রবিবারের বাবুইবাসা : 12-05-19

।।ধারাবাহিক উপন্যাস।।

।। জননী ।।

নারায়ণ চন্দ্র দেবনাথ

প্রতাপের বাবা বিশ্বনাথবাবু অত্যন্ত রাশভারী লোক। আবেগেরবহিঃপ্রকাশ তিনি ঘটাতে চান না। ছেলের চিঠি পেলে তাঁরও আনন্দ হয় বটে কিন্তু বাইরে তার কোনও প্রভাব পড়ে না। স্ত্রীর কথায় বিরক্ত হয়ে বলেন, আঃ, দাঁড়াওনা! এত উতলা হয়েছো কেন?

স্বামীর ধমক খেয়ে তাঁর মুখ ভারী হয়ে যায়; চোখ ছলছল করে ওঠে। বিশ্বনাথবাবু ছেলের চিঠি পড়েন। চা পান করতে করতে সেই চিঠি স্ত্রীকে শোনান। চিঠির বিষয় শুনে প্রতাপের মা বলেন, যাক একটু নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।

স্ত্রী নিশ্চিন্ত হলেও বাবা কিন্তু নিশ্চিন্ত হতে পারেননি। যে বাঙালি সহকর্মীর কথা সে লিখেছে তাঁর সম্পর্কে চিঠিতে কিছুই জানানো হয়নি। সবকিছু না জেনে তিনি নিশ্চিন্ত হতে পারেন না। কোন্‌ মানুষ কী উদ্দেশ্য নিয়ে কার সাথে মেশে কে জানে! প্রতাপের মাকে সেই আশঙ্কার কথা শোনালে তিনি বলেন, তোমার ওই এক বাতিক। এসব বাতিক ছাড়ো দিকিনি। বলে তিনি রান্না ঘরের দিকে পা বাড়ান। আজ কাজের মাসি আসেনি, ভোলাও চারদিন ছুটি নিয়েছে। তাই তাঁকে একাই সব কাজ করতে হচ্ছে। শরীরও ঠিক নেই। তবুও নিজেদের জন্য খাবার তাঁকে তৈরি করতেই হচ্ছে। না হলে খাবেন কী! ছেলেটা এখানে থাকলে তার বিয়ে দিলে বউমার হাতে সংসারের দায়িত্ব তুলে দিয়ে তাঁরা নিশ্চিন্ত হতে পারতেন। কিন্তু সে কপাল কী তাদের আছে! এসব ভাবতে ভাবতে মায়ের মুখ থেকে দীর্ঘ নিশ্বাস পড়ে।

প্রতাপের মা রান্না ঘরে গেলে বিশ্বনাথবাবু গভীর ভাবে ভাবতে বসেন। ব্যাপারটা কী হতে পারে! কেন ছেলে কে লোকটি তাদের বাড়ি যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে! সেদিন নাকি ভদ্রলোকের সাথে ছেলের প্রথম আলাপ হয়! প্রথম আলাপেই কি কেউ কাউকে বাড়ি যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়? নিশ্চয়ই ভদ্রলোকের কোন মতলব আছে। কী মতলব হতে পারে! বিশ্বনাথবাবু বুদ্ধির বাক্স হাতড়ে অবশেষে আবিষ্কার করেন যে ভদ্রলোকের নিশ্চয়ই কোন মেয়ে বা বোন আছে।তাঁর ইয়াং, হ্যান্ডসাম, সরকারি চাকুরে ছেলে কে পেয়ে মুরগি করতে চাইছে। বিদেশ বিভুয়ে তো দেশি বাসী ছেলে পাওয়া যায় না! তাই প্রতাপ কে পাকড়াও করতে চায়। ভেবে ভেবে তখনি তিনি ছেলেকে চিঠি লেখেন। চিঠিতে তাঁর আশঙ্কার কথা পরিষ্কার জানিয়ে তিনি ছেলেকে সাবধান করে দেন। বাবার চিঠি পেয়ে ছেলে তো হেসেই অস্থির।একা একাই হাসছে। স্মৃতির ভাণ্ডারে গচ্ছিত কোন হাসির কথা স্মৃতি খুঁড়ে হঠাৎ বেরিয়ে এলে মানুষ যেমন স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাসতে থাকে, প্রতাপ ও তেমনি ঘরের মধ্যে একা একা হাসে আর মনে মনে বলে, বাবার আর পরিবর্তন হল না। মাকে চিরকাল জ্বালিয়েছে, আর এখন আমার পিছনে লেগেছে। তবুও প্রতাপ বাবার আশঙ্কাকে একেবারে উড়িয়ে দেয়নি। বাবা জ্ঞানী মানুষ, বিচক্ষণ ব্যক্তি। তাঁর কথা কেউ অপেক্ষা করা ঠিক হবে না। তাই মনে মনে সে সিদ্ধান্ত নেয় যে কোন কৌশলে মলয়বাবুর কাছ থেকে সে জেনে নেবে তাঁর বাড়িতে আর কে কে আছেন।

প্রায় মাস খানেক হয়ে গেলেও প্রতাপ একবারও তাঁর সাথে দেখা না করায় মলয়বাবু নিজেই বিশেষ এক অজুহাতে প্রতাপের সাথে দেখা করেন। প্রতাপ লজ্জিত হয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর  বলে, বসুন  স্যার। হঠাৎ মলয়বাবুকে তার কেবিনে আসতে দেখে প্রতাপের মনে সন্দেহ জাগে। বাবার কথা অমান্য করতে না পেরে সে মনে মনে ভেবেছিল মলয়বাবুকে এড়িয়ে চলবে। কিন্তু এখন তিনি সটান এসে পড়াতে সে বিব্রত হয়ে পড়ে। শয়তানরা তো নানা অছিলায় ভালোমানুষগুলিকে বিপদে ফেলে। মুখে ভালো ভালো কথা বলে আমার মন জয় করে নিয়ে তারপর আমাকে বিপথে নিয়ে যাবেন না তো! সংস্কৃতে একটা কথা আছে, “মধুতিষ্ঠতি জিওবাগ্রে হৃদয়ে তুহলা হলম।“ কিন্তু মলয়বাবুকে দেখে অবশ্য তা মনে হয় না। এখন দেখা যাক, তিনি কী উদ্দেশ্যে এসেছেন!

প্রতাপের অনুরোধ শুনে তিনি বলেন, নানা , আমি বসতে আসিনি! ভাবলাম ছেলেটি নতুন এখানে এসেছে। কেমন আছে তার কোন খোঁজ খবরও নেই। তাই একটু খবর নিতে চলে এলাম।

তা ভালোই করেছেন। আপনি কেমন আছেন স্যার?

আমি ভালোই আছি। তবে তুমি আমাকে স্যার বলবে না।

আপনি আমাদের বস, আপনাকে স্যার বলব না তো কী বলব!

আঙ্কেল বলবে। সকলের সামনে অবশ্য স্যার ই বলবে।

(পরবর্তী অংশ আগামী সপ্তাহে)

############################################

।।অন্ধকারকে ভালোবাসে।।

সৈয়দ হুমায়ুন রাণা

কেউ অন্ধকার ভালোবাসে শুনেছ?
রজকের মা ভালোবেসে অন্ধকারকে বুকে টেনে নিয়েছে;একরাশ নিকোষ কালোকে আপন ভেবে—
বরং সে আলোকে ভয় পায়—সেই ঝাড়খন্ডের
আদিবাসী বিধবা ,রজকের বুড়ি মা……..

শহুরে বাবুরা গাঁয়ে এসিন বুলেছিল ইকবার
তুদের চোখটোতে আলোক জ্বালাতে হুবে
তুরা হামাদিরকে সাপোটটো দিস;আমরা উদের
বিশ্বাস টো করিনছিলাম—-এই মুনটো থেকিন;
হ!আলোক জ্বলবেক হামাদের চোক্ষ‍্যে……

হামাদের ছোট্ট গাঁটোতে হামরা হেসি-খেলিন
থাকত‍্যাম গো—এই ছোট্ট সুনার গাঁয়ে;
শহুরের বাবুরা হামাদের কানে ফুসমন্তরটো
দিলেক আর হামরা মাতাল হয়িন গেল‍্যাম;
হামাদের হাত‍্যে বন্দুক,পিস্তল ধরাইন দিলেক
বুললে অরা,আগু পথের কাঁটা সরাইনতে হবেক
তারপরেই আসিবেক আলোর দিন……

আলোক আর আসে লাইগো, হামাদের সুনার গাঁয়ে;চারদিকপানে আঁধার পাহাড় মাথা চাগাড় দিছে
হামার একমাত্র ব‍্যাটা রজক আর ফেরে লাই ঘরে
অন্ধকারে অরে টেনে লিয়ে গেলছে,অজানা পথে
হামরা ভয় পাই তাই আলোকে,শুনছো তুমরা?
হামাদের চায়লাকো আলো—-ফিরায়ে দ‍্যাও সেই
সুনার গাঁ’—হামার সুনার ছেল‍্যা রজককে…

############################################