মহারাজের জন্মদিন মানে বাঙালির সে এক অন্য রোম্যান্স!

প্রেরণা গুঁই

ক্রিকেট যদি ধর্ম হয় তাহলে তার ঈশ্বর সচিন তেন্ডুলকর। আবার ক্রিকেট যদি রাজত্ব হয় তাহলে তার মহারাজ হলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়।

বেহালার বীরেন রায় রোডের 5 ফুট 9 ইঞ্চির এই ছেলেটা বাংলা ও বাঙালিকে বিশ্বের দরবারে যে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছে দেবে তা কজনই বা জানতো! ভারতের অগণিত স্বাধীনতা সংগ্রামী দেশ স্বাধীনের জন্য ব্রিটিশের সামনে যে দাদাগিরি দেখিয়েছিলেন তা যেমন লেখা আছে ইতিহাসের পাতায়, তেমনই ব্রিটিশ রাজত্বে ঢুকে এই বাঙালি ছেলেটি যে কান্ড ঘটিয়েছিলেন, তাও লেখা আছে স্বর্ণাক্ষরে। তবে এই কাজ কজনই বা পারে? এর জন্য একটা চওড়া বুকের পাটা দরকার হয়। বিলেতের মাটিতে লর্ডসের বাইশ গজে জার্সি ওড়ানোর মত দাদাগিরি করা কিন্তু মুখের কথা নয়। তাই ‘লর্ডসে ঘুরপাক জামা মানে সেই দাদাগিরি’-র কথা লেখা রয়েছে স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাসের পাতায়।

বাইশ গজে মহারাজের পদার্পণ এবং কলকাতায় বসে থাকা দাদাপ্রেমীদের ‘দাদা, দাদা’ করে চিৎকার যেন আজও কানে বাজে। যদিও এর মাঝখান দিয়ে গঙ্গায় বয়ে গিয়েছে অনেকখানি জল। কেটে গিয়েছে অনেকগুলো বছর। তবুও মহারাজ যেন আছেন তাঁর নিজেরই রাজত্বে। তবে এ রাজত্ব আর ব্যাট, প্যাড ও গ্লাভসের রাজত্ব নয়। এ রাজত্ব মাইক্রোফোনের রাজত্ব। এই দাদাগিরি বাউন্ডারি, ওভার বাউন্ডারির দাদাগিরি নয় এই দাদাগিরি মাইক্রোফোনের দাদাগিরি। তবুও টেলিভিশনের পর্দায় ইংরেজি বা হিন্দি ভাষায় দাদার কণ্ঠস্বর যেন আজও প্রত্যেকটা বাঙালিকে গর্ব বোধ করায়।

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে আজও মনে পড়ে যায় সেসব সোনালি দিনের কথা। আজ, সোমবার সেই মহারাজের শুভ জন্মদিন। 46 টা বসন্ত কাটানোর পরও মহারাজ যেন আছেন নিজের সেই চেনা ঘাঁটিতেই।

আজ্জ থেকে প্রায় 23 বছর আগের কথা। কিন্তু যেন মনে হয় এই ক’দিন আগের কথা। 1996 সালে ইংল্যান্ডের মাটিতে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধেই টেস্টে অভিষেক হয় সৌরভের। তারপর বাকিটা ইতিহাস। তবে ‘প্রিন্স অফ ক্যালকাটা’ থেকে ‘গড অফ অব সাইড’ হয়ে ওঠার পথটা মোটেই খুব একটা সহজ ছিল না। অনেক সমালোচনা, অনেক প্রতিকুলতকে কাটিয়ে বারবার ঘুড়ে দাঁড়ানোর নামই সৌরভের দাদাগিরি।

তবে মহারাজের বাইশ গজ ও বাইশ গজের বাইরের কাহিনির মধ্যে ইংল্যান্ডের এক অনবদ্য ভূমিকা আছে। সৌরভের বেশিরভাগ সাফল্যের সাক্ষী এই বিলেতের মাটিই। কখনও টেস্টে অভিষেক তো, কখনও 1999 বিশ্বকাপে টনটনে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে সৌরভের সর্বোচ্চ রান 183, তো কখনও আবার লর্ডসের বাইশ গজে ন্যাটওয়েস্ট ট্রফি জিতে জার্সি ওড়ানো। এই সব ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী ইংল্যান্ডই। আর এখন সেই ইংল্যান্ডেই মহারাজ আছেন। চলছে বিশ্বকাপ। সেখানেই ধারাভাষ্যকারের ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে তাঁকে।

তবে সবুজ গালিচায় ব্যাট হাতে আর তাঁকে দেখা যায় না। দেখা যায় মাইক্রোফোন হাতে। শুদু তাই নয়, বাউন্ডারি-ওভার বাউন্ডারি পেরিয়ে আজ বেশ কয়েক বছর হল লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশনকে নিজের জীবনের অঙ্গ বানিয়েছেন সৌরভ। কেরিয়ারের দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করেছেন সঞ্চালনা দিয়ে, সিএবির সভাপতি হয়ে, বিসিসিআইয়ের পরামর্শদাতা হয়ে ও সব শেষে ধারাভাষ্যকার হয়ে। এমনকি ব্যাট-বল ছেড়ে পরোক্ষভাবে ফুটবল দুনিয়াতেও পা রাখেন তিনি। অ্যাটলেটিকো দি কলকাতার অন্যতম কর্ণধারও তিনি। সব মিলিয়ে মহারাজের রাজপাঠ বদলালেও তাঁর রাজত্ব যে একইভাবে অব্যাহত, তা বলাই যায়।

নিজের 46তম জমদিন বাড়ির থেকে দূরে লন্ডনের মাটিতে কাটাচ্ছেন মহারাজ। আর তাঁর এই শুভ দিনে মহারাজের রাজপাঠ ও রাজত্বকে ফিরে দেখার মজাটাই আলাদা। সব শেষে একটাই কথা বলার। অগণিত সৌরভ ভক্তের একটাই আর্তি, ভাল থাকুক, সুস্থ থাকুক সকলের প্রিয় মহারাজ।