নোবেল রবীন্দ্রনাথের অবমাননা করেছেন, কোথায় পেলেন এই স্পর্ধা?

চন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়

সা-রে-গা-মা-পা 2019-এ নজরকাড়া সঙ্গীত শিল্পী নোবেল যা বলছেন তা নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে । প্রশ্ন উঠেছে, তিনি কি জানেন রবীন্দ্রনাথ যখন এই গান লিখেছিলেন তখন তার জন্মই হয়নি ? কোন মেধার ভিত্তিতে বলেন তিনি যে রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়?
এপার বাংলার মানুষ হিসেবে আমাদের জিজ্ঞাসা, নোবেল আপনি কি বলতে পারবেন যে পরিপ্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথ আপনাদের জাতীয় সংগীত লিখেছিলেন তার প্রেক্ষাপট কি? শুধু কি সস্তা প্রচার এর জন্যই মন্তব্য? প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
আপনি ভালো গান করেন বলে যা খুশি বলার অধিকার কিন্তু আপনার নেই। মানুষের ভাবাবেগে আঘাত করার অধিকার আপনাকে কেউ দেয়নি, সেটা মনে রাখবেন ।
রবীন্দ্রনাথ এপার বাংলার গর্ব, রবীন্দ্রনাথ সারা বিশ্বের গর্ব ,রবীন্দ্রনাথ আমাদের। তাই বলার আগে একবার ভেবে দেখবেন কি বলছেন। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কতটুকু জ্ঞান আছে আপনার? তা নিয়ে কিন্তু সংশয় থেকেই যায়।
আসলে বালখিল্যপনার আর এক নিদর্শনের নাম বাংলাদেশের সংগীত শিল্পী নোবেল।
আপনার বাবার বক্তব্য শুনলে তো আপনাকে সংগীত শিল্পী হিসেবে কেউ গ্রহণই করবে না । সে আপনি এপার বাংলার যত বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে একটার পর একটা গানকে চ্যানেলের মদতে ধ্বংস করুন না কেন, তাতে এপারের মণিকোঠায় আপনি ব্র্যাতই থেকে গেলেন । আপনার দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যে সত্যি লজ্জা হয়!

আরও পড়ুন-প্রচার তুঙ্গে তুলতে এবার তৃণমূলের ট্যুইটার পেজ ‘আমার গর্ব মমতা’

আসুন দেখেনি কি বলছেন নোবেলের বাবা।
নোবেলের বাবা মোজাফফর হোসেন নান্নু বলেন, খুব সুন্দর গানের গলা ছিলো। হারমোনিয়াম বাজাতে পারতো না। কিন্তু গাইতো মিষ্টি করে। এখনো আমার কানে লেগে আছে ছেলেবেলায় নান্নুর গলায় শোনা গান… আমারে সাজাইয়া দিও নওশারও সাজে।
রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলার সঙ্গে প্রিন্স মাহমুদের গানের কোনও তুলনা আনাই যায় না। প্রিন্স মাহমুদের গানের ভাব ও ভাষা শিথিল। সামগ্রিকতা নেই। সংখ্যালঘু কোনও মানুষের উল্লেখ নেই। গানটি ভাব ভাষাতে কোনও অর্থেই সাবলীল নয়। সুরের মধ্যেও বাংলা গানের ঐতিহ্যকে পুরোপুরি অনুসরণ করে না। আদর্শের দিক দিয়ে চিন্তা করলে এই গানে প্রতিক্রিয়াশীলদেরও সমাবেশ আছে। এর চেয়ে আমাদের দেশে অনেক ভালো দেশাত্মবোধক গান রয়েছে। তাহলে এই ধরনের অতি সাধারণ মানের ভুল বাক্যের গানকে রবীন্দ্রনাথের চিরায়ত গানের বদলি হিসেবে দাবি করা দূরে থাকুক, চিন্তা করাটাই নিম্নমানের ।

তিনি বলেন, দেশে জাতীয় সংগীত বদলের দাবি তোলা হয় মাঝে মাঝে। কারা তোলে? জামায়াতে ইসলামীসহ উগ্র ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল দলগুলো। এদের নিয়ন্ত্রিত মাদ্রাসাগুলোতে রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ জাতীয় সংগীতটি গাওয়া হয় না। ওয়াজ মাহফিলে গানটি ও গানটির রচয়িতাকে নিয়ে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করা হয়। বলা হয় হিন্দুর রচিত জাতীয় সংগীতটি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের ঈমান আকিদার সঙ্গে খাপ খায় না। এটা বদলাতে হবে। হেফাজতে ইসলামীর তাত্ত্বিক জঙ্গিবাদী ফরহাদ মজহার রক্তের দাগ মুছে রবীন্দ্রপাঠ বই লিখে ভুলভাল কথা বলে রবীন্দ্রবিদ্বেষকে উসকে দিয়েছেন। সেখানে বলেছেন, মোঘলরা ‘বাংলা’ লিখতো। তারা মুসলমান ছিলো বলে হিন্দু রবীন্দ্রনাথ শব্দটিকে বাংলার বদলে বাংলা করে মুসলমানত্বকে ছেঁটে ফেলেছেন। তার মতে, একজন মুসলমান জাতীয় সংগীতটি লিখলে শোভন হতো। পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করতে চেষ্টা হয়েছিল। বাংলাদেশ আমলে জামায়াতে ইসলামীসহ মৌলবাদীরা রবীন্দ্রনাথ রচিত জাতীয় সংগীতটি বদলের দাবি করে পাকিস্তানপন্থী সাম্প্রদায়িক আদর্শ থেকে। সেটা ভয়ংকর। কিন্তু নোবল বা তার পরিবারের কেউই পাকিস্তানপন্থী রাজনীতি বা আদর্শকে ধারণ করে না। তার বয়স মাত্র একুশ। ঘোষের চর গ্রামে সে বেড়ে উঠেছে। গোপালগঞ্জের মতো একটি মফস্বল শহরে পড়েছে। দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সঠিক শিক্ষা দীক্ষা দেয়ার চল নেই।

আরও পড়ুন-নদিয়ার রানুর সুরের মূর্ছনায় মাতল 25 লক্ষ শ্রোতা

বইপত্রে চলছে সাম্প্রদায়িকীকরণ। হিন্দু সাহিত্যিকদের লেখাপত্র বাতিল করা হচ্ছে। ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে সরকারও কার্যত সাম্প্রদায়িক মৌলবাদীদের স্বার্থরক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে দেশে উদার, অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, বিজ্ঞানবাদী, যুক্তিবাদী, মানবিক, ধ্যান-ধারণা, নীতি-নৈতিকতা,  শিক্ষা-দীক্ষা, আচার-আচরণের ঘাটতি প্রকট হয়ে উঠেছে। এ কারণে আমাদের নতুন প্রজন্ম ভুল পাঠ নিয়ে বেড়ে উঠছে। তাদের প্রকৃত সাহিত্যবোধই নেই। তারা ঘৃণার মধ্যে জন্ম নিয়ে ঘৃণাবাদী হয়ে উঠছে প্রচ্ছন্নভাবে। তারা সুন্দরভাবে কথা বলতেও শেখেনি। যা বলে তা ভুল বলে, অর্ধসত্য বলে অথবা অসত্য বলে। রবীন্দ্র সংগীতের ভাবসম্পদ বোঝার মতো ক্ষমতাই তার নেই। না বুঝেই গান করে। আমার মনে হয়, নোবেল কোনো কিছু না ভেবেই ভুলকথা বলে ফেলেছে। অল্প বয়স হেতু এ রকম কথা অনেকেই বলে ফেলে। এর দায় তার নয়। দায় রাষ্ট্র ও ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক শক্তির। তারা যখন রবীন্দ্র সংগীত বদলের কথা বলে তখন তারা পরিকল্পিত একটা ষড়যন্ত্র থেকেই বলে। সেটা ভয়ের। সেটাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। নোবেলের জাতীয় সংগীত বিষয়ক কথাকে গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই।

আরও পড়ুন-পুজো উদ্যোক্তাদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠক 30 আগস্ট ইণ্ডোরে