রবিবারের বাবুইবাসা : 02-06-19

।।ধারাবাহিক উপন্যাস।।

।। জননী ।।

নারায়ণ চন্দ্র দেবনাথ

মলয়বাবুর কথা শুনে প্রতাপ একটু লজ্জিত হয়ে পড়ে। প্রতাপকে অপ্রস্তুত হতে দেখে মঞ্জিষ্ঠা বলেন, তুমি না বড্ড বাজে বকো।

বাজে বকি মানে? যা সত্য তাই তো বলছি। তারপর প্রতাপকে উদ্দেশ্য করে বলেন, দেখবে  বেশিরভাগ স্বামীই তাঁদের স্ত্রীর নিন্দা করেন। স্ত্রীর চোখ টেরা, চুল নেই, কালো, দাঁত উঁচু, বেঁটে, রোগা, মোটা, চোখ ছোটো, মুখবাঁকা- ইত্যাকার রূপের দিক থেকে কত শত খামতির কথা বলেন। আর আমি দেখো, স্ত্রীর প্রশংসা করাতে সেটাও দোষের হয়ে গেল! আমরা পুরুষ মানুষগুলি কোথায় যাবো বলো তো! সেই জন্যই কে যেন বলেছে নারী চরিত্র বেজায় জটিল! বলেই তিনি সেই বক্তার নাম মনে করার চেষ্টা করেন। প্রতাপ বলে থাক আঙ্কেল, আর নাম মনে করে কাজ নেই। এই প্রসঙ্গ থাক। তবে সত্যিই আপনার পছন্দ আছে বলতে হবে। আন্টি যতই অস্বীকার করুন না, বিশ্ব সুন্দরী চ্যাম্পিয়নশিপে আন্টি নামলেনা আর কেউ তাঁর ধারে কাছে ঘেঁষতে পারবে না। বলেই প্রতাপ ও মলয়বাবু দুজনেই হাসতে থাকেন।

হাসি থামিয়ে  মলয়বাবু বলেন, কী বললাম! দেখেছো তো! প্রতাপ আমায় চিনতে পেরেছে, কিন্তু তুমি এতদিন ঘর করেও আমাকে  চিনতে পারনি। শোন প্রতাপ, তোমার আন্টিকে দেখে তুমি কী ভাবছ জানিনা, কিন্তু আমার মেয়েকে দেখে সত্যি তুমি চোখ ফেরাতে পারবে না। আমার মেয়ে বলে বলছিনা। ও এখনি আসবে।

আবেগ চেপে রাখতে না পেরে প্রতাপ হঠাৎ বলে বসে, কোথায় গেছেও? স্যরি , আই মিন উনি?

প্রতাপকে অপ্রস্তুত হতে দেখে মৌলীনা বলেন, আরে এত লজ্জা পাওয়ার কীআছে? আমার মেয়ে তোমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোটো।

প্রতাপ নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, দ্যাটস  ওকে!

বস্তুত মৌলীনা আন্টিকে দেখে প্রতাপ এতটাই বিমুগ্ধ হয়েছে যে তাঁর মেয়েকে দেখার জন্য মন অস্থির হয়ে ওঠে। এত  সুন্দরী  মায়ের মেয়ে না জানি আরও  কতই না সুন্দরীহবে!

তাই আন্টিকে দেখার পর থেকেই মেয়েকে দেখার জন্য সে উন্মুখ হয়ে থাকে।  এদিক ওদিক দু-একবার চেয়ে দেখেছেও। মেয়েকে দেখতে না পেয়ে  মনে একটু হতাশাও জেগেছে ইতিমধ্যে। তাই মেয়ে এখনি আসবে শুনে প্রতাপ আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। শিকারের লোভে ওঁত পেতে থাকা ক্ষুধার্ত বাঘ যেমন শিকারকে দেখেই তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তেমনি প্রতাপ মলয়বাবুর মেয়ের আসার কথা শুনে নিজেকে আর সংযত রাখতে না পেরে মেয়ে কখন আসবে তা জিজ্ঞাসা করেই বসে। দৃষ্টিকটু হলেও এটাই স্বাভাবিক। প্রতাপের যা বয়স তাতে এইরকম কৌতূহল থাকা অবাঞ্ছনীয় নয়। বিশেষ করে নারীর সৌন্দর্যের কাছে অনেক মহাপুরুষও বশ মেনেছে, প্রতাপ তো সেই তুলনায় অতি সাধারণ। দেবতারাও কেউ কেউ নারীর সৌন্দর্য কে উপেক্ষা করতে পারেনি। ঋষি মুনিরাও অনেক সময় তাঁদের সাধনা বিসর্জন দিয়েছেন নারীর পায়ে। সেদিক থেকে প্রতাপের দেখার আগ্রহ হওয়াটাই সমীচীন।

এক সময় মলয়বাবুর মেয়ে আছে শুনে প্রতাপের আসার ইচ্ছা ছিল না। বিষয়টিকে পরখ করে দেখা এবং মলয়বাবুর বাবার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্যই সে এখানে এসেছে। মলয়বাবুর বাবা স্বাধীনতা সংগ্রামী,

তার বাবাও। বাবার কাছ থেকে সে শুনেছে দেশভাগের যন্ত্রণার কথা। ব্রিটিশের কূটনৈতিক চালে পা দিয়েছে দেশীয় নেতাগণ। তা না হলে দেশ ভাগ হত না। নেতাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন স্বার্থপর। জনগণের সুখের কথা না ভেবে তাঁরা নিজেদের স্বার্থ পূর্ণ করেছেন। হিন্দুমুসলিমের জন্য আলাদা রাষ্ট্র কে বা কারা চেয়েছিল? দেশের আপামর জনসাধারণ কি চেয়েছিল? চায়নি। তাহলে কেন দেশ ভাগ হল? যদি হিন্দু মুসলিম একসাথে থাকতে না পারে তাহলে এখন আমরা আছি কী করে? বর্তমানে সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমাদের দেশের জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ মুসলিম। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশেও এখনো অসংখ্য হিন্দু রয়েছে। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই তাহলে পাকিস্তান বা বাংলাদেশে কোন হিন্দু থাকা উচিত নয়; আর ভারতেও কোন মুসলিম থাকা অনুচিত। কিন্তু বেশ আশ্চর্যজনকভাবে উক্ত দেশগুলিতে হিন্দুমুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ সম্প্রীতির সঙ্গেই বসবাস করছে। তাহলে কেন দেশ ভাগ হল?

(পরবর্তী অংশ আগামী সপ্তাহে)

#####################################