিধা হয়ে যাবে, সেক্ষেত্রে বিজেপিকে হারাতে তাঁরা তৃণমূলে ভোট দেবেন।

আরও পড়ুন –বাবুলকে “বাচ্চা ছেলে” বললেন মুনমুন!

5) এরাজ্যে এবারের লড়াইটা ইতিমধ্যেই মোদি ও বিজেপি বিরোধিতায় কেন্দ্রীভূত করেছে শাসক দল তৃণমূল। এতে বিজেপিরই সুবিধা হয়েছে। আসন সংখ্যা ও ভোট শতাংশে পিছিয়ে থেকেও রাজ্যবাসীর কাছে তারা তৃণমূলের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে উঠে এসেছে। ফলে তৃণমূলকে হারাতে হলে বিজেপি আর বিজেপিকে আটকাতে তৃণমূলই শ্রেষ্ঠ বিকল্প এই দুটো সম্ভাবনা বাংলার ভোট মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে। ধর্মের ভিত্তিতে ভোটের ইস্যুকে বাদ দিলেও বলা যায় বাকি বিরোধীদের ইতিমধ্যেই অপ্রাসঙ্গিক করে দিতে পেরেছে বিজেপি। নির্বাচনে তারা এর সদ্বব্যবহার কতটা করতে পারে এবং আদৌ পারে কীনা সেটাই দেখার।

আরও পড়ুন –আজই ঘোষণা হতে পারে বিজেপি প্রার্থীদের নাম, সম্ভাব্য তালিকা দেখে নিন