রবিবারের বাবুইবাসা : 23-06-19

।।ধারাবাহিক উপন্যাস।।

                                                               ।। জননী ।।

নারায়ণ চন্দ্র দেবনাথ

 

তোর আশাপূর্ণ হবে । এদিকে ডাক্তারবাবু বাবাকে বললেন, আপনার ছেলেকে কেবল ওষুধ খাওয়ালে চলবে না । স্নেহচায়, ভালোবাসা চায় । আদরযত্ন না পেলে আপনার ছেলেকে সারিয়ে তোলা মুশকিল হবে । বাবা ছেলেকে সুস্থ করে তোলার ভার আমার উপর দিলেন । সপ্তাহ খানেকের মধ্যে তোমার আঙ্কেল সুস্থ হয়ে উঠলেন বটে , কিন্তু এবার নতুন বায়না ধরলেন ।
সে আবার কী ?
তিনি হরিয়ানাতে আর যাবেন না । সেখানে তাঁর খাওয়া থাকার খুব অসুবিধা হচ্ছে এই অজুহাতে । আসলে জানোতো ! বড়োলোকের ছেলে , মানা থাকলেও বাবা আদরযত্নের কোন খামতি রাখেননি । হঠাৎ করে তাই বাইরের জল হাওয়া সহ্য করতে পারেন নি । বাবাকে ছেলের আবদারের কথা জানালাম । বাবা ছেলেকে চাকরি ছেড়ে দিতে বলেন । ছেলে এক কথায় রাজি !
রাজি হবেনা আন্টি ! আপনার মতো ভাবী সুন্দরী স্ত্রীকে ছেড়ে কে আর দূরে থাকতে চায় বলুন !
তা জানিনা, তবে সুস্থ হয়ে দিন পনেরো পরে তিনি বাবাকে নিয়ে রেজিগনেশন লেটার জমা দিতে যান । কিন্তু বড়ো সাহেব তাঁর চিঠি একসেপ্ট করেননি । তাঁদের দুজনকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখলেন । বিরক্ত হয়ে বাবা বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন , এমন সময় বড়ো বাবু এসে বলেন , তোমাকে চাকরি ছাড়তে হবে না । তোমার মতো ট্যালেন্টেড যুবক দেশের সম্পদ । তোমাকে এলাহাবাদে পোস্টিং – এর ব্যবস্থা করেদিলাম । এইসব করতে একটু দেরি হয়ে গেল আর কী ! আর কোনদিন অন্য কোথাও যাতে তোমার ট্রান্সফার না হয় সেই ব্যবস্থাও আমি করে দিয়েছি । কি, এবার চাকরি করবেতো ? বড়ো বাবুকে ধন্যবাদ জানিয়ে তাঁরা সেদিন বাড়ি ফিরেছিলেন । এবার বুঝলে তো সেদিন কেন গোপাল আমার ডাকে সাড়া দেন নি ?
বুঝেছি ।
আসলে আমরা সামান্য কিছুতেই না ভেঙে পড়ি । কোন কিছুতে আশা হত হলেই মনে হয় মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে । সকল কিছুরই কিছু না কিছু ভালোদিক আছে । অপেক্ষা করতে হয় , ধৈর্য ধরতে হয় ।
ঠিকই বলেছেন আন্টি । তবে কিনা আপনার মতো মনের জোর তো সকলের থাকে না ।
ইতিমধ্যে মেয়ে মঞ্জিষ্ঠা কখন গুটিগুটি পায়ে এসে মায়ের চোখ টিপে ধরে । আসলে এত সিরিয়াস আলোচনা হচ্ছিল যার জন্য প্রতাপ মঞ্জিষ্ঠার কথা ভুলেই গিয়েছিল । দুজনেই দরজাকে পিছন করে কথা বলছিল , তাই মঞ্জিষ্ঠার আগমন কারোর নজরে পড়েনি । মা বলেন , ছাড়, ওরে পাগলি মেয়ে , আমার চোখ ছাড়্ । চোখে লাগছে ।
ছাড়ব না । আমি কখন থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি ! তুমি আসছই না ; তাই আমি নিজেই তোমার কাছে চলে এলাম ।
এখনো পোশাক বদলাসনি ? কী মেয়েরে বাবা ! একদিন দরজা খুলে মাকে দেখতে পায়নি , ব্যাস ! অমনিও পরে উঠে আসতে হবে ? কেন জুতোটাও বুঝি নিজে খুলতে পারিস না ? এখনতো তুই বড়ো হয়েছিস ! এখনো আমাকে সব কিছু করে দিতে হবে ? আচ্ছা , আমি যদি এখন মরে যায় তা হলে তখন তুই কী করবি ?
মঞ্জিষ্ঠা কাঁদোকাঁদো মুখ করে বলে , মাম্মি ! তুমি না !
চল, চল । এসো প্রতাপ , এসো । এই হল আমাদের মেয়ে । ওর নাম মঞ্জিষ্ঠা । ফিজিক্স অনার্স পড়ছে । বিকালে পাশের মাঠে টেনিস খেলতে যায় । তারপর মা মেয়ে ঘরে চলে যান । প্রতাপ মলয়বাবুর সঙ্গে ড্রয়িং রুমে বসে আছে । টেনিসের ছোট্টখাটো পোশাকে মঞ্জিষ্ঠাকে দেখে প্রতাপ শিউরে ওঠে । যেমন চেহারা , তেমন গায়ের রঙ ! শরীরে কোথাও অতিরিক্ত মেদ নেই । বাঁধানো আঁটোসাঁটো শরীর । গায়ের রঙ গৌরবর্ণ । বাঁশির মতো নাক , ভীরু হরিণীর মতো টানাটানা চোখ , রসে ভরা ঠোঁট । একে বারে নিখুঁত ভাবে গড়া । এ যেন অর্ডার দিয়ে বানানো মাটির পুতুল । মনে হয় সাক্ষাৎ দেবী সরস্বতী । মায়ের সঙ্গে ঘরে যাওয়ার সময় মঞ্জিষ্ঠা প্রতাপের দিকে একটু বাঁকা চোখে তাকিয়ে ছিল । সেই চাহনি প্রতাপের বুকে যেন শেলের মতো বিঁধে আছে । তার বুকের ভিতর কালবৈশাখীর প্রবল ঝোড়ো বাতাস বইছে । উত্তাল সাগরের মতো ভিতরটা ফুলেফুলে উঠছে । প্রতাপের হৃদয়কে আলোড়িত করে চকিত হরিণীর মতো মায়ের সাথে চলে গেল সে । প্রতাপ অপেক্ষা করে মঞ্জিষ্ঠার জন্য । পোশাক পাল্টে সে ঠিক আসবেই । সময় যেন তার আর কাটতে চায়না । এক মিনিটকে একঘণ্টা বলে বোধ হয় । মলয়বাবু কাজ নিয়ে বসেছেন । জরুরি কাজ । প্রতাপকে চুপ করে থাকতে দেখে নিজেই কথা পাড়লেন । কী, কেমন দেখলে আমাদের বাড়ি ?
অসাধারণ ! বাড়িতো নয়, রাজ প্রাসাদ । আরও অনেক কিছু জানলাম ! বলেই প্রতাপ মুচকি মুচকি হাসে ।
কী জানলে ?
আপনাদের সম্পর্কের কথা ।
ও আচ্ছা, বেশ । কেমন ড্রামাটিকনা ! প্রতাপের উত্তরের অপেক্ষা না করে স্ত্রী মেয়েকে দেখতে না পেয়ে মলয়বাবু বলেন , ওরা সব গেল কোথায় ? তারপর প্রতাপকে জিজ্ঞাসা করেন তাঁর মেয়ের সাথে দেখা হয়েছে কিনা ।
এক ঝলক দেখেছি । একেবারে রাজধানীর মতো এল এবং দুরন্ত এক্সপ্রেসের মতো চলে গেল ।
সে কী ! দাঁড়াও , আমি ওদের ডেকে দিচ্ছি । তারপর মলয়বাবু সঙ্গে করে ওদের দুজনকে নিয়ে আসেন । সঙ্গে নানা রকমের খাবার নিয়ে আসেন তাঁরা । চারজন বসে খাওয়া দাওয়া করেন । জমিয়ে গল্প গুজব চলতে থাকে । প্রতাপ যেন এখন পেখম মেলা ময়ূর । কত কথা তার এতক্ষণ জমে ছিল । সেই জমে থাকা কথাগুলো এখন স্রোতের মতো বেরিয়ে আসছে । উপযুক্ত পরিবেশ পেলে যেমন গাছপালা তরতরিয়ে বেড়ে ওঠে , তেমনি যথাযথ পরিবেশে প্রতাপের মুখে মা সরস্বতী যেন বসে আছেন । মঞ্জিষ্ঠার কাছে নিজের ভাব মূর্তিকে তুলে ধরার জন্য প্রতাপ বাঁধন হারা উচ্ছ্বাস দেখাতে থাকে । মাঝে মধ্যে প্রতাপ ও মঞ্জিষ্ঠার মধ্যে চোখাচোখি হয় । ইতিমধ্যে সন্ধ্যা নেমে এসেছে । মা বাবা দুজনে প্রতিদিন সন্ধ্যাহ্নিক করেন । আজও তাই তাঁরা পুজো দেওয়ার জন্য মন্দিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন ।যাওয়ার সময় মলয়বাবু প্রতাপকে বলেন , তোমরা দুজনে গল্প করো । আমরা পুজো সেরে আসছি ।
আচ্ছা । আঙ্কেল আন্টি না থাকলেই এখন প্রতাপের মঙ্গল । সে চায় মঞ্জিষ্ঠার সাথে একটু একান্তে কথা বলতে । এদিকে মা বাবা চলে যাওয়ার পরে মঞ্জিষ্ঠা মাথানত করে বসে থাকে । প্রতাপ কী বলবে বুঝতে না পেরে শেষে বলে , কী , চুপ করে বসে আছেন কেন ? এতক্ষণ তো বেশ সুন্দর কথা বলছিলেন । আপনার কথাগুলি শুনতে আমার ভীষণ ভালোলাগ ছিল ।
মঞ্জিষ্ঠা এবার প্রতাপের দিকে চেয়ে মৃদু হেসে চোখ নামিয়ে নেয় । প্রতাপ তাই তাকে বলে , কী কিছু বলবেন না ?
না, আমি আপনার সামনে কিছু বলতে চাই না ।
কেন ? আমি কী অপরাধ করলাম ম্যাডাম ! আমি কি আপনার কথা শোনার উপযুক্ত নই ? তবে না , এই প্রশ্ন করে আমি নিজের গুরুত্ব বাড়াতে চাইছি না । আপনার কথাশোনার যোগ্যতা যে আমার নেই তা আমি জানি । আপনি হলেন রাজকন্যা, আর আমি অতিসাধারণ ঘরের ছেলে । আপনি অপ্সরার চাইতেও সুন্দরী , আর আমি কালোহীরে । দুধ আর জল যেমন ।
জল না হলে দুধের কোন মূল্য থাকে না কিন্তু ! দুধে জল মিশিয়ে তবেই কিন্তু গরম করতে হয় । খাঁটি দুধ কিন্তু খাওয়া যায় না , আর খাওয়া গেলেও সহ্য করা যায় না । তাই নিজেকে জল বলে ছোটো করার চেষ্টা করবেন না । দুধ না হলেও মানুষ বাঁচে , কিন্তু জল নাহলে মানুষ বাঁচতে পারে না , তা কি জানেন না ?
বাঃ ! কী চমৎকার ! এইতো আপনি কত সুন্দর কথা বলতে পারেন ।
আবার সেই এক কথা ! এবার মুখ ভ্যাংচিয়ে বলে , সুন্দর কথা বলতে পারেন , সুন্দর কথা বলতে পারেন । কেন , আর কিছু সুন্দর দেখতে পান না ? প্রতাপ মনেমনে বলে , তোমার সব কিছুইতো সুন্দর । তোমার চোখ , সে তো নীল সমুদ্রের চেয়েও সুন্দর । তোমার হাসির কাছে তো মুক্তোও হার মানবে । তোমার চুলের ঢেউতো যে কোন পুরুষ মানুষকে নাড়িয়ে দিয়ে তোমার পায়ে সমর্পণ করতে পারে । তোমার গায়ের রঙের কাছেতো সাত রঙা রামধনুর রঙও ম্লান হয়ে যাবে । তুমি গোলাপের চেয়েও সুন্দরী । তুমি মানবীনা , তুমি দেবী । প্রকাশ্যে বলে , আপনি বাগানে ফুটে থাকা সবচেয়ে সুন্দর গোলাপ । যার পাপড়ির উপর ভোরের শিশির আলতো পরশ দিয়ে গেছে । সূর্যের আলোতে সেই গোলাপ আরও সুন্দর হয়ে উঠেছে । আপনি বসন্তে পুষ্পশোভিত কৃষ্ণচূড়া । আপনার আভার কাছে সকল সৌন্দর্য হার মানে ।
আপনিতো তা দেখতে পান না ।
না পেলে বললাম কী করে ?
আমাকে খুশি করার জন্য এসব প্রশংসা !
কী করে আপনাকে বিশ্বাস করাবো ! আমার যদি হনুমানের মতো ক্ষমতা থাকতো তো বুক চিরে দেখিয়ে দিতাম । প্রথম পরিচয়ে কাউকে বেশি কিছু বলা যায় না । একান্ত ইচ্ছা থাকলেও না । আমি যা চাইছি , তিনি তা নাও চাইতে পারেন । কাউকে কিছু বলার আগে বা অফার করার আগে তার মন মানসিকতা বুঝে নিতে হয় । তানা হলে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে ।
আপনি আমাকে বলতে পারেন । আমার দিক থেকে সমস্যার কিছু হবে না । আমি কথা দিচ্ছি , আপনি আমার দিক থেকে অন্তত কোন বিপদের আশঙ্কা করবেন না ।
তোমাকে অসুন্দর বলার সাহস কারোর নেই । তুমি স্বর্গের অপ্সরা , ভুল করে মর্তে চলে এসেছ । ও স্যরি , আপনাকে তুমি বলে ফেললাম । কিছু মনে করবেন না ।
আমি আপনার চেয়ে ছোটো । আমাকে তুমি বললেই খুশি হব ।
আর কী কী করলে বা বললে তুমি খুশি হবে ? আমি তোমার খুশির জন্য সব কিছু করতে পারি ।
ওমা ! আপনি আমার খুশির জন্য কিছু করতে যাবেন কেন ? আমি আপনারকে হই ?
প্রতাপ মঞ্জিষ্ঠার কথাতে অপ্রস্তুত হয়ে বলে না, মানে, আমি ঠিক তা বলতে চাইনি । কী বলতে কী বলে ফেললাম ! ছিঃ !
ইতিমধ্যে মঞ্জিষ্ঠার বাবা মা পুজো সেরে চলে এসেছেন । তাঁদের আসার পরে প্রতাপ উঠে পড়ে ; বলে আঙ্কেল , আমি আজ তাহলে আসি । অনেক রাত হয়েছে ।
কোথায় রাত হয়েছে ? আমার বাবার সাথে দেখা করবে না ?
আজ নয় , পরে একদিন আসবো । বলে প্রতাপ দরজার দিকে পা বাড়ায় । মনটা তার খারাপ হয়ে গিয়েছে । সে লজ্জিতও বটে । যদি মঞ্জিষ্ঠা এসব কথা বাবা মাকে জানিয়ে দেয় ? তাহলে লজ্জায় তার মাথা কাটা যাবে । মেয়েটিকে এত কথা বলা তার উচিত হয়নি ।
এদিকে মঞ্জিষ্ঠা ভেবেছে যাবার সময় নিশ্চয়ই প্রতাপ একবার তার দিকে তাকাবে । তখন চোখের ইশারায় সে প্রতাপের সমস্ত রাগ গলিয়ে তরল করে দেবে । কিন্তু প্রতাপ একবারও পিছনের দিকে না তাকিয়ে গেটের বাইরে চলে যায় । গাড়ি প্রস্তুত ছিল , সেই গাড়িতে চেপে প্রতাপ কোয়ার্টারে ফেরে । মঞ্জিষ্ঠা তিনতলায় দাঁড়িয়ে যতক্ষণ দেখা যায় ততক্ষণ গাড়িটিকে দুচোখ ভরে দেখতে থাকে । গাড়ির ভিতরে বসে থাকা মানুষটি তার উপর যে অভিমান করে চলে গেল তা বুঝতে তার আর বাকি থাকেনি । প্রায়শ্চিত্ত করারও সুযোগ সে পেল না । গাড়ি চোখের আড়াল হতেই সে নিজের ঘরে ঢুকে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ে ।

(পরবর্তী অংশ আগামী সপ্তাহে)

###############################################################