এখনও স্বপ্ন দেখবার স্পর্ধা দেখান শুভেন্দু মাইতি

আশুতোষ ভট্টাচার্য

কলেজে পড়বার সময় বিভিন্ন ছোট বড় গানের অনুষ্ঠান শুনেছি, মান্না দে, ফিরোজা বেগম ভুপেন হাজারিকা থেকে মানবেন্দ্র, অমর পাল কিংবা সুমন, অঞ্জন দত্ত আর ফিডব্যাক। আর এর বাইরে আর কয়েকজন ছিলেন যারা ছিলেন আমাদের আপনজন, তাঁদের দরজা সর্বদা উন্মুক্ত, রনে বনে জলে জঙ্গলে তাঁরাই ছিলেন আমাদের ভরসা। এই বন্ধনীতে ছিলেন উৎপলেন্দু চৌধুরী, পুরবী মুখার্জি বা শুভেন্দু মাইতির মত মানুষেরা। বহুবার হয়েছে ছাত্র সংসদের পয়সা নেই উনারা গেয়ে গেছেন নামমাত্র দক্ষিণায় বা খালি সহশিল্পীদের জন্য পয়সা দিতে হয়েছে।

এইভাবেই নয়ের দশকের শুরুর দিকে শুভেন্দু মাইতির সাথে আমাদের পরিচয়, পরনে ধুতি পাঞ্জাবী, কোন জাঁকজমক নেই, নিতান্তই সাধাসিধে একজন মানুষ গান গাইতে উঠতেন স্টেজে, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও বহু স্ট্রীট কর্নার কি নির্বাচনী জনসভায় তাঁকে গাইতে শুনেছি। তাঁর গানের সংগ্রহ অজস্র, মাঠে ঘাটে, স্টেশনে, প্ল্যাটফর্ম, মেলা পরব, নদী বন্দর ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছেন গানের খোঁজে, আর সেই গানগুলো তাঁর কথা সুর ভরে নিয়েছেন তাঁর ঝোলায়। আর সেই সংগ্রহে ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, চটকা, মইশাল, ভাদু, ইতু পুজোর গান,লালনের গান, আব্দুল করিম, হাসন রাজার গান, চা বাগানের গান, নৌকার গান, ঝমুর, বিহার ঝাড়খণ্ডের গান, কলকারখানার গান, মুটে মজদুরের গান সব আছে। আর সে কেবল আছে তাই নয়, মূল সুর, গায়কি নিয়ে তাঁর কাছে গচ্ছিত আছে। কত শিল্পীকে যে তিনি মানুষের সামনে নিয়ে এসেছেন, নিজে রয়ে গেছেন আড়ালে। লোকগান আর লোকসংস্কৃতির একটি প্রতিষ্ঠান তিনি নিজেই।

আরও পড়ুন-ভারতের দাবি উড়িয়ে দিলেন ইমরান

প্রায় 25 বছর পর সেই মানুষটার সাথে আবার দেখা, অদ্ভুতভাবে তাও আবার ঢাকায়। কৃষ্টি ফাউন্ডেশনের ডাকে এক সঙ্গীত ওয়ার্কশপে, এখন প্রায় 75 বছর বয়স, কিন্তু সেই আগের মতই উদ্দাম, উচ্ছল। হারমোনিয়াম নিয়ে অবিশ্রান্ত গান গাইছেন, সুর তুলছেন, গান শেখাচ্ছেন, না পারলে বকছেন আবার চায়ের আড্ডায় মাঝে মাঝে ফিরে যাচ্ছেন পুরনো দিনে, তাঁর ঠাকুমা, মিছিল মিটিং, তাঁর সেই গ্রামের গানের শিক্ষক, চটকল মজদুরদের সাথে গান গাওয়া।

কোন আক্ষেপ নেই তবু, আমরা তো সেভাবে মানুষটাকে সম্মান জানাতে পারলাম না, নামই জানি না অনেকে, হয়ত আড়ালে বলি গণসংগীত আবার গান!

এখনো মানুষটার চোখে স্বপ্ন, দেশবিদেশে এত বাঙালি, পারবোনা বাংলা গান, বাংলা সংস্কৃতি অবিকৃত অবস্থায় বাঁচিয়ে রাখতে, প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে ইতিমধ্যে তিনি তাঁর দীর্ঘ পাঁচ ছয় দশকের সংগৃহীত গান ডিজিটালইজ করেছেন, যে কেউ সে গান শুনতে পারে।

সেই মানুষটা এখনো স্বপ্ন দেখবার স্পর্ধা দেখান।

আরও পড়ুন-ইরফান পাঠান সহ 100 ক্রিকেটারকে অবিলম্বে ভূস্বর্গ ছাড়ার নির্দেশ