আলিমুদ্দিন হয়তো হয়ে যাবে ছবি বিশ্বাসের সেই ‘জলসাঘর’,কণাদ দাশগুপ্তের কলম

কণাদ দাশগুপ্ত

বামফ্রন্টের অভ্যন্তরে সিপিএমকে এখন আর শরিকরা তেমন পাত্তাই দিচ্ছে না। ইদানিং একাধিকবার লক্ষ্য করা গিয়েছে, শরিক দলের নেতারা, ফ্রন্ট-চেয়ারম্যানের নির্দেশ বা আবেদনকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনছেন না। শরিক নেতারা ঘনিষ্ঠ মহলেও বলেও ফেলছেন, “সিপিএমের আর আছেটা কি যে তাদের বাড়তি নম্বর দিতে হবে ?”

শরিক নেতাদের এই বক্তব্যের যুক্তি আছে। সংসদে সিপিএম কমতে কমতে 2014-তে 9-এসে ঠেকেছিলো। 2019-এ কোনও অবস্থাতেই 3-5এর বেশি হবেনা। ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গে এবার হয়তো সিপিএম খাতাই খুলতে পারবে না। সে আশা কোনও সিপিএম নেতারও নেই। আর ‘দুর্গ’ কেরলের জনমত সমীক্ষা বলছে, সিপিএম নেতৃত্বাধীন LDF-এর ভরাডুবির আশঙ্কা প্রবল। সমীক্ষা বলছে, কেরলের মোট 20টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন UDF পেতে পারে 13-15 টি আসন, বামেরা পেতে পারে 3-5 আসন। বিজেপি পেতে পারে 1 টি আসন। সমীক্ষা রিপোর্ট সবসময় মেলেনা এটা ঠিক, কিন্তু একটা আভাস তো পাওয়া যায়। সেই আভাস বলছে, বামেদের চেয়ে কংগ্রেস কেরলে অনেকটা এগিয়ে। তেমন হলে জাতীয় রাজনীতিতে সিপিএম তথা বামেদের সামগ্রিক বিপর্যয় একরকম নিশ্চিত।

এ রাজ্যে কংগ্রেসের সঙ্গে জোটের আলোচনা চলাকালীন শরিক আরএসপি, ফরওয়ার্ড ব্লক এবং সিপিআই স্পষ্টভাবেই সিপিএমকে জানায়, কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বা আসন সমঝোতায় তাদের সায় নেই। শুধুই অভিমত জানিয়েই থেমে থাকেনি শরিকরা। পুরুলিয়া এবং বসিরহাট আসন কংগ্রেসকে ছাড়ার কথা যখন সিপিএম বলেছিলো, তখন ফব এবং সিপিআই বিমান বসুকে সাফ জানায় এসব চলবে না। এই দুই আসন আমাদের। আমরাই প্রার্থী দেবো। তেমন হলে চতুর্মুখী লড়াই হবে। শরিকদের এই হুমকি মানতে বাধ্য হয় সিপিএম। ফব-সিপিআই ওই দুই কেন্দ্রে প্রার্থীর নাম পর্যন্ত জানিয়ে দেয়, সিপিএমকে তোয়াক্কা না করেই। কিছুই করতে পারেনি সিপিএম।
শেষপর্যন্ত অবশ্য কং-বাম জোট বা আসন সমঝোতা হয়নি, কিন্তু দুই শরিক নিজেদের ঘোষণা থেকে এক পা’ও সরেনি, সিপিএমকে উপেক্ষা করেই।

আরও পড়ুন –নির্বাচনে সেনার নাম ব্যবহার নয়, রাষ্ট্রপতির দ্বারস্থ 156 প্রাক্তন সেনা

বাকি ছিলো আরএসপি। তারাও ফোঁস করলো বহরমপুর আসন নিয়ে। কংগ্রেসের সঙ্গে জোট না হওয়াযর পর বামফ্রন্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, কংগ্রেসের জেতা দুটি আসন, বহরমপুর এবং দক্ষিণ মালদহে ফ্রন্ট প্রার্থী দেবে না। এক্ষেত্রে আরএসপি’ও উড়িয়ে দিলো ফ্রন্ট-চেয়ারম্যান বিমান বসুর প্রার্থী না দেওয়ার নির্দেশ বা অনুরোধ। সাফ জানালো, এসব মানা সম্ভব নয়, বহরমপুরে আমাদের প্রার্থী ঈদ মহম্মদ। বারবার বিমান বসু বলেছেন, ওই কেন্দ্রে ফ্রন্টের প্রার্থী নেই। কিন্তু সে সব কথা আরএসপি পাত্তাও দেয়নি। শেষে সাংবাদিক বৈঠকে বিমানবাবু ঘোষণা করেন, ওই আরএসপি প্রার্থীকে বামপ্রার্থী হিসাবে মানতে রাজি নয় ফ্রন্ট। তাতেও বিচলিত হয়নি শরিক আরএসপি।
ফ্রন্ট-শরিক আরএসপি বহরমপুরে ঈদ মহম্মদকে প্রার্থী করায় প্রবল অস্বস্তিতে পড়ে আলিমুদ্দিন। ওই অস্বস্তিই সার। ফব, সিপিআইয়ের মতো আরএসপিকেও থামাতে ব্যর্থ হয় আলিমুদ্দিন। সিপিএমকে আর শরিকরা গুরুত্বই দিচ্ছেনা।

আরও পডুন –ইলেকটোরাল বন্ডের বিস্তারিত তথ্য রাজনৈতিক দলগুলিকে জমা দেওয়ার নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের

পরপর ঘটে যাওয়া এ ধরনের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি ফ্রন্টে ভাঙ্গন শুরু হয়ে গেল? এখনই ভাঙ্গন না হলেও ‘সংসার যে আর সুখের নেই’ তা বেশ ধরা পড়ছে। সিপিএমের ‘দাদাগিরি’ মানতে আর রাজি হচ্ছে না শরিক ফব,আরএসপি, সিপিআই। এখনই যদি এই হয়, তাহলে সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পর যদি দেখা যায় পশ্চিমবঙ্গ আর ত্রিপুরায় সিপিএম শূন্য, কেরলে 3-5 আসন, সেদিন থেকে বোধহয় সিপিএমের আর ফ্রন্টের ‘বড়দা’ থাকাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
লোকসভা ভোটের পর জাতীয় রাজনীতি বাম-প্রভাবমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। সেক্ষত্রে এ বঙ্গের বামফ্রন্টেও সিপিএমের সেই ‘বড়দা’ ইমেজের অবনতি হতে বাধ্য।
কর্মী-সমর্থক হয়তো তখনও থাকবে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে, কিন্তু আলিমুদ্দিন হয়তো হয়ে যাবে ছবি বিশ্বাসের সেই ‘জলসাঘর’, স্মৃতিই হবে যার একমাত্র অবলম্বন।
সে বড় সুখের সময় হবেনা বিমান বসু-সূর্য মিশ্রদের কাছে।

আরও পড়ুন –ফের প্রশ্নের মুখে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানির শিক্ষাগত যোগ্যতা!