হারাকে হারিয়ে দেওয়ার গল্প- কন্ঠ, প্রীতিময় চক্রবর্তীর কলম

প্রীতিময় চক্রবর্তী

ছবি করিয়েদের সমাজের চলতে থাকা ভালো খারাপের গুরুদায়িত্বটা নিতে হয় । শুধু মিষ্টি মিষ্টি প্রেমের গল্প বলে যে ছবিওয়ালারা বাজার মাত করার অবিরাম যুদ্ধে মেতে আছেন, তাঁদের ছবি বিক্রি হলেও থেকে যায় না । হারিয়ে যায় ।

সমাজের বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গে নিজ-কর্ম কে জড়াতে পেরেছেন বলে মৃণাল, সত্যজিত, ঋত্বিকরা মানুষের মননে থেকে গেছেন ।

আরও পড়ুন-শেষ পর্যন্ত এই কারণে বাতিল হয়ে গেল অমিত শাহের বারুইপুরের সভা

আজকের পরিচালকদের অনেকেই এই গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলেছেন এবং সমাজ জীবনের ঘটতে থাকা ভালো খারাপের গল্প তাঁদের নিজেদের মতো করে, যথেষ্ট পরিশ্রমের সঙ্গে বলতে চেষ্টা করছেন । এটা একটা সু-খবর, একটা আশার খবর ।

এরকম একটি কাজ অনায়াসে করেছে নন্দিতা -শিবপ্রসাদ। ছবির নাম ‘কন্ঠ’।

আরও পড়ুন-পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের অভিযোগ, বাঁকুড়ার জেলাশাসককে সরাল কমিশন

একটি সপ্রতিভ যুবকের গল্প । একটি তারকা রেডিও জকির ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্প । একই পেশার কয়েকটি ফুটফুটে যুবক যুবতীর নিজেদের মতো করে লড়তে থাকা সহকর্মীর পাশে পাহাড়ের মতো করে দাঁড়িয়ে যাওয়ার গল্প । এক স্ত্রী র লড়াইয়ের গল্প । এক শিশু পুত্রের অসহায়তার কাহিনী । পুরানো সংস্কারে পরে থাকা বিধবা পিসির আকুতি । এক থেরাপিষ্ট এর নিরলস লড়াইয়ের গল্পগাথা  ।

একটা ভালো ছবি অনেকগুলো ছোট খাটো ট্রিটমেন্টে সমৃদ্ধ হয় । পরিচালকের মুন্সিয়ানা ঐ ছোট খাটো ভাল লাগা বা ট্রিটমেন্টগুলোকে পারদর্শিতার সঙ্গে, নিপুণতার সঙ্গে প্রয়োগ করা । দুরারোগ্য ক্যান্সারের থেকেও বউকে সমীহ করার তাগিদকে গুরুত্বর সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন নন্দিতা – শিবপ্রসাদ । অস্পৃশ্য সিগারেটের প্যাকেট কে বাথরুমের আয়নার পেছনে লুকিয়ে রাখা বা স্ত্রীর অনুপস্থিতিতির সুযোগে বাথরুমে বসে সিগারেট এ টান দেওয়ার প্রচেষ্টা । কি নিষ্ঠুর সত্যিকে কত অবলীলায় উপস্থাপন করছে ‘কন্ঠ’।

আরও পড়ুন-পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের অভিযোগ, বাঁকুড়ার জেলাশাসককে সরাল কমিশন

কনীনিকা র অত্যন্ত মর্মস্পর্শী অভিনয় আমাকে ভাবিয়েছে । তুমূল ভাবিয়েছে । এত মেধার অভিনেত্রীদের কেন সোপ, সিরিয়াল করে জীবন যাপন করতে হয়?? এই প্রশ্নের উত্তর আছে কিনা জানিনা । ছবির মূল পর্বে ঢুকতে না ঢুকতেই কনীনিকা তাঁর অভিনয় প্রতিভায় মুগ্ধ করল ।

ছবির বুনিয়াদ বাধলো শিবু নিজে । বন্ধু বৎসল এক রেডিও জকি । মন্ত্র উচ্চারণের প্রতিভায় গল্প করে On Air শ্রোতাদের সঙ্গে । তাঁদের জীবনের ভাঙ্গা গড়া, সূখ শান্তিতেও অংশ নেয় । কিন্তু পেশার লক্ষণরেখা অতিক্রম করে না । তাই ব্যাক্তিগত পরিচিতি তার সামান্য কয়েকজন পেশার বন্ধুর সঙ্গেই । তাঁদের মধ্যে পেশাদারিত্ব আছে, হিংসা বা ল্যাঙ বাজী নেই । এরকম একটা আবহাওয়া আজকের মিডিয়া দুনিয়ায় বিরল । তাই শিবু নন্দিতা র তৈরী এই আপাত ফ্যান্টাসি, ছবির গুনমাধুর্যই বাড়িয়েছে, অহেতুক সিনেমা টাকে সিরিয়ালের মোড়কে বেঁধে ফেলে নি । শিবু র স্ক্রিপ্টিং এর সাবধানতা এই ছবি কে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে।

আরও পড়ুন-মর্গে দেহ, ভোট দিলেন নিহত বিজেপি নেতার মা ও স্ত্রী

‘কন্ঠ’ হারা কে হারিয়ে দেওয়ার ছবি । সযত্নে শিবু নন্দিতা সংলাপ তৈরী করেছেন, যেটা জিততে বলে, জীবনের সমস্ত জটিলতা কে হারিয়ে জিততে শেখায় । একটা সম্পূর্ণ এবং ইতিবাচক ছবি দর্শকের মনটাকেও ছটফটে রাখে । এই মর্মে ‘কন্ঠ’ নিঃসন্দেহে একটি চুড়ান্ত সফল ছবি । জীবন যুদ্ধ সকলকেই কিছু না কিছু উপায়ে বিব্রত করে,তাই এ ছবি সদলবলে সকলের দেখা উচিত । বেঁচে থাকার, নিজের লক্ষে স্থির থাকার মন্ত্র শেখার জন্য এ ছবি অতীব প্রাসঙ্গিক এবং আজকের সমাজের জন্য অপরিহার্য ।

গলা যখন তার নিজের নিয়মে আর চলবে না বলে বেঁকে বসল । ডাক্তার মজুমদার (বিপ্লব দাশগুপ্ত) অসাধারণ ডাক্তারি ব্যক্তিত্ব প্রয়োগ করে, মানুষটার বেঁচে থাকাটাই বিচার্য, শিল্পটার মৃত্যু তুলনামূলক ভাবে কম প্রয়োজনীয় বিধান দিলেন – মেনে নিতে পারলেন না, বাচিক শিল্পী রেডিও জকি অর্জুন । নানান ম্যানারিজম এ, সপটু অভিনয় শৈলী তে সেই বিষাদ ফুটিয়ে তুললেন শিবপ্রসাদ । অবাক হয়ে দেখার মতো, উপভোগ করার মতো অভিনয় এর নিদর্শন রেখে গেলেন শিবপ্রসাদ আর তার ‘কন্ঠ’। সে থেরাপিষ্ট এর পরামর্শে নতুন করে কথা বলার তালিম নিতে থাকল । জীবনের ভাঙ্গা গড়ার এই গল্প দর্শকের মননে থেকে যাবে, দীর্ঘকাল । এই প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার ছোট্ট অভিনয়ে পরাণ দা অনবদ্য । পুরানো চাল সত্যিই ভাতে বারে ।

আরও পড়ুন-“কিছু সুবিধা পেতে দল বদলাতে পারবো না”, স্পষ্ট জানালেন সব্যসাচী চক্রবর্তী

বিধবা পিসির ভুমিকায় চিত্রা সেন । অভিনয় ঢেলে দিতে কোনো কার্পন্য করেন নি । অভিজ্ঞতা এবং অসীম মেধার, প্রানশক্তির এক মহামিলন । পরিচালকদ্বয়ের আরো ধন্যবাদ প্রাপ্য ঠিক জায়গায় ঠিক অভিনেতা/ অভিনেত্রী কে কাজে লাগানোর কৌশলে । একটা ভালো ছবি তৈরি হয়, যখন অনেকগুলো যোগ্য মানুষ একত্রিত হয় । নন্দিতা -শিবু অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এই সূক্ষ্ম কর্মটি করছেন এবং ছবিটা কে সর্বাঙ্গীন সুন্দর করেছেন ।

লড়ে গেছেন দুই দুর্ধর্ষ অভিনেত্রী । জয়া এসান আর পাওলি দাম । জয়া যখনই ইনসুইং ছেড়েছেন, পাওলি তখনই ওভার বাউন্ডারি মেরেছেন । কস্টিউম ডাজাইনার এই দুই অভিনেত্রী কে এত সঠিক ভাবে উপস্থাপন করেছেন যে এদের চরিত্র কে আরো উপভোগ্য মনে হয়েছে, একান্ত বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে দর্শকের । একেই তো বলে সফলতা ।

আরও পড়ুন-মুম্বই লোকাল গুঁড়িয়ে দিল চেন্নাই এক্সপ্রেসকে

পাওলি স্ত্রী আর জয়া থেরাপিষ্ট । অর্জুন কে রেডিও তে ফেরাতে দুজনেই উন্মাদের মতো পরিশ্রম করেছেন । তারই ফাঁক ফোকরে স্ত্রী শঙ্কিত হয়েছেন, সদ্য ডিভোর্স হওয়া থেরাপিষ্ট যেন তাঁর প্রিয় স্বামী কে সম্পর্কে জরিয়ে না ফেলে । এই নিখুঁত টান আগাগোড়া ছবিতে বজায় থেকেছে সংলাপ এবং পরিচালনায় । কিন্তু এই টান বা টেনশন কখোনওই গল্প বলার প্রয়োজনের মাত্রা ছাড়ায় নি । নিশ্চুপ থেকেছে এই জটিলতা, নিরব থেকেছে তার আশঙ্কিত প্রতিফলন । অবশেষে যখন এই জটিলতার জট খুললো তখন মনে হয়েছিল শিবু কে জড়িয়ে ধরে বলি “বাহ্ ব্রাদার – ওস্তাদের মার শেষ রাত্রে “। এই সাবধানতাই এই ছবি কে সিরিয়াল হতে দিল না, বরং একটি Complete cinema তেই পর্যবসিত করলো ।

এরকম বাঙলা ছবি আরো হোক । পরিচালকরা তাঁদের কাজের প্রতি যত্নবান হন । সিনেমা হল নেই এই অজুহাত বন্ধ হোক । সিনেমা আছে, ভালো সিনেমা আছে এই গর্বই আমাদের বেশি করে গর্বিত করুক ।

আরও পড়ুন-আহত তৃণমূল কর্মীর বাড়িতে দেব